ঢাকা মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর, ২০২৬

menu

দুর্নীতির ‘সিন্ডিকেট’ ভাঙতে লটারিতে সাব-রেজিস্ট্রার বদলি, ঢাকার ১৮ পদে নতুন উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৬, ২০২৬, ১২:৪১ পিএম

দুর্নীতির ‘সিন্ডিকেট’ ভাঙতে লটারিতে সাব-রেজিস্ট্রার বদলি, ঢাকার ১৮ পদে নতুন উদ্যোগ

ছবিঃ সংগৃহীত

সাব-রেজিস্ট্রার অফিস নিয়ে মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের নেতিবাচক ধারণা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, জনমনে যেসব জায়গাকে দুর্নীতির আখড়া হিসেবে দেখা হয়, সেসব ‘প্রাইজ পোস্টিংয়ে’ গড়ে ওঠা সম্ভাব্য সিন্ডিকেট ভাঙতেই সাব-রেজিস্ট্রারদের লটারির মাধ্যমে বদলির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ অক্টোবর) সচিবালয়ে লটারির মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি কার্যক্রমের অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী।

দুর্নীতির ধারণা বদলাতে নতুন উদ্যোগ

আইনমন্ত্রী বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের নেতিবাচক ধারণা একদিনে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এজন্য ধাপে ধাপে সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘নেতিবাচক জায়গা থেকে ওভারনাইট আমরা সব পাল্টে ফেলতে পারবো না। আমরা সেটা দাবি করি না, সেটা সম্ভবও না। আমাদের কোনো না কোনো জায়গা থেকে শুরু করতে হবে।’

তার মতে, এই সংস্কার কার্যক্রমের শুরু হিসেবে রাজধানী ঢাকার সাব-রেজিস্ট্রার পদগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ ঢাকায় সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনকে বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বা ‘প্রাইজ পোস্টিং’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ঢাকার ১৮ পদে লটারিতে বাছাই

আইনমন্ত্রী জানান, বর্তমানে সারাদেশে ‘এ’ ক্যাটাগরির ১৩১ জন সাব-রেজিস্ট্রার রয়েছেন। তাদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে ঢাকার জন্য ১৮ জনকে প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয়েছে।

তবে শুধু লটারিতে নাম ওঠার ভিত্তিতে তাদের ঢাকার বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব দেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার কাজের চাপ বিবেচনা করে চূড়ান্ত পদায়ন করা হবে।

আইনমন্ত্রী বলেন, ঢাকার সব এলাকার কাজের চাপ সমান নয়। কোথাও লেনদেন ও দলিল নিবন্ধনের চাপ বেশি, আবার কোথাও তুলনামূলকভাবে কম। তাই কোন কর্মকর্তা কোন এলাকায় দায়িত্ব পালনে বেশি সক্ষম, তা বিবেচনায় নিয়ে পদায়ন করা হবে।

তিনি বলেন, ‘আমি একটু বসে ইন্টারভিউ নিয়ে, দক্ষতার বেসিসে যে এলাকায় বেশি চাপ, যারা সহ্য করতে পারবে, তাদের আমরা সে এলাকায় দেব। কাজের লোড অনুসারে।’

শুধু লটারি নয়, দক্ষতাও হবে বিবেচনার ভিত্তি

সাব-রেজিস্ট্রারদের ঢাকার বিভিন্ন পদে শুধু লটারির মাধ্যমে বসানো হলে প্রশাসনিক ও কর্মদক্ষতার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন আইনমন্ত্রী।

তাই লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে পরবর্তী ধাপে তাদের দক্ষতা ও সংশ্লিষ্ট এলাকার কাজের চাপ বিবেচনা করে দায়িত্ব বণ্টন করা হবে।

অর্থাৎ, লটারি হবে প্রাথমিক বাছাইয়ের পদ্ধতি; কিন্তু চূড়ান্ত পদায়নে কর্মকর্তার সক্ষমতা ও অফিসের কাজের চাপকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

‘প্রাইজ পোস্টিংয়ে’ রোটেশন চালুর পরিকল্পনা

আইনমন্ত্রী বলেন, যেসব পদকে দীর্ঘদিন ধরে বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ বা ‘প্রাইজ পোস্টিং’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেসব জায়গায় নিয়মিত রোটেশনের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব জায়গায় দুর্নীতির শিকড় গড়ে ওঠার বিষয়ে জনমনে ধারণা রয়েছে, সেখানে দীর্ঘদিন একই ধরনের কর্মকর্তা বা গোষ্ঠীভিত্তিক প্রভাব তৈরি হওয়ার সুযোগ কমাতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘বাই রোটেশনে প্রাইজ পোস্টিংগুলো, যেটা মনে করা হয় ডিপার্টমেন্টের, যেখানে দুর্নীতির শিকড় গজায়, সেই জায়গাগুলোতে আমরা দেব।’

‘সিন্ডিকেট ভাঙতেই এই প্রক্রিয়া’

সাব-রেজিস্ট্রার অফিসকে ঘিরে জনমনে থাকা দুর্নীতির ধারণা প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, কোনো নির্দিষ্ট অফিস বা কর্মকর্তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা নয়; বরং দীর্ঘদিনের নেতিবাচক জনধারণা ও সম্ভাব্য প্রভাবশালী চক্র ভাঙাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।

তিনি বলেন, ‘যে জায়গাটা মনে করছি পাবলিক পারসেপশনে দুর্নীতির আখড়া, সেই জায়গায় সেই সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য এই প্রক্রিয়া।’

এই উদ্যোগের ফলে দুর্নীতি কমবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘অবশ্যই। আমরা আশা করি। আমরা আশাবাদী।’

সারাদেশে ৩৭২ সাব-রেজিস্ট্রার কর্মরত

আইনমন্ত্রী জানান, বর্তমানে সারাদেশে ৩৭২ জন সাব-রেজিস্ট্রার কর্মরত রয়েছেন। বিপরীতে ১৩৯টি পদ শূন্য রয়েছে। এসব শূন্য পদ পূরণের জন্য বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

তিনি জানান, নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হলে পর্যায়ক্রমে শূন্য পদগুলো পূরণ করা হবে।

দায়িত্ব পালনের মেয়াদ সার্ভিস রুল অনুযায়ী

লটারিতে নির্বাচিত সাব-রেজিস্ট্রারদের ঢাকায় কতদিন দায়িত্ব পালন করতে হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, তারা সার্ভিস রুল অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন।

সাধারণভাবে একজন কর্মকর্তা একই পদে প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান। তবে দায়িত্ব পালনকালে কোনো কর্মকর্তা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়লে তাকে ওই পদে রাখা হবে না বলেও জানান তিনি।

অভিযোগ পেলেই তদন্ত, প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা

সাব-রেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, তার মন্ত্রণালয় বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। গণমাধ্যমে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রকাশিত হলে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, সাব-রেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্নীতির অভিযোগগুলোকে তারা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে এবং মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও তদন্ত করা হয়েছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আপনার মিডিয়া যতগুলো দুর্নীতির, মানে রিপোর্ট করেছেন সাব-রেজিস্ট্রারের বিষয়ে, প্রত্যেকটার, ইনভ্যারিয়াবলি, আমরা এক্সপ্লানেশন কল করেছি, আমরা আমাদের মতো করে তদন্ত করেছি।’

তবে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়া কোনো অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত বলা সম্ভব নয় বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।

তার ভাষায়, ‘আমি চেষ্টা করছি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কাউকে যেমন হয়রানি করব না, কিন্তু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তাকে ছাড়ও দেওয়া হবে না।’

ছয় মাসে ১০ সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

আইনমন্ত্রী জানান, গত ছয় মাসে ১০ জন সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান, অভিযোগ পাওয়া গেলে তা উপেক্ষা করা হচ্ছে না এবং যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, সাব-রেজিস্ট্রারদের কর্মকাণ্ড মন্ত্রণালয়ের নজরদারির মধ্যে রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের তদারকি অব্যাহত থাকবে।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও অভিযোগের কথা জানালেন মন্ত্রী

সাব-রেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধেও সাব-রেজিস্ট্রারদের কাছ থেকে টাকা বা মাসোহারা চাওয়ার অভিযোগ পাওয়ার কথা জানান আইনমন্ত্রী।

তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযোগ থাকলে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ দিতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সাংবাদিক, সাব-রেজিস্ট্রার বা অন্য যে কেউ হোন না কেন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অর্থাৎ, দুর্নীতি বা অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগের ক্ষেত্রে পেশাগত পরিচয় বিবেচনা না করে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

জনমত পরিবর্তনে গণমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ

সাব-রেজিস্ট্রার অফিস নিয়ে মানুষের নেতিবাচক ধারণা পরিবর্তনে শুধু প্রশাসনিক সংস্কার যথেষ্ট নয় বলেও মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী। তার মতে, মানুষের মানসিকতা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তিনি বলেন, সংবাদ প্রকাশের সময় কোনো ঘটনা কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটিও মানুষের ধারণাকে প্রভাবিত করে। তাই দুর্নীতির অভিযোগ যেমন অনুসন্ধান ও প্রকাশ করা প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরাও গুরুত্বপূর্ণ।

লটারির বদলি হবে চলমান প্রক্রিয়া

আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, সাব-রেজিস্ট্রারদের লটারির মাধ্যমে বদলি বা পদায়নের উদ্যোগকে একটি সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ও ‘প্রাইজ পোস্টিং’ হিসেবে বিবেচিত পদেও এ ধরনের রোটেশন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে ধীরে ধীরে সংস্কারের পথ খোঁজা হবে।

তিনি বলেন, ‘আবারও বলছি, আমরা লটারি হিসেবে যখন দিচ্ছি, এটা আমাদের একটা শুরু। এই প্রক্রিয়াটা চলমান। সমস্ত জায়গায় আস্তে আস্তে এটাকে সমাধানের পথ বের করবো।’

আইন মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হিসেবে তাই উঠে এসেছে তিনটি বিষয়—গুরুত্বপূর্ণ পদে দীর্ঘদিনের প্রভাব কমানো, সম্ভাব্য সিন্ডিকেট ভাঙা এবং সাব-রেজিস্ট্রি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবে দুর্নীতি কতটা কমাতে পারে, তা নির্ভর করবে পদায়নের পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি, অভিযোগ যাচাই এবং প্রমাণিত অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!