প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দলের নেতাদের কর্মকাণ্ডকে উল্লেখ করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, দিল্লিতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা বাংলাদেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগ বাংলাদেশের রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্কের জন্যও সহায়ক নয় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
সোমবার (৫ অক্টোবর) ঢাকায় সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এর ফাঁকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
ভারতকে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা বুঝতে হবে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির বলেন, সফরটি মূলত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় হলেও এর ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকারের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো ভারতকে উপলব্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ককে স্বাভাবিক ও কার্যকর রাখতে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
শেখ হাসিনা ও তার লোকজনকে সংযত রাখার আহ্বান
শেখ হাসিনা ও তার দলের নেতাদের ভারতের মাটিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে দেশটির সরকারের প্রতি সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা ও তার লোকজন দিল্লিতে অবস্থান করছেন এবং তারা দিল্লিতে বসে আরেকটি দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন। এতে ভারতেরও কোনো লাভ হচ্ছে না।”
প্রতিমন্ত্রীর মতে, ভারতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংযম ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হলে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বড় ধরনের সমস্যা থাকবে না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আলোচনা চলছে এবং ঢাকার পক্ষ থেকে এ আলোচনাকে স্বাগত জানানো হয়েছে।
‘সফরটি হবে দ্বিপক্ষীয়’
সম্ভাব্য ভারত সফরের বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, সফরটি দ্বিপক্ষীয় হবে। তবে সফরের আগে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে কাটিয়ে ওঠার বিষয়ে তিনি আশাবাদী।
তার ভাষায়, প্রধান চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের কাছে খুব বেশি কিছু চাইছে না। বরং দুই দেশের স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করাই মূল বিষয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “সফরটি দ্বিপক্ষীয় হবে, তবে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং আলোচনার মাধ্যমে আমরা সেগুলো কাটিয়ে উঠব।”
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিচ্ছে ঢাকা
হুমায়ুন কবির বলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের কাছে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই পারস্পরিক স্বার্থ ও সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের পক্ষ থেকে কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের সংযত রাখার ক্ষেত্রে ভারত উদ্যোগ নিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষায়, “আমরা কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি, যেহেতু ভারত তাদের সংযত রাখার চেষ্টা করছে। এটাই দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক রীতি। যদি তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়, তাহলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কোনো সমস্যা থাকবে না।”
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
সাক্ষাৎকারে হুমায়ুন কবির শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনের সময় ব্যাপক প্রাণহানির অভিযোগ করেন। তিনি প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার দাবি করেন এবং শেখ হাসিনাকে কঠোর ভাষায় বর্ণনা করেন।
তবে এসব বক্তব্য পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও সরকারি অবস্থান থেকে দেওয়া অভিযোগ হিসেবে এসেছে।
হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশের মানুষের অতীতের সঙ্গে একটি পরিষ্কার বিচ্ছেদ প্রয়োজন। তার মতে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় অনেক মানুষ জীবন দিয়েছেন।
ভারতের সঙ্গে আলোচনায় আশাবাদ
ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নিতে আলোচনার পথ খোলা রাখা জরুরি।
তিনি মনে করেন, উভয় পক্ষ যদি সংবেদনশীল বিষয়গুলো পারস্পরিক বোঝাপড়া ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে, তাহলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও স্থিতিশীল হতে পারে।
ভারত সফর নিয়ে আশাবাদী ঢাকা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা নিয়ে হুমায়ুন কবির আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী কখনো বলেননি যে তিনি ভারত সফর করবেন না।
ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
হুমায়ুন কবির বলেন, “একটি অনুকূল সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সফর হবে এবং সে বিষয়ে আমি আশাবাদী। প্রধানমন্ত্রী কখনো বলেননি যে তিনি (ভারত) সফর করবেন না।”
অর্থাৎ, সফরের সম্ভাবনা নাকচ করা হয়নি; বরং উপযুক্ত কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরি হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর হতে পারে বলে সরকারের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
দুই দেশের সম্পর্কের সামনে কী বার্তা?
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে মূলত তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা খোলা রয়েছে এবং সফরের আগে দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাদের কর্মকাণ্ডকে ঢাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।
ঢাকার প্রত্যাশা, ভারতীয় ভূখণ্ড বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির কোনো কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হবে না। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্বার্থে দুই দেশই পারস্পরিক সংবেদনশীলতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখাবে।
এই প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর শুধু আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর নয়, বরং দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

