চট্টগ্রাম বন্দরে ‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’ ঘোষণার আড়ালে খণ্ডিত অবস্থায় গাড়ি ও গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমদানির ঘটনা শনাক্ত করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। সন্দেহভাজন একটি পণ্যচালানের কায়িক পরীক্ষায় ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবে পাওয়া পণ্যের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য ধরা পড়েছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) চালানটির কায়িক পরীক্ষা চালানো হয়। এতে খণ্ডিত অবস্থায় একটি বিএমডব্লিউ স্পোর্টস বা রেসিং কার, একটি বিএমডব্লিউ ৭৪০আই গাড়ির সামনের অংশ এবং পাঁচটি খণ্ডিত ইসুজু ট্রাক পাওয়া যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশও উদ্ধার করা হয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আল আমিন শেখ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য
কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট চালানে ব্যবহৃত গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানির কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু কায়িক পরীক্ষায় এমন কিছু পণ্য পাওয়া যায়, যেগুলোর ধরন ও অবস্থার সঙ্গে ঘোষিত পণ্যের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
পরীক্ষার সময় কর্মকর্তারা খণ্ডিত অবস্থায় গাড়ির বিভিন্ন অংশ শনাক্ত করেন। বিশেষ করে একটি সম্পূর্ণ স্পোর্টস বা রেসিং কারের বিভিন্ন অংশ এবং বিএমডব্লিউ ৭৪০আইয়ের সামনের অংশ পাওয়ায় চালানটির প্রকৃত পণ্য ও ঘোষণার মধ্যে অসামঞ্জস্য আরও স্পষ্ট হয়।
কাস্টমস গোয়েন্দা এখন খতিয়ে দেখছে, এসব পণ্য আমদানির সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ঘোষণায় তথ্য গোপন বা পরিবর্তন করা হয়েছিল কি না এবং এর মাধ্যমে কোনো ধরনের শুল্ক-কর সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে কি না।
খণ্ডিত অবস্থায় বিএমডব্লিউ স্পোর্টস কার
কায়িক পরীক্ষায় প্রথমে দুই আসনের একটি বিএমডব্লিউ স্পোর্টস বা রেসিং কারের খণ্ডিত অংশ পাওয়া যায়।
প্রাথমিকভাবে গাড়িটির মডেল ‘এস ড্রাইভ ২৩আই’ বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা। গাড়িটির ইঞ্জিন ক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৫০০ সিসি এবং এটি ২০০৯ সালের মডেল হতে পারে বলেও প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে কাস্টমস গোয়েন্দা জানিয়েছে, গাড়িটির প্রকৃত মডেল সাল, চেসিস নম্বর, ভিআইএন, ইঞ্জিনসংক্রান্ত তথ্য এবং বাংলাদেশে আমদানির বৈধতা এখনো চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। প্রয়োজনীয় নথিপত্র, কারিগরি যাচাই ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনার পর এসব বিষয় নিশ্চিত করা হবে।
বিএমডব্লিউ ৭৪০আইয়ের শুধু সামনের অংশ
চালানটিতে আরও পাওয়া গেছে একটি বিএমডব্লিউ ৭৪০আই গাড়ির খণ্ডিত সামনের অংশ বা সামনের অর্ধাংশ।
প্রাথমিকভাবে গাড়িটির মডেল ২০১৬ সালের এবং ইঞ্জিন ক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার সিসি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই গাড়ির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে নজর দিয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দারা। কারণ চালানটিতে গাড়িটির শুধু সামনের অংশ পাওয়া গেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, গাড়িটির বাকি অংশ কোথায় রয়েছে এবং সেটি অন্য কোনো চালানের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরে আনা হয়েছে বা আনার চেষ্টা করা হচ্ছে কি না।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট অন্য চালানের তথ্যও যাচাই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই আমদানিকারক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অন্য চালানে গাড়িটির বাকি অংশের কোনো অংশ রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসছে।
পাঁচটি খণ্ডিত ইসুজু ট্রাক
চালানটিতে খণ্ডিত অবস্থায় পাঁচটি ইসুজু ট্রাকও পাওয়া গেছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা জানায়, প্রতিটি ট্রাকের কেবিনের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের গাড়ির যন্ত্রাংশ প্যাক করে রাখা হয়েছিল। এতে একদিকে পণ্য শনাক্তকরণ ও পরিমাণ নির্ধারণের বিষয়টি জটিল হয়েছে, অন্যদিকে ঘোষণার সঙ্গে প্রকৃত পণ্যের সামঞ্জস্য যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
পাঁচটি ট্রাকের খণ্ডিত অংশ ছাড়াও চালানটিতে আরও বিভিন্ন ধরনের ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়।
কেন খণ্ডিত করে আনা হলো, খতিয়ে দেখছে সিআইআইডি
কাস্টমস গোয়েন্দার তদন্তে এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—গাড়িগুলো কেন সম্পূর্ণ অবস্থায় না এনে খণ্ডিত করে বিভিন্ন অংশে আমদানি করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের সন্দেহের বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে, খণ্ডিত গাড়ির বিভিন্ন অংশ আলাদা চালানে এনে পরে পুনরায় সংযোজনের কোনো কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে কি না। একই সঙ্গে কোনো গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভিন্ন নামে বা ভিন্ন পণ্যের বিবরণ দিয়ে আমদানি করা হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হবে।
বিশেষ করে বিএমডব্লিউ ৭৪০আইয়ের বাকি অংশের অবস্থান শনাক্ত করা গেলে চালানটির প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
শুল্ক-কর ফাঁকির চেষ্টা হয়েছিল কি না
ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে কায়িক পরীক্ষায় পাওয়া পণ্যের বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় সম্ভাব্য শুল্ক-কর ফাঁকির বিষয়টিও তদন্তের আওতায় এসেছে।
কাস্টমস গোয়েন্দারা উদ্ধার হওয়া প্রতিটি পণ্যের প্রকৃত ধরন, মূল্য, পরিমাণ, মডেল, চেসিস নম্বর, ভিআইএন ও ইঞ্জিনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করবেন। এরপর সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক ও কর নির্ধারণের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে শুল্ক-কর ফাঁকি বা ঘোষণায় ইচ্ছাকৃত কারচুপির বিষয়টি চূড়ান্তভাবে বলা হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই শেষে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
যাচাই হবে আমদানি নীতিমালাও
কাস্টমস গোয়েন্দা উদ্ধার হওয়া গাড়ি ও যন্ত্রাংশের আমদানি বৈধতা যাচাই করবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আমদানি নথি, বিল অব এন্ট্রি, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, পরিবহনসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অন্যান্য দলিল পর্যালোচনা করা হবে।
একই সঙ্গে গাড়িগুলোর প্রকৃত উৎপাদন বছর, মডেল, চেসিস ও ভিআইএন নম্বর এবং আমদানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিনিষেধ বা শর্ত পূরণ করা হয়েছে কি না, তাও পরীক্ষা করা হবে।
‘ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ’ ঘোষণার আড়ালে কী ছিল?
চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি করা পণ্যের ঘোষণাপত্রে কী ধরনের পণ্য উল্লেখ করা হয়েছে এবং বাস্তবে কনটেইনার খুলে কী পাওয়া যাচ্ছে—এ দুটির মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা কাস্টমস ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সিআইআইডির এই অভিযানে ঘোষিত ‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’-এর পরিবর্তে খণ্ডিত গাড়ি ও গাড়ির বড় অংশ পাওয়ায় চালানটির প্রকৃত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ও পণ্য ঘোষণার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা এখন নথিপত্র, কায়িক পরীক্ষার ফল এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য চালানের তথ্য মিলিয়ে বিষয়টি বিশ্লেষণ করছে।
আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানিয়েছে, যাচাই-বাছাই শেষে কাস্টমস আইন, ২০২৩ এবং প্রযোজ্য অন্যান্য বিধিবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্তে যদি ঘোষণায় কারচুপি, শুল্ক-কর ফাঁকি বা আমদানি নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
বন্দরে নজরদারি জোরদার
এ ঘটনার পর চট্টগ্রাম বন্দরে ঘোষণার আড়ালে গাড়ি, গাড়ির খণ্ডিত অংশ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ আমদানির চেষ্টা শনাক্তে কাস্টমস গোয়েন্দার নজরদারি আরও জোরদার করার বিষয়টি সামনে এসেছে।
বিশেষ করে উচ্চমূল্যের গাড়ির অংশ, খণ্ডিত গাড়ি এবং ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের চালানগুলোতে ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব পণ্যের মিল রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য হলো বৈধ বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত না করে একই সঙ্গে ভুল বা বিভ্রান্তিকর ঘোষণা, সম্ভাব্য শুল্ক-কর ফাঁকি এবং আমদানি নীতিমালা লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিরোধ করা।

