শরতের মেঘমুক্ত আকাশে আবারও দেখা মিলেছে হিমালয় পর্বতমালার তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ভোর থেকেই দেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে চোখে পড়ে বরফে ঢাকা এই অপরূপ পর্বতশৃঙ্গ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য দেখতে পেয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকেরা।
সকাল ৬টার দিকে পঞ্চগড়ের আকাশে কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মেলে। সকাল ৮টার পরও এর সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ পান পর্যটকেরা। কখনো শুভ্র সাদা বরফে ঢাকা পাহাড়, কখনো সূর্যের আলোয় সোনালি আভা—সময় ও আলোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকে পর্বতশৃঙ্গটির রূপ। পরিষ্কার আকাশের পটভূমিতে দূরের এই বরফাবৃত পাহাড়ের দৃশ্য যেন প্রকৃতির এক অনন্য সৌন্দর্য তুলে ধরে।
কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে তেঁতুলিয়ায় পর্যটকদের ভিড়
কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা ছুটে আসছেন পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। বিশেষ করে তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো পিকনিক কর্নারের পাশ দিয়ে প্রবাহিত মহানন্দা নদীর তীর থেকে পর্বতশৃঙ্গটি তুলনামূলক স্পষ্ট দেখা যায়। এ কারণে জায়গাটি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে আসা পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
ভোরের আলো ফুটতেই অনেক পর্যটক নদীর তীরে অবস্থান নেন। কেউ দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেন মেঘের আড়াল সরার জন্য, কেউ আবার ক্যামেরা ও মুঠোফোনে ধারণ করেন বরফে ঢাকা পাহাড়ের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। অনেকে বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছবি তুলে স্মরণীয় করে রাখছেন কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার মুহূর্ত।

তবে আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে সব সময় পর্বতশৃঙ্গটি স্পষ্ট দেখা যায় না। কখনো মেঘ ও কুয়াশায় ঢেকে যায় পাহাড়, আবার আকাশ পরিষ্কার হলে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে এর বরফাবৃত চূড়া। মঙ্গলবারও এমন পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগ করেন পর্যটকেরা।
কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য দেখে উচ্ছ্বসিত পর্যটকেরা
ঢাকা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে আসা আরিফুল বাংলানিউজকে বলেন, বন্ধুদের সঙ্গে পঞ্চগড়ে আসার মূল উদ্দেশ্য ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা। আকাশ পরিষ্কার থাকায় শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত পর্বতশৃঙ্গটি দেখতে পেরেছেন তাঁরা। এতে সবাই আনন্দিত।
আরেক পর্যটক রফিকুল ইসলাম জানান, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে এসে অনেক পর্যটক হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন বলে তিনি শুনেছেন। তাঁরাও ভোরে প্রথমে পর্বতশৃঙ্গটি কিছুটা দেখতে পেলেও পরে মেঘ ও কুয়াশায় তা ঢেকে যায়। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবারও স্পষ্ট হয়ে ওঠে পাহাড়টির সৌন্দর্য।
পর্যটকদের অভিজ্ঞতায়, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার ক্ষেত্রে ধৈর্য ও অনুকূল আবহাওয়া—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। আকাশ পরিষ্কার থাকলে দূর থেকে বরফে ঢাকা পর্বতশৃঙ্গটির সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। আর মেঘের আনাগোনা থাকলে অপেক্ষা করেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য দেখা সম্ভব হয় না।
আকাশ পরিষ্কার থাকলে দেখা মেলে কাঞ্চনজঙ্ঘার
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্র নাথ রায় বাংলানিউজকে বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। মঙ্গলবার আকাশ পরিষ্কার থাকায় পর্যটকেরা পর্বতশৃঙ্গটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পেরেছেন।
কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে আসার আগে আকাশ ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।
আবহাওয়ার স্বচ্ছতা, মেঘের অবস্থান এবং দৃশ্যমানতার ওপর নির্ভর করে পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অভিজ্ঞতা। ফলে পর্যটন পরিকল্পনার আগে স্থানীয় আবহাওয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতি জেনে নেওয়া উপকারী।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে
পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভিন বাংলানিউজকে বলেন, শীত মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা পঞ্চগড়ে বেড়াতে আসেন। তাঁদের অনেকের কাছেই কাঞ্চনজঙ্ঘা অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। পর্যটকদের নির্বিঘ্নে ভ্রমণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
শীতের আগমনী সময়ে পঞ্চগড়ের প্রকৃতি ও কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য দেখতে পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ে। বিশেষ করে তেঁতুলিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ, মহানন্দা নদীর তীর এবং দূরে বরফে ঢাকা পাহাড়ের দৃশ্য ভ্রমণপ্রেমীদের আকৃষ্ট করে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী দিনগুলোতেও পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ দৃশ্য দেখার সুযোগ পাবেন পর্যটকেরা। তবে এই দৃশ্য উপভোগের জন্য ভ্রমণের আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া জরুরি।
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া তাই আবারও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠছে। মেঘমুক্ত আকাশে কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফাবৃত চূড়া যেন উত্তরের এই জনপদে শরতের সৌন্দর্যে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।

