রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনের মতো অভিজাত আবাসিক এলাকায় পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার ভয়াবহ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পরিদর্শন করা ভবনগুলোর প্রায় ৬৪ শতাংশে সেপটিক ট্যাংক নেই। ৯২ শতাংশের বেশি ভবনে নেই শোষক কূপ বা সোকওয়েল। ফলে এসব ভবনের পয়োবর্জ্য ও দূষিত পানি ড্রেন, খাল ও লেকের পানিতে মিশে পরিবেশদূষণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
অন্যদিকে, গুলশান-বনানী-বারিধারা লেকের দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও দীর্ঘ ১৬ বছরেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি। লেকের বিভিন্ন স্থানে সরাসরি সুয়ারেজ ও ড্রেনেজ সংযোগ থাকার তথ্য উঠে এসেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, বিপুল অর্থ ব্যয় এবং দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও কেন দূষণের উৎস বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা যায়, গুলশান-বনানী এলাকার ৪ হাজার ৪০৯টি ভবন পরিদর্শন করে ২ হাজার ৮২২টিতে সেপটিক ট্যাংক পাওয়া যায়নি। একইভাবে ৪ হাজার ৬৮টি ভবনে শোষক কূপের ব্যবস্থা নেই।

অন্যদিকে, লেক উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়ন করে আইএমইডি জানিয়েছে, প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ লেকের মাত্র আড়াই কিলোমিটার অংশ থেকে ক্ষতিকর স্লাজ, পলি ও বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। লেকের অন্তত সাতটি স্থানে সরাসরি সুয়ারেজ ও ড্রেনেজ সংযোগ থাকার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লেকের ভেতর থেকে পলি ও বর্জ্য অপসারণ করলেই দূষণের স্থায়ী সমাধান হবে না। আশপাশের ভবন থেকে অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য প্রবেশ বন্ধ, ভবনভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
৪ হাজার ৪০৯ ভবনের মধ্যে ২ হাজার ৮২২টিতে সেপটিক ট্যাংক নেই
গুলশান-বনানী এলাকার ভবনগুলোর ড্রেনেজ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থা যাচাই করতে রাজউকের তত্ত্বাবধানে ১০টি বিশেষ দল গঠন করা হয়। এসব দল সংশ্লিষ্ট এলাকার মোট ৪ হাজার ৪০৯টি ভবন পরিদর্শন করে।
পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২ হাজার ৮২২টি ভবনে সেপটিক ট্যাংক পাওয়া যায়নি। সেপটিক ট্যাংক রয়েছে ১ হাজার ৫৪০টি ভবনে। অর্থাৎ, পরিদর্শন করা ভবনগুলোর প্রায় ৬৪ শতাংশে সেপটিক ট্যাংক নেই।
শোষক কূপ বা সোকওয়েলের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ৪ হাজার ৬৮টি ভবনে সোকওয়েল নেই, যা পরিদর্শন করা ভবনগুলোর ৯২ দশমিক ২৭ শতাংশ। মাত্র ২৯৪টি ভবনে শোষক কূপের ব্যবস্থা পাওয়া গেছে।
এই পরিসংখ্যান অভিজাত আবাসিক এলাকাগুলোর পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। যেসব ভবনে সেপটিক ট্যাংক বা অনুমোদিত বিকল্প ব্যবস্থা নেই, সেসব ভবনের পয়োবর্জ্য কীভাবে সংগ্রহ, পরিশোধন ও নিষ্কাশন করা হচ্ছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
ভবনভিত্তিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা যথাযথ না হলে অপরিশোধিত বর্জ্য ড্রেনেজ নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে পারে। সেখান থেকে তা লেক ও অন্যান্য জলাশয়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা থাকে। তবে কোন ভবন থেকে কী পরিমাণ বর্জ্য লেকে প্রবেশ করছে, তা নিশ্চিত করতে সরেজমিন তদন্ত ও পানির গুণগত মান পরীক্ষা প্রয়োজন।
লেকের সাত স্থানে সরাসরি সুয়ারেজ ও ড্রেনেজ সংযোগ
গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে গিয়ে আইএমইডির প্রতিবেদনে লেকের অন্তত সাতটি স্থানে সরাসরি সুয়ারেজ ও ড্রেনেজ সংযোগ থাকার তথ্য উঠে এসেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য ফেলার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরাসরি সুয়ারেজ সংযোগের মাধ্যমে অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য লেকে প্রবেশ করলে পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। জৈব বর্জ্য ও অন্যান্য দূষক জমে থাকলে দুর্গন্ধ সৃষ্টি, জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং আশপাশের পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দূষিত পানির সংস্পর্শে এলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়তে পারে। বিশেষ করে জলাশয়ের পানি কোনোভাবে দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত হলে বা দূষিত পানি থেকে জীবাণু ছড়িয়ে পড়লে জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেকের দূষণ নিয়ন্ত্রণে ঢাকা ওয়াসার আগের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হওয়ায় সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
এতে স্পষ্ট হয়েছে, জলাশয়ের ভেতরে জমে থাকা পলি ও বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশি দূষণের উৎস বন্ধ করা জরুরি। কোন ভবন, নালা বা ড্রেন থেকে দূষিত পানি প্রবেশ করছে, কোন সংস্থা সেই সংযোগ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছে এবং কীভাবে নিয়মিত তদারকি করা হবে—এসব বিষয় নির্ধারণ না করলে দূষণ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।
১৬ বছরেও শেষ হয়নি ৫৫০ কোটি টাকার লেক উন্নয়ন প্রকল্প
গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১০ সালের জুলাইয়ে। প্রকল্পটির প্রাথমিক মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত। সে হিসাবে তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় কয়েক দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়।
প্রকল্পের শুরুতে অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৪১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। পরবর্তী সময়ে মেয়াদ বৃদ্ধি, ভূমি অধিগ্রহণ এবং নতুন কর্মসূচি যুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের ৭ মে প্রকল্পটির প্রথম সংশোধন অনুমোদিত হয়। এতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়লেও লেকের দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না আসায় বাস্তবায়ন ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্পের কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, কী পরিমাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে, নির্ধারিত পরিবেশগত লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে এবং প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার কারণ কী—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
বিশেষ করে লেকের সঙ্গে সরাসরি সুয়ারেজ ও ড্রেনেজ সংযোগ থাকার তথ্য প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ, দূষণের উৎস বন্ধ না হলে পরিষ্কার করা জলাশয় আবারও দূষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৯ কিলোমিটার লেকের মাত্র আড়াই কিলোমিটারে পলি অপসারণ
আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ গুলশান-বনানী-বারিধারা লেকের মাত্র আড়াই কিলোমিটার অংশ থেকে ক্ষতিকর স্লাজ, পলি ও অন্যান্য বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। অপসারিত বর্জ্য ঢাকার বাইরে পরিবেশসম্মত উপায়ে সরিয়ে ফেলার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তবে লেকের বড় একটি অংশে পলি ও বর্জ্য অপসারণের কাজ এখনো বাকি রয়েছে বলে প্রতিবেদনের তথ্যে উঠে এসেছে।
দীর্ঘদিন ধরে পলি ও বর্জ্য জমতে থাকলে জলাশয়ের পানি ধারণক্ষমতা কমে যেতে পারে। এতে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
শহরের জলাশয় বৃষ্টির পানি ধারণ, স্থানীয় জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই লেকের পলি ও বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আইএমইডির প্রতিবেদনে ভূগর্ভস্থ পানির ভাণ্ডার পুনর্ভরণের প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, পানির গুণগত মান এবং সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত উপাদান নিয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন।
সেপটিক ট্যাংক না থাকলে পয়োবর্জ্য যাচ্ছে কোথায়?
গুলশান, বনানী ও বারিধারার মতো পরিকল্পিত আবাসিক এলাকায় বিপুলসংখ্যক ভবনে সেপটিক ট্যাংক ও শোষক কূপ না থাকার তথ্য সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, এসব ভবনের পয়োবর্জ্য কোথায় যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডসহ প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার সংযোগ না থাকলে ভবনের জন্য উপযুক্ত ও অনুমোদিত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
ভবনভিত্তিক পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য হলো বর্জ্যকে নিরাপদভাবে সংগ্রহ ও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিশোধনের ব্যবস্থা করা, যাতে তা অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশে ছড়িয়ে না পড়ে।
কোনো ভবনে অনুমোদিত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে ভবনের ধরন, অনুমোদিত নকশা, কেন্দ্রীয় স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার প্রাপ্যতা এবং প্রযোজ্য কারিগরি মান বিবেচনা করে ব্যবস্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গুলশান, বনানী ও বারিধারার ভবনগুলোতে অনুমোদিত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা নতুন করে যাচাই করা উচিত। যেসব ভবনে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই, সেগুলো চিহ্নিত করে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা যেতে পারে।
‘সেপটিক ট্যাংক না থাকলে অভিজাত এলাকা কীভাবে?’
গুলশান লেকের পাশের একটি বাড়ির মালিক খোরশেদ আলম বলেন, গুলশান, বারিধারা ও বনানী অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত। অথচ এসব এলাকার ভবনে যদি সেপটিক ট্যাংক না থাকে, তাহলে সেগুলোকে কীভাবে অভিজাত বলা যায়?
খোরশেদ আলমের ভাষ্য, যারা নিয়ম মেনে সেপটিক ট্যাংক স্থাপন করেছেন, তাঁদেরও কেন দূষণের বদনামের ভাগ নিতে হবে? যেসব ভবনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই বা এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
তিনি বলেন, তাঁরা লেকের উন্নয়ন এবং আশপাশের পরিবেশ সুন্দর দেখতে চান। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, লেকের সৌন্দর্য রক্ষার পাশাপাশি পানির গুণগত মান ও পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু লেকের ভেতরের বর্জ্য সরিয়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। আশপাশের ভবন থেকে দূষিত পানি প্রবেশ বন্ধ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
গণপূর্তমন্ত্রীর প্রশ্ন: গুলশানের লেক ঠিক করতে না পারলে সারা দেশ কীভাবে ঠিক হবে?
গুলশান-বারিধারা এলাকার লেকের দূষণ নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের।
সম্প্রতি ‘স্মার্ট আবাসন, টেকসই নগরায়ণ ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, গুলশান-বারিধারার মতো একটি বিশিষ্ট এলাকার লেকের পানি ঠিক করতে না পারলে সারা বাংলাদেশ কীভাবে ঠিক করা হবে, সে প্রশ্ন সামনে আসে। এসব এলাকার পরিবেশ কীভাবে উন্নত করা যায়, তা নিয়ে কাজ হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রী আরও বলেন, গুলশান-বনানী-বারিধারা এলাকায় প্রায় ৪ হাজার ৩০০টি বাড়িঘর রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ভবনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশে নিয়ম অনুযায়ী সেপটিক ট্যাংক বা স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) থাকার কথা থাকলেও তা করা হয়নি।
মন্ত্রীর বক্তব্য এবং ভবন পরিদর্শনের প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য পরিকল্পিত আবাসিক এলাকায় পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতির বিষয়টি সামনে এনেছে।

তবে ভবনভিত্তিক অবকাঠামোর প্রকৃত অবস্থা, কোন ভবনে কী ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন এবং কোথায় নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে, তা নির্ধারণে হালনাগাদ পরিদর্শন ও যাচাই করা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
ভবনে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে রাজউকের উদ্যোগ
গুলশান লেকসহ আশপাশের জলাশয় দূষণমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, পরিকল্পিত ও পরিবেশসম্মত পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ভবনে যথাযথভাবে সেপটিক ট্যাংক, সোকওয়েল ও স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রাজউকের আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী এসব অবকাঠামো স্থাপন বাধ্যতামূলক।
রাজউকের এ বক্তব্যের পর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। কোন সময়ের মধ্যে ভবনগুলো পরিদর্শন করা হবে, কোথায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে এবং নিয়ম না মানা ভবনগুলোর বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নির্দেশনা বা উদ্যোগের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। নিয়মিত পরিদর্শন, ভবনভিত্তিক তথ্যভান্ডার তৈরি, বর্জ্য নিষ্কাশনের পথ চিহ্নিত এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
‘দীর্ঘদিনের নজরদারি ও জবাবদিহির ঘাটতিতে সংকট’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, গুলশান-বনানী-বারিধারার মতো পরিকল্পিত ও অভিজাত এলাকায় সেপটিক ট্যাংক বা শোষক কূপ না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। এর ফলে মারাত্মক পরিবেশগত সংকট তৈরি হচ্ছে।
তাঁর মতে, প্রচলিত ইমারত ও পরিবেশ আইন অনুযায়ী এ ধরনের ঘাটতি গুরুতর অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি ও জবাবদিহির অভাবের কারণেই পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত সংকট তৈরি হয়েছে।
ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, টেকসই সমাধানের জন্য ভবনমালিকদের নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে আধুনিক সেপটিক ট্যাংক নির্মাণে বাধ্য করতে হবে। যারা নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্নসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
তবে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রচলিত আইন, বিধিবিধান ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে ভবনমালিকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ দিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
গুলশান লেক দূষণমুক্ত করতে যেসব পদক্ষেপ জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, গুলশান-বনানী-বারিধারা লেকের দূষণ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রথমত, ভবনভিত্তিক পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা: যেসব ভবনে সেপটিক ট্যাংক, সোকওয়েল বা অনুমোদিত বিকল্প ব্যবস্থা নেই, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দূষণের উৎস বন্ধ করা: লেকের সঙ্গে যুক্ত সুয়ারেজ ও ড্রেনেজ সংযোগ পরীক্ষা করে অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য প্রবেশের পথ বন্ধ করতে হবে।
তৃতীয়ত, লেকের অবশিষ্ট অংশ পরিষ্কার করা: যেসব এলাকায় পলি, স্লাজ ও বর্জ্য রয়ে গেছে, সেগুলো থেকে বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো: রাজউক, ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে সমন্বিত তদারকি জোরদার করতে হবে।
পঞ্চমত, প্রকল্পের ব্যয় ও অগ্রগতির জবাবদিহি নিশ্চিত করা: প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, বাস্তবায়নের অগ্রগতি, অডিট আপত্তি এবং পরিবেশগত ফলাফল মূল্যায়ন করে সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে লেকের দূষণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভবনভিত্তিক পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ঘাটতি মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে।
৫৫০ কোটি টাকার প্রকল্পের সুফল নিয়ে প্রশ্ন, জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কবে?
গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা এবং ভবনভিত্তিক পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রাজধানীর নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সামনে এনেছে। একদিকে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে লেক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে লেকের বিভিন্ন স্থানে সুয়ারেজ ও ড্রেনেজ সংযোগ থাকার তথ্য উঠে এসেছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, লেকের ভেতরের বর্জ্য অপসারণের পরও যদি অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য প্রবেশ অব্যাহত থাকে, তাহলে প্রকল্পের সুফল কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে?
এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যেসব ভবনে অনুমোদিত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই, সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কখন নেওয়া হবে; লেকের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সুয়ারেজ ও ড্রেনেজ সংযোগগুলো কবে বন্ধ করা হবে; এবং প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।
পরিকল্পিত নগরায়ণ মানে শুধু অভিজাত আবাসন নির্মাণ বা জলাশয়ের সৌন্দর্যবর্ধন নয়। নিরাপদ পয়োনিষ্কাশন, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগও এর অপরিহার্য অংশ।
গুলশান-বনানী-বারিধারা লেককে সত্যিকার অর্থে দূষণমুক্ত করতে হলে প্রকল্পের কাজ শেষ করার পাশাপাশি দূষণের উৎস বন্ধ, ভবনমালিকদের জবাবদিহি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও লেকের দূষণ নিয়ন্ত্রণের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অধরাই থেকে যেতে পারে।
SEO কীওয়ার্ড: গুলশান লেক দূষণ, গুলশান বনানী বারিধারা লেক, সেপটিক ট্যাংক নেই, রাজউক, লেক উন্নয়ন প্রকল্প, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, ঢাকা ওয়াসা, আইএমইডি প্রতিবেদন।

