বাংলাদেশ সচিবালয় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে স্থানান্তরের প্রস্তাব আগামী মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদনের জন্য তোলা হবে বলে জানিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়া গেলে সচিবালয় স্থানান্তরের পরবর্তী কার্যক্রম দ্রুত শুরু করা হবে। বর্তমান সরকারের মেয়াদেই নতুন স্থানে সচিবালয়ের কার্যক্রম পুরোপুরি স্থানান্তরের লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতিমূলক কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সচিবালয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী। তিনি জানান, সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে আগে থেকেই একটি মাস্টারপ্ল্যান ছিল। সেই পরিকল্পনার ভিত্তিতে নীতিগত কাজ ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল। এখন প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে পরবর্তী পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও সদিচ্ছার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, বর্তমান সরকারের মেয়াদের মধ্যেই সচিবালয় স্থানান্তরের প্রাথমিক ও মূল কার্যক্রম সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
কেন আগারগাঁওয়ে স্থানান্তরের পরিকল্পনা?
বর্তমান সচিবালয়ে স্থানসংকট, যানবাহন পার্কিংয়ের সমস্যা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দপ্তর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার বিষয়টি স্থানান্তরের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান সচিবালয় এলাকায় পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে অনেক মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরের কার্যক্রম মূল ভবনের বাইরে পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে দাপ্তরিক কাজের সমন্বয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চলাচল এবং নাগরিকদের সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
সচিবালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র। এখানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ফলে পর্যাপ্ত জায়গা, আধুনিক অবকাঠামো এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
আগারগাঁওয়ে সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সরকারি দপ্তরগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে নতুন স্থানে কী পরিমাণ জায়গা প্রয়োজন হবে, কতটি ভবন নির্মাণ করা হবে এবং কোন কোন মন্ত্রণালয় প্রথম পর্যায়ে স্থানান্তরিত হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা ও সরকারি সিদ্ধান্তের তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়।
পুরোনো ভবন নিয়ে নিরাপত্তার উদ্বেগ
বর্তমান সচিবালয়ের অবকাঠামো নিয়েও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সচিবালয়ের বেশির ভাগ ভবন ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এসব ভবনের সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় ভবনগুলোর নিরাপত্তা পর্যালোচনা এবং স্থায়ী বিকল্প খোঁজা জরুরি হয়ে পড়েছে।
পুরোনো ভবনের ক্ষেত্রে কাঠামোগত সক্ষমতা, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমনব্যবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব বিবেচনায় সচিবালয়ের ভবনগুলোর অবস্থা পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক অবকাঠামো নিয়ে পরিকল্পনা করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
তবে সচিবালয়ের কোন ভবনের কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি কতটা এবং স্থানান্তরের সঙ্গে ভবনগুলোর নিরাপত্তা মূল্যায়নের সম্পর্ক কী—এসব বিষয়ে বিস্তারিত কারিগরি তথ্য পাওয়া যায়নি।
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর শুরু হবে পরবর্তী কার্যক্রম
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জানিয়েছেন, সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাব আগামী মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। প্রতি সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়ে থাকে। তবে প্রস্তাবটি কোন তারিখে চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হবে, তা নির্ভর করছে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর।
মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়া গেলে স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে নতুন স্থানের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় ভবন নির্মাণ, প্রশাসনিক দপ্তরগুলোর স্থান নির্ধারণ, অর্থায়ন এবং স্থানান্তরের সময়সূচি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।
সচিবালয় স্থানান্তর একটি বড় প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত উদ্যোগ। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে শুধু ভবন নির্মাণ নয়, বরং মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম সচল রাখা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের সেবা যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
তবে প্রকল্পের ব্যয়, নির্মাণকাজের সময়সীমা, স্থানান্তরের ধাপ এবং নতুন সচিবালয়ের অবকাঠামোগত নকশা সম্পর্কে মন্ত্রীর বক্তব্যে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
বর্তমান সরকারের মেয়াদেই স্থানান্তরের লক্ষ্য
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, সব দিক বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান সরকারের মেয়াদের মধ্যেই সচিবালয় আগারগাঁওয়ে পুরোপুরি স্থানান্তরের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও সদিচ্ছার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়া গেলে সরকারের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণ ও স্থানান্তরের প্রাথমিক এবং মূল কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পুরো সচিবালয় স্থানান্তরের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন, অর্থ বরাদ্দ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতির কাজ সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। এসব কার্যক্রমের বাস্তব অগ্রগতির ওপরই স্থানান্তরের সময়সূচি নির্ভর করবে।
প্রশাসনিক কার্যক্রমে কী পরিবর্তন আসতে পারে?
সচিবালয় আগারগাঁওয়ে স্থানান্তরিত হলে সরকারি দপ্তরগুলোর অবকাঠামো ও কর্মপরিবেশে পরিবর্তন আসতে পারে। পরিকল্পিতভাবে নতুন ভবন নির্মাণ করা হলে মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়, দাপ্তরিক যোগাযোগ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে নতুন সচিবালয়ে যাতায়াতব্যবস্থা, যানবাহন পার্কিং, গণপরিবহনের সুবিধা, জনসাধারণের প্রবেশ ও সেবাপ্রাপ্তির ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তবে স্থানান্তরের ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম কতটা গতিশীল হবে, ব্যয় কতটা বাড়বে বা কমবে এবং সাধারণ নাগরিকদের সেবা গ্রহণে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে—তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতির ওপর।
সারকথা: বাংলাদেশ সচিবালয় আগারগাঁওয়ে স্থানান্তরের প্রস্তাব আগামী মন্ত্রিসভার বৈঠকে তোলার কথা জানিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়া গেলে পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে। বর্তমান সচিবালয়ের স্থানসংকট, পার্কিং সমস্যা এবং পুরোনো ভবনের নিরাপত্তার বিষয়গুলো স্থানান্তরের পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে। তবে প্রকল্পের ব্যয়, নির্মাণের সময়সীমা ও স্থানান্তরের বিস্তারিত রূপরেখা এখনো চূড়ান্তভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

