ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

menu

গাজীপুরে শিক্ষার্থীর আইফোন জব্দ, ট্র্যাকিং খরচের নামে ১৭ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৩, ২০২৬, ১২:১৪ পিএম

গাজীপুরে শিক্ষার্থীর আইফোন জব্দ, ট্র্যাকিং খরচের নামে ১৭ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ

ছবিঃ সংগৃহীত

গাজীপুরের শ্রীপুরে বৈধভাবে কেনা একটি আইফোন চোরাই বলে জব্দ করার পর মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের খরচের কথা বলে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ১৭ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের এক উপপরিদর্শকের (এসআই) বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী আবুল হাসনাত আয়ানের অভিযোগ, শ্রীপুর থানার এসআই মেহেদী হাসান টিটু তাঁকে থানায় নেওয়ার ভয় দেখিয়ে ওই টাকা আদায় করেন। তবে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার দাবি, চট্টগ্রাম থেকে চুরি যাওয়া একটি মোবাইল উদ্ধারে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি পদক্ষেপ নিয়েছেন।

এদিকে গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন জানিয়েছেন, মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের নামে কারও কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

যমুনা ফিউচার পার্ক থেকে আইফোন কেনেন শিক্ষার্থী

অভিযোগকারী আবুল হাসনাত আয়ান ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের মুলাইদ গ্রামের বাসিন্দা।

আয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কের একটি দোকান থেকে নগদ ১ লাখ ৫ হাজার টাকায় ব্যবহৃত একটি ‘আইফোন ১৬ প্রো ম্যাক্স’ কেনেন তিনি। ফোনটি কেনার পর দোকান থেকে ক্যাশ মেমো, মোবাইলের বক্সসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও সংগ্রহ করেন বলে দাবি তাঁর।

শিক্ষার্থীর দাবি, ফোনটি কেনার সময় তিনি জানতেন না যে সেটি চুরি যাওয়া কোনো মোবাইলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে। পরে পুলিশ তাঁর বাড়িতে গিয়ে ফোনটি চোরাই বলে দাবি করলে তিনি কেনাকাটার কাগজপত্র দেখান এবং বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করে ফোন কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন।

বাড়িতে গিয়ে ফোন চোরাই বলে দাবি পুলিশের

আয়ান জানান, গত শনিবার (১০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় শ্রীপুর থানার এসআই মেহেদী হাসান টিটু তাঁর বাড়িতে যান। এ সময় ওই পুলিশ কর্মকর্তা ফোনটি চোরাই বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে এক নারীকে অচেতন করে স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকাসহ ফোনটি চুরি করা হয়েছিল এবং এ ঘটনায় একটি সিআর মামলা রয়েছে বলে তাঁকে জানানো হয়।

আয়ানের দাবি, তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ফোন কেনার ক্যাশ মেমো ও বক্স দেখান। এমনকি পুলিশ কর্মকর্তার সামনেই দোকানদারের সঙ্গে কথা বলে ফোন কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এসব কাগজপত্র দেখানোর পরও পুলিশ কর্মকর্তা তাঁকে আশ্বস্ত করেননি।

আয়ান বলেন, ‘আমি দোকানের ক্যাশ মেমো ও বক্স দেখাই এবং এসআইয়ের সামনেই দোকানদারের সঙ্গে কথা বলে কেনাকাটার সত্যতা নিশ্চিত করি। কিন্তু তিনি বলেন, যেহেতু ফোন আমার কাছে পাওয়া গেছে, তাই সমস্যা আমারই।’

ট্র্যাকিং খরচের নামে ১৭ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আয়ানের অভিযোগ, ফোনটি চোরাই হওয়ার বিষয়ে তাঁর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার পাশাপাশি তাঁকে ও মোবাইলটি থানায় নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। পরে ফোনের ‘লোকেশন ট্র্যাকিং খরচ’ বাবদ তাঁর কাছে ১৭ হাজার টাকা দাবি করা হয়। একপর্যায়ে তিনি ওই টাকা দিতে বাধ্য হন বলে দাবি করেছেন।

আয়ানের প্রশ্ন, বৈধভাবে টাকা দিয়ে দোকান থেকে ফোন কেনার পরও কেন তাঁকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে এবং কেন তাঁকে পুলিশের সহায়তার বদলে অর্থ দিতে হবে?

তিনি বলেন, ‘আমি বাবার টাকায় বৈধভাবে দোকান থেকে ফোন কিনলাম, অথচ আমার টাকার ক্ষতি হলো। উল্টো ট্র্যাকিংয়ের নামে এসআই ১৭ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে গেলেন। আমি ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুলিশ কেন আমার সহায়তা করবে না?’

তবে ১৭ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো লেনদেনের নথি বা অন্য প্রমাণের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য, অর্থ লেনদেনের তথ্য এবং পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মোবাইল হস্তান্তরের ভিডিও ধারণের দাবি

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর দাবি, ঘটনার সময় মোবাইল হস্তান্তরের পুরো দৃশ্য অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা নিজের মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেন। তবে ওই ভিডিওর কোনো অনুলিপি তাঁকে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ আয়ানের।

ভিডিওটি ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ফোনটি জব্দ বা হস্তান্তরের বিষয়ে কোনো লিখিত নথি তৈরি করা হয়েছিল কি না, ১৭ হাজার টাকা নেওয়ার বিষয়ে কোনো রসিদ দেওয়া হয়েছিল কি না এবং টাকা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সরকারি নির্দেশনা ছিল কি না—এসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি ব্যাখ্যা দেননি এসআই

ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ এবং মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের নামে অর্থ আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত এসআই মেহেদী হাসান টিটু মামলার সুনির্দিষ্ট তথ্য ও ডিবি পুলিশের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করেন।

তবে শিক্ষার্থীকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং তাঁর কাছ থেকে ১৭ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে সরাসরি ব্যাখ্যা না দিয়ে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান বলে অভিযোগকারীর বক্তব্যে উঠে এসেছে।

অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্যে চট্টগ্রাম থেকে চুরি যাওয়া মোবাইল উদ্ধারের প্রসঙ্গ এলেও, ট্র্যাকিংয়ের খরচ হিসেবে অর্থ নেওয়ার বিষয়ে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের নামে টাকা নেওয়ার নিয়ম নেই: পুলিশ সুপার

ঘটনার বিষয়ে গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমি অবহিত হয়েছি এবং খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মোবাইল ট্র্যাকিং খরচের কথা বলে কারও কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই, এটি সম্পূর্ণ অনিয়ম।’

পুলিশ সুপারের এ বক্তব্যের পর অভিযোগটির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকা যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, এখন সেদিকেই নজর ভুক্তভোগীর।

তদন্তে যেসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন

ঘটনার সুষ্ঠু নিষ্পত্তির জন্য কয়েকটি বিষয় যাচাই করা জরুরি। প্রথমত, শিক্ষার্থীর কেনা আইফোনটি সত্যিই চুরি যাওয়া মোবাইল কি না, তা সংশ্লিষ্ট মামলা ও ফোনের আইএমইআই নম্বরের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, ফোনটি জব্দ বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

এ ছাড়া মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের নামে ১৭ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ, ঘটনার সময় ধারণ করা হয়েছে বলে দাবি করা ভিডিও এবং ডিবি পুলিশের নির্দেশনার প্রকৃতি যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ফোন বিক্রি করা দোকানের ভূমিকা ও বিক্রির নথিও তদন্তের আওতায় আনা যেতে পারে।

একটি ফোন চুরি যাওয়ার ঘটনায় তদন্ত বা উদ্ধারের প্রয়োজন থাকলে সেটি আইনসম্মতভাবে পরিচালনা করা জরুরি। একই সঙ্গে কোনো নাগরিকের কাছ থেকে সরকারি প্রক্রিয়ার বাইরে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

সারকথা: গাজীপুরের শ্রীপুরে বৈধভাবে কেনা আইফোন চোরাই বলে জব্দ করার পর মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ১৭ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এসআই মেহেদী হাসান টিটুর বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত কর্মকর্তা চুরি যাওয়া ফোন উদ্ধারে ডিবি পুলিশের নির্দেশনার কথা বলেছেন। তবে পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, ট্র্যাকিংয়ের নামে অর্থ নেওয়ার নিয়ম নেই এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তসাপেক্ষ।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!