চট্টগ্রাম বন্দরের অতিগুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে দুবাইভিত্তিক বিশ্বখ্যাত বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে ১৫ বছর মেয়াদি পরিচালনা চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দুই পক্ষের মধ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিকভাবে অভিজ্ঞ একটি টার্মিনাল অপারেটর এনসিটির দায়িত্ব নেওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, অপারেশনাল দক্ষতা এবং বন্দরসেবার মানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
ছয় মাস পর পুরোদমে পরিচালনা
চুক্তি সই হলেও ডিপি ওয়ার্ল্ড তাৎক্ষণিকভাবে এনসিটির পূর্ণাঙ্গ পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছে না। নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, পুরোদমে কার্যক্রম শুরু করতে প্রতিষ্ঠানটির আরও অন্তত ছয় মাস সময় লাগবে।
এই সময়ের মধ্যে এনসিটির প্রয়োজনীয় সংস্কার, অবকাঠামোগত প্রস্তুতি এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের কাজ সম্পন্ন করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনালের অপারেশনাল কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
অর্থাৎ চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই বন্দর পরিচালনায় দৃশ্যমান পরিবর্তনের বদলে আগামী কয়েক মাস প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরি নিয়ে আশ্বাস
এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে যাওয়ায় বন্দর শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে নৌপরিবহন মন্ত্রী স্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড পরিচালনার দায়িত্ব পেলেও চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো শ্রমিক, কর্মকর্তা বা কর্মচারী চাকরি হারাবেন না কিংবা বেকার হবেন না।
সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের স্বার্থ ও কর্মসংস্থানের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা জানানো হয়েছে। ফলে নতুন অপারেটর যুক্ত হওয়ার সঙ্গে বিদ্যমান জনবলের চাকরির নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
‘স্মার্ট বন্দর’ গড়ে তোলার প্রত্যাশা
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড কেবল টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব নিতে আসছে না; এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরিচালনার বিনিময়ে বাংলাদেশ একটি আধুনিক ও স্মার্ট বন্দর, আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনশক্তি এবং সামগ্রিকভাবে আরও সমৃদ্ধ অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বন্দর ও কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকা ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এনসিটির কার্যক্রমে যুক্ত হলে বন্দরের অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
স্বচ্ছতা ও জাতীয় স্বার্থে গুরুত্ব
অনুষ্ঠানে ডিপি ওয়ার্ল্ড পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এসা কাজিম বলেন, বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে চারটি মূল নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এর মধ্যে অংশীদারদের সঙ্গে স্বচ্ছতা বজায় রাখা, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়নের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।
তার বক্তব্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব এবং বাংলাদেশের বন্দর খাতের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখার বিষয়টিও উঠে আসে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এনসিটি?
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের আমদানি-রপ্তানি পণ্যের বড় একটি অংশ এই বন্দরের মাধ্যমে পরিবহন হয়। ফলে বন্দরের কনটেইনার ব্যবস্থাপনার দক্ষতা সরাসরি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, পণ্য সরবরাহ এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের ওপর প্রভাব ফেলে।
এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার টার্মিনাল। এখানে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানো, ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা, পণ্য স্থানান্তরসহ নানা ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
টার্মিনালের কার্যক্রমে গতি বাড়লে জাহাজের অপেক্ষার সময় কমানো, কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের জন্য বন্দর ব্যবহারের সময় ও খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক, পণ্য আমদানি, শিল্পের কাঁচামাল এবং বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের পরিবহন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব পণ্য পরিবহনে বন্দরসেবার দক্ষতা কম হলে জাহাজ ও কনটেইনার জট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটির পরিচালন ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে পারলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়বে। এতে জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় কমার পাশাপাশি বন্দরের সার্বিক সক্ষমতাও বাড়তে পারে।
এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ পরিবেশে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নে জোর
চুক্তির পর আগামী ছয় মাসের প্রস্তুতি পর্বে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক বন্দর পরিচালনায় স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, ডিজিটাল ডাটা ব্যবস্থাপনা, দ্রুত কনটেইনার শনাক্তকরণ, ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর অপারেশনাল পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এনসিটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নত করা গেলে বন্দরের কার্যক্রম আরও সমন্বিত ও গতিশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
১৫ বছরের চুক্তির তাৎপর্য
এনসিটি পরিচালনার জন্য ১৫ বছরের চুক্তি হওয়ায় এটি স্বল্পমেয়াদি কোনো ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ নয়। দীর্ঘ সময়ের জন্য একজন আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত হওয়ায় অবকাঠামো, প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং পরিচালন ব্যবস্থায় ধারাবাহিক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা, সেবার মান বৃদ্ধি এবং বন্দরের জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করার ওপর।
বন্দর ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়ের প্রত্যাশা
চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের যুক্ত হওয়াকে দেশের বন্দর খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এখন মূল নজর থাকবে আগামী ছয় মাসের প্রস্তুতি, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং পরবর্তী সময়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা শুরুর দিকে। প্রত্যাশা অনুযায়ী কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের আরও দক্ষ, দ্রুত ও আধুনিক কনটেইনার টার্মিনালে পরিণত হতে পারে।

