গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর এবং গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো চেষ্টা সরকারের নেই বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিভ রহমান। তিনি বলেছেন, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনগণকে ভুল তথ্য, অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা থেকে সুরক্ষা দেওয়াও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সোমবার (৫ অক্টোবর) মন্ত্রণালয়ে নিজ কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুকের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তথ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বৈঠকে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার
বৈঠকে তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সাংবাদিকরা যাতে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারেন এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো চেষ্টা সরকারের নেই এবং এ ধরনের কোনো ইচ্ছাও সরকারের নেই।
তবে স্বাধীনতার পাশাপাশি গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে তথ্যের যথার্থতা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ভুল তথ্য ও অপতথ্য ঠেকানোও গুরুত্বপূর্ণ
তথ্যমন্ত্রী বলেন, সাংবাদিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনগণকে ভুল তথ্য ও অপতথ্য থেকে সুরক্ষা দেওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের কারণে বর্তমানে যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এতে বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা তথ্যের প্রভাব সমাজে পড়তে পারে। তাই গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
মানহানিকর ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তথ্যমন্ত্রী। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা যেন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারকে বাধাগ্রস্ত না করে, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখার প্রয়োজন রয়েছে—বৈঠকের আলোচনায় এমন ভারসাম্যের বিষয় উঠে আসে।
সাংবাদিকদের স্বাধীনতার সঙ্গে জনগণের অধিকার
বৈঠকে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনগণের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টিও সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি জানান, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের অধিকার এবং জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সরকার অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় করছে।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি দায়িত্বশীল ও স্বাধীন গণমাধ্যমব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার, গণমাধ্যম মালিক, সাংবাদিক এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়েও আলোচনা
সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
তবে শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি গণমাধ্যম মালিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতার পাশাপাশি তাদের আর্থিক ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে গণমাধ্যম আরও শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সারাহ কুকের অভিনন্দন
সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিভ রহমানকে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অভিনন্দন জানান।
বৈঠকে তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাংবাদিকতার নৈতিক মানদণ্ড বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সারাহ কুক বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে পেশাগত নৈতিকতা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চর্চাও গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে তথ্য যাচাই এবং নির্ভরযোগ্য উৎস ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অপতথ্য মোকাবিলায় ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের গুরুত্ব
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য ও অপতথ্যের বিস্তার নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। এ ধরনের তথ্য মোকাবিলায় ফ্যাক্ট-চেকিং বা তথ্য যাচাই কার্যক্রমের গুরুত্ব তুলে ধরেন ব্রিটিশ হাইকমিশনার।
তিনি মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আগে তার সত্যতা যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্যের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই ব্যবস্থা থাকলে অপতথ্যের ক্ষতিকর প্রভাব কমানো সম্ভব।
অফকম ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতার সম্ভাবনা
সারাহ কুক যুক্তরাজ্যের Office of Communications বা Ofcom এবং বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।
গণমাধ্যম ও যোগাযোগ খাতে নিয়ন্ত্রণ, নীতি, তথ্যের সঠিকতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এ ধরনের সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে বলেও বৈঠকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা
বর্তমানে সংবাদ ও তথ্যের অন্যতম বড় উৎস হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। একই সঙ্গে যাচাইহীন তথ্য, গুজব, বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ও মানহানিকর বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেড়েছে।
বৈঠকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, তথ্যের সঠিকতা নিশ্চিত করা এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যম চর্চা নিয়ে মতবিনিময় করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় মনে করছে, একদিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে জনগণের কাছে নির্ভরযোগ্য ও যাচাই করা তথ্য পৌঁছানোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই ভবিষ্যৎ গণমাধ্যম নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতার সমন্বয়ের ওপর জোর
সার্বিক আলোচনায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা, জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার, অপতথ্য মোকাবিলা এবং সাংবাদিকতার নৈতিক মানদণ্ড—এসব বিষয় গুরুত্ব পায়।
সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরির কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকেও তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং পেশাগত নৈতিকতা অনুসরণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। ভবিষ্যতে গণমাধ্যম, তথ্য যাচাই এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও বাড়তে পারে বলে আলোচনায় উঠে আসে।

