করোনাভাইরাস মহামারির সময় সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, বাজার ও জনবহুল এলাকায় হাত ধোয়ার জন্য যেসব বেসিন, পানির ট্যাংক ও বিশেষ স্টেশন স্থাপন করা হয়েছিল, তার অধিকাংশই এখন অকার্যকর কিংবা উধাও। কোথাও বেসিন থাকলেও পানি নেই, কোথাও ট্যাপ নষ্ট, আবার কোথাও সাবান বা হ্যান্ডওয়াশের ব্যবস্থা নেই। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পর্যাপ্ত বাজেট ও তদারকির অভাবে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নেওয়া এসব উদ্যোগ কার্যকারিতা হারিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ।
অন্যদিকে, রাজধানীর কয়েকটি বড় সরকারি হাসপাতালের ওয়াশরুমে অপরিচ্ছন্নতা, পানির সংকট, নষ্ট ফ্লাশ এবং সাবান-টিস্যুর অনুপস্থিতির অভিযোগ উঠেছে। এতে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের ভোগান্তি বাড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও হাত ধোয়ার মৌলিক সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ‘ওয়াশ ইন এডুকেশনাল অ্যান্ড হেলথকেয়ার ফ্যাসিলিটিজ সার্ভে ২০২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাত্র ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাত ধোয়ার মৌলিক সেবা রয়েছে। আর মাত্র ১১ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) খাতে নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ রয়েছে।

বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসের প্রেক্ষাপটে এসব তথ্য ও বাস্তবতা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
করোনাকালের উদ্যোগ, এখন অধিকাংশই অকার্যকর
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে ২০২০ সালে দেশজুড়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি অফিস, কাঁচাবাজার, বাস ও রেলস্টেশন এবং বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছিল। অনেক জায়গায় বসানো হয়েছিল পানির ট্যাংক, বেসিন ও ট্যাপ। পাশাপাশি সাবান-পানি দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
রাজধানীতে ঢাকা ওয়াসার উদ্যোগে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে হাত ধোয়ার জন্য পানির ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছিল। সুইডিশ দূতাবাস ও ঢাকা ওয়াসার যৌথ উদ্যোগে ‘হ্যান্ড ওয়াশিং অন হুইলস’ নামে একটি কর্মসূচিও চালু হয়। কর্মসূচির আওতায় হাত ধোয়ার সুবিধাসম্পন্ন ১০টি ভ্যান ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াত এবং ওয়াসা সেগুলোতে বিনামূল্যে পানি সরবরাহ করত।
কিন্তু মহামারির জরুরি পরিস্থিতি কেটে যাওয়ার পর এসব উদ্যোগের অনেকগুলোই আর সচল রাখা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। রাজধানীর বাংলামোটর এলাকায় পুলিশ বক্সের পাশে আগে স্থাপিত পানির ট্যাংকটি এখন আর নেই। কারওয়ান বাজার মোড় ও ঢাকা ওয়াসা ভবনের সামনেসহ বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত ট্যাংকগুলোরও অধিকাংশ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে।

কারওয়ান বাজার মোড়ে পুলিশ বক্সের সামনে স্থাপিত একটি ট্যাংক নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যান্য স্থানে থাকা কিছু বেসিন বা হাত ধোয়ার অবকাঠামোও পানি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
ফলে মহামারির সময় জরুরি ভিত্তিতে তৈরি করা অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। প্রশ্ন উঠেছে, এসব স্থাপনা নির্মাণ ও পরিচালনায় যে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করা হয়েছিল, নিয়মিত তদারকি থাকলে সেগুলোর কতটা সচল রাখা সম্ভব হতো।
সরকারি হাসপাতালের ওয়াশরুমে দুর্ভোগ
রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে। হাসপাতালটিতে রোগীর চাপের তুলনায় ওয়াশরুমের সংখ্যা কম বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবহারকারীরা। পুরুষদের জন্য মাত্র তিনটি ওয়াশরুম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওয়াশরুমের পরিবেশ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কয়েকটি টয়লেটের ফ্লাশ নষ্ট, কোথাও সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ নেই, আবার কোথাও পানির ট্যাপ কিংবা বদনারও সংকট দেখা গেছে। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত না হওয়ায় রোগী ও তাঁদের স্বজনদের এসব ওয়াশরুম ব্যবহার করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
বাবাকে নিয়ে টানা তিন দিন হাসপাতালে যাতায়াত করা রোগীর স্বজন মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সময় হাসপাতালে অবস্থান করতে হলেও ওয়াশরুম ব্যবহার করা কষ্টকর। তাঁর ভাষায়, কিডনি ও ইউরোলজির রোগীদের জন্য ওয়াশরুম ব্যবহারের এমন পরিস্থিতি অত্যন্ত দুর্ভোগের।

তিনি অভিযোগ করেন, ওয়াশরুমের অবস্থা এতটাই খারাপ যে দেখে মনে হয় দীর্ঘদিন পরিষ্কার করা হয়নি। সরকারি হাসপাতাল হলেও অন্তত ব্যবহার উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। রোগীদের কয়েকজন স্বজনের দাবি, ওয়াশরুমের অপরিচ্ছন্নতা ও প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে তাঁরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। কেউ কেউ হাসপাতালের ওয়াশরুম ব্যবহার না করে বাইরে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন।
রোগীর স্বজন সাব্বির মাহমুদ বলেন, হাসপাতালের টয়লেট ও ওয়াশরুমের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। তাঁর অভিযোগ, সেখানে সাবান-হ্যান্ডওয়াশ তো নেই-ই, এমনকি টিস্যুও পাওয়া যায় না।
আরেক রোগী আঞ্জুমান আরা ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার সময় নাকে কাপড় দিয়ে দুর্গন্ধ এড়ানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, হাসপাতালের ওয়াশরুমগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কিডনি ও ইউরোলজির রোগীদের ঘন ঘন ওয়াশরুমে যেতে হয়, অথচ সেখানে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নেই।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহের বর্তমান ব্যবস্থার বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় অর্ধেকেই নেই মৌলিক সুবিধা
শুধু হাসপাতাল নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও হাত ধোয়ার সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়েছে। বিবিএস ও ইউনিসেফের ‘ওয়াশ ইন এডুকেশনাল অ্যান্ড হেলথকেয়ার ফ্যাসিলিটিজ সার্ভে ২০২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাত ধোয়ার মৌলিক সেবা রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই সুবিধা নেই।
জরিপে আরও দেখা গেছে, দেশের ৯৫ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উন্নত পানির উৎস থাকলেও প্রতিষ্ঠানের ভেতরে পানির সুবিধা রয়েছে ৮৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে। প্রতিবন্ধীবান্ধব উন্নত পানির পয়েন্ট রয়েছে মাত্র ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মাত্র ১১ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি খাতে নির্দিষ্ট বাজেট রয়েছে। ফলে হাত ধোয়ার বেসিনের ট্যাপ নষ্ট হওয়া, পানির পাইপে সমস্যা দেখা দেওয়া কিংবা সাবান শেষ হয়ে যাওয়ার মতো সাধারণ সমস্যার দ্রুত সমাধান না হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়ে হাত ধোয়ার জন্য জরুরি ভিত্তিতে স্থাপন করা কয়েকটি বেসিন ও ওয়াশ সেন্টার অকার্যকর অবস্থায় দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাত ধোয়ার সুযোগ না থাকলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি চর্চা ব্যাহত হয়। বিশেষ করে ছোট শিশুদের মধ্যে খাবারের আগে এবং শৌচাগার ব্যবহারের পর হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে কার্যকর অবকাঠামো ও নিয়মিত তদারকি গুরুত্বপূর্ণ।
রক্ষণাবেক্ষণে বরাদ্দ থাকলেও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে বরাদ্দের নজির রয়েছে। চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪)-এর আওতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২ হাজার ৫১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৩ হাজার ৪১২টি ওয়াশ ব্লকের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২৩ কোটি ৪১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ ছাড়ের তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিটি ওয়াশ ব্লকের জন্য বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার টাকা।
নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোন বিদ্যালয়ে কতটুকু কাজ হয়েছে, কতটি ওয়াশ ব্লক সচল রয়েছে, কোথায় মেরামত প্রয়োজন এবং বরাদ্দের অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হয়েছে—এসব বিষয়ে হালনাগাদ ও সমন্বিত তথ্যের ঘাটতির কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও অবকাঠামো ব্যবহার অনুপযোগী থাকলে অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা, কাজের মান এবং তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। তাই শুধু বরাদ্দ ছাড় নয়, বাস্তবে কাজ সম্পন্ন হয়েছে কি না এবং সুবিধাগুলো নিয়মিত ব্যবহার করা যাচ্ছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
হাত ধোয়া শুধু অভ্যাস নয়, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ
হাত ধোয়ার অভ্যাস ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দূষিত হাতের মাধ্যমে জীবাণু খাবার, পানি ও মুখে প্রবেশ করতে পারে। নিরাপদ পানি ও সাবান দিয়ে সঠিকভাবে হাত ধোয়া এসব সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায়।
ইউনিসেফের নির্দেশনা অনুযায়ী, নিরাপদ প্রবাহমান পানিতে হাত ভিজিয়ে পর্যাপ্ত সাবান দিয়ে হাতের তালু, হাতের পিঠ, আঙুলের ফাঁক ও নখের নিচসহ সব অংশ অন্তত ২০ সেকেন্ড ঘষে পরিষ্কার করতে হবে। এরপর পরিষ্কার পানিতে হাত ধুয়ে শুকিয়ে নিতে হবে। খাবারের আগে, শৌচাগার ব্যবহারের পর এবং নাক-মুখ পরিষ্কারের পর হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিবিএস ও ইউনিসেফের ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, জরিপের আগের দুই সপ্তাহে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৭ দশমিক ১ শতাংশের ডায়রিয়া হয়েছিল। শহরাঞ্চলে এ হার ৬ দশমিক ৬ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। বিভাগভেদে চট্টগ্রামে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং বরিশালে ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশুর ডায়রিয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
তবে এসব ডায়রিয়ার ঘটনা শুধু হাত না ধোয়ার কারণে ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। দূষিত পানি, অনিরাপদ খাবার, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশনসহ বিভিন্ন কারণ ডায়রিয়ার জন্য দায়ী হতে পারে। স্বাস্থ্যসম্মতভাবে হাত ধোয়া এসব ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
একই জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের বাসস্থানে পানি ও সাবানসহ হাত ধোয়ার সুবিধা রয়েছে। শহরাঞ্চলে এ হার ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৬৫ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের বাড়িতেও পানি ও সাবানসহ হাত ধোয়ার মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত নয়।
এ অবস্থায় স্কুল, হাসপাতাল, সরকারি অফিস ও জনসমাগমস্থলে সচল হাত ধোয়ার ব্যবস্থা থাকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, এসব জায়গায় নিয়মিত হাত ধোয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে স্বাস্থ্যবিধি চর্চা বাড়ানো এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা পাওয়া যায়।
বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসের বার্তা: অবকাঠামো সচল রাখতে হবে
১৫ অক্টোবর বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘বি এ হ্যান্ডওয়াশিং হিরো!’—বাংলায় অর্থ, ‘হাত ধোয়ার নায়ক হোন!’ গ্লোবাল হ্যান্ডওয়াশিং পার্টনারশিপের এই প্রতিপাদ্যের লক্ষ্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা ও তা সম্মিলিত চর্চায় পরিণত করা।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর দৃষ্টিতে, শুধু দিবস পালন বা সচেতনতামূলক প্রচার চালিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। মানুষের হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখতে বাস্তবে পানি ও সাবানের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বেসিন, ট্যাপ ও পানির সংযোগ সচল রাখা, নষ্ট সরঞ্জাম দ্রুত মেরামত এবং পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের ওয়াশ সেক্টরের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর মো. শাহীন বলেন, হাত ধোয়ার গুরুত্ব প্রচারের পাশাপাশি মানুষ যাতে বাস্তবে হাত ধুতে পারে, সেই সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেসিন-ট্যাপ সচল রাখা, নিরাপদ পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, সাবান কেনার নিয়মিত অর্থের সংস্থান এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নির্ধারণ—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সরকারি বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার এবং শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট দপ্তরের নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিও গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড-১৯ মহামারি হাত ধোয়ার মতো সহজ একটি অভ্যাসের জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্ব দেখিয়েছে। কিন্তু সেই শিক্ষা যদি শুধু মহামারির সময়ের জরুরি ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে অবকাঠামো নির্মাণের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বক্তব্য
সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা, অতিরিক্ত দায়িত্ব) এহতেশামুল রাসেল খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অফিসিয়াল অনুমোদন ছাড়া তথ্য দিতে রাজি হননি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঢাকা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (মানবসম্পদ ও প্রশাসন) এ কে এম ফজলুল হকের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়; তবে তিনি ফোন ধরেননি।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর বক্তব্য পাওয়া গেলে হাত ধোয়ার অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ, বাজেট বরাদ্দ, পানি সরবরাহ এবং তদারকির বর্তমান ব্যবস্থা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে।
শুধু স্থাপন নয়, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার দাবি
করোনাভাইরাস মহামারি দেখিয়েছে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় হাত ধোয়ার মতো সাধারণ অভ্যাসও কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মহামারির জরুরি পরিস্থিতি শেষ হওয়ার পর হাত ধোয়ার অবকাঠামো সচল রাখা, সাবান-পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা দিলে সেই উদ্যোগের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনবহুল স্থানে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা সচল রাখতে নির্দিষ্ট বাজেট, নিয়মিত পরিদর্শন, দ্রুত মেরামত এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি বরাদ্দের ব্যবহার ও অবকাঠামোর কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে ঘাটতি চিহ্নিত করা সহজ হবে।
বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসের মূল বার্তা তাই কেবল সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা নয়; বরং সেই অভ্যাস চর্চার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। হাত ধোয়ার স্টেশন স্থাপন করে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা নয়, বরং সেগুলো সচল রাখা এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্থায়ী অগ্রাধিকার।

