ঢাকা মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর, ২০২৬

menu

বন্ড সুবিধার ১৩.৩৫ লাখ কেজি কাঁচামাল উধাও, JASS ACCESSORIES-এ ৯.১০ কোটি টাকার শুল্ক-কর ঝুঁকি

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:

প্রকাশিত: অক্টোবর ৬, ২০২৬, ০১:৪৮ পিএম

বন্ড সুবিধার ১৩.৩৫ লাখ কেজি কাঁচামাল উধাও, JASS ACCESSORIES-এ ৯.১০ কোটি টাকার শুল্ক-কর ঝুঁকি

ছবিঃ সংগৃহীত

বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের মজুত নিয়ে বড় ধরনের অসঙ্গতির তথ্য পেয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (CIID)। চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে অবস্থিত JASS ACCESSORIES (BD) LTD.-এ অভিযান চালিয়ে অনলাইন ইউপি (Utilization Permission) তথ্যের সঙ্গে বন্ডেড ওয়্যারহাউসে বাস্তব মজুতের বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেছে।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির পরিদর্শন ও যাচাই কার্যক্রম পরিচালনা করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এ সময় অনলাইন ইউপিতে উল্লেখ থাকা কাঁচামালের তুলনায় বাস্তবে প্রায় ১৩ লাখ ৩৫ হাজার কেজি কাঁচামাল কম পাওয়া যায়। সর্বশেষ আমদানিকৃত বিল অব এন্ট্রিতে ঘোষিত মূল্য বিবেচনায় পাওয়া না যাওয়া এসব কাঁচামালের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ২৪ কোটি ৯৬ লাখ ৬৭ হাজার ৬৪১ টাকা। এর বিপরীতে সংশ্লিষ্ট শুল্ক-করাদির পরিমাণ প্রায় ৯ কোটি ১০ লাখ ৪৭ হাজার ১৫৪ টাকা বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

অনলাইন ইউপিতে ১৯.২০ লাখ কেজি, মজুত মাত্র ৫.৮৫ লাখ

CIID-এর পরিদর্শন ও যাচাই কার্যক্রমের তথ্য অনুযায়ী, JASS ACCESSORIES (BD) LTD.-এর বন্ডেড ওয়্যারহাউসে বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল থাকার তথ্য অনলাইন ইউপিতে সংরক্ষিত ছিল।

অনলাইন ইউপি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির গুদামে মোট ১৯,২০,৮৫৭ কেজি কাঁচামাল থাকার কথা। কিন্তু সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় পাওয়া যায় মাত্র ৫,৮৫,৫৮১ দশমিক ২ কেজি।

অর্থাৎ অনলাইন রেকর্ডের তুলনায় বাস্তব মজুতে ঘাটতি পাওয়া গেছে ১৩,৩৫,২৭৫ দশমিক ৮ কেজি কাঁচামালের। কেজিতে এ পরিমাণ প্রায় ১৩ দশমিক ৩৫ লাখ।

এত বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের ঘাটতির বিষয়টিই বর্তমানে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের যাচাইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

কোন কোন কাঁচামাল আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি

JASS ACCESSORIES (BD) LTD. বন্ডেড সুবিধার আওতায় বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে—

LDPE,HDPE,LLDPE,P.P,GPPS,HIPS,BOPP,Duplex,Board,Rubber Thread, Yarn

বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানি করা এসব কাঁচামাল সাধারণত অনুমোদিত উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে থাকে। ফলে কাগজপত্রে দেখানো মজুত এবং বাস্তব মজুতের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকলে এর কারণ নির্ধারণ করা কাস্টমস কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

১৩.৩৫ লাখ কেজি কাঁচামাল কোথায় গেল?

পরিদর্শনে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—অনলাইন ইউপিতে থাকা বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের সঙ্গে বাস্তব মজুতের এত বড় পার্থক্য কেন?

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। এসব কাঁচামাল প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, উৎপাদন ও ব্যবহারসংক্রান্ত হিসাবের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য রয়েছে কি না এবং কোনো পর্যায়ে বন্ড সুবিধার শর্ত লঙ্ঘন হয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে কাঁচামালগুলো নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহৃত, রপ্তানিপণ্য উৎপাদনে অন্তর্ভুক্ত অথবা বৈধভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে কি না, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও হিসাবের মাধ্যমে তা যাচাই করা হবে।

শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা

প্রাথমিক যাচাইয়ে বন্ডেড ওয়্যারহাউসে পাওয়া না যাওয়া কাঁচামালের সর্বশেষ আমদানিকৃত বিল অব এন্ট্রিতে ঘোষিত মূল্য বিবেচনায় শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ২৪ কোটি ৯৬ লাখ ৬৭ হাজার ৬৪১ টাকা।

এর বিপরীতে সংশ্লিষ্ট শুল্ক-করাদির পরিমাণ প্রায় ৯ কোটি ১০ লাখ ৪৭ হাজার ১৫৪ টাকা।

অর্থাৎ, হিসাব অনুযায়ী বন্ডেড ওয়্যারহাউসে থাকার কথা থাকা কাঁচামালের একটি বড় অংশের বাস্তব মজুত না পাওয়ায় প্রায় ৯ কোটি ১০ লাখ টাকার শুল্ক-কর ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এসেছে।

তবে এ পরিমাণকে চূড়ান্ত রাজস্ব দাবি হিসেবে বিবেচনা করার আগে সংশ্লিষ্ট নথি, আমদানি-রপ্তানি তথ্য, উৎপাদন হিসাব, ইউপি, ইনভেন্টরি রেকর্ড এবং অন্যান্য দলিলপত্রের বিস্তারিত যাচাই প্রয়োজন।

বন্ড সুবিধার কাঁচামালের হিসাব কেন গুরুত্বপূর্ণ

বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের জন্য শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা মূলত রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়। এই সুবিধার আওতায় আমদানি করা কাঁচামালের ব্যবহার, মজুত ও নিষ্পত্তির হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো প্রতিষ্ঠানের রেকর্ডে নির্দিষ্ট পরিমাণ কাঁচামাল মজুত দেখানো থাকলেও বাস্তবে তার উল্লেখযোগ্য অংশ না পাওয়া গেলে কাঁচামালের ব্যবহার, উৎপাদন, রপ্তানি এবং মজুত ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

তবে শুধু মজুতের ঘাটতি পাওয়া গেলেই বন্ড সুবিধার অপব্যবহার প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কাঁচামাল ব্যবহারের হিসাব, উৎপাদন ও রপ্তানি নথি, পূর্ববর্তী মজুত, অনুমোদিত ইউপি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য রেকর্ড পর্যালোচনার পরই প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে।

আরও যেসব নথি যাচাই হতে পারে

বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট আমদানি ও বন্ড নথি যাচাই করা হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে আমদানিকৃত কাঁচামালের বিল অব এন্ট্রি, ইনভয়েস, ইউপি, বন্ড রেজিস্টার, গুদাম মজুত রেজিস্টার, উৎপাদন ও ব্যবহারসংক্রান্ত হিসাব, রপ্তানি নথি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দলিল।

কাঁচামালের পরিমাণ, আমদানির সময়, ব্যবহারের হিসাব এবং রপ্তানির সঙ্গে এসব তথ্য মিলিয়ে দেখলে ঘাটতির প্রকৃত কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।

আইনানুগ ব্যবস্থা তদন্ত শেষে

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানিয়েছে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে। বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল অনুমোদিত উদ্দেশ্যে যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, নাকি কোনো পর্যায়ে বন্ড সুবিধার শর্তের ব্যত্যয় ঘটেছে—তা তদন্ত ও দলিলপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।

বিস্তারিত তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই শেষে প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুযায়ী পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ফলে বর্তমানে JASS ACCESSORIES (BD) LTD.-এর বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বা শুল্ক ফাঁকির কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। বরং CIID-এর পরিদর্শনে পাওয়া ১৩,৩৫,২৭৫ দশমিক ৮ কেজি কাঁচামালের ঘাটতি এবং প্রায় ৯ কোটি ১০ লাখ টাকার শুল্ক-কর ঝুঁকির তথ্য এখন বিস্তারিত যাচাই ও তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!