ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

menu

শর্তযুক্ত হেবা শরিয়তসম্মত নয়, ফতোয়া মুফতি আব্দুল মালেকের

মুফতি আব্দুল মালেক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৩, ২০২৬, ০১:০১ পিএম

শর্তযুক্ত হেবা শরিয়তসম্মত নয়, ফতোয়া মুফতি আব্দুল মালেকের

ছবিঃ সংগৃহীত

পুত্রসন্তানহীন পরিবারে কন্যাসন্তানকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে রক্ষার লক্ষ্যে সম্পত্তির ওপর নিজের আজীবন ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণ করে কন্যাকে হেবা বা দান করার যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা শরিয়তসম্মত নয় বলে মত দিয়েছেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব ও মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া ঢাকার আমীনুত তালীম মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক।

 

সম্প্রতি ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার সহকারী একান্ত সচিব মো. আশিকুল ইসলাম এ বিষয়ে জানতে চাইলে মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া ঢাকা থেকে শরিয়তের দলিল ও ইসলামি ফিকহের আলোকে এ মতামত দেওয়া হয়। ফতোয়ায় প্রস্তাবিত ‘জীবনস্বত্ব সংরক্ষণ করে হেবা’ ব্যবস্থাকে শরিয়তের দৃষ্টিতে বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

ফতোয়ার মূল বক্তব্য হলো, কোনো ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি কন্যাকে হেবা করার কথা বললেও যদি ওই সম্পত্তির মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও ভোগদখল নিজের জন্য সংরক্ষণ করেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর সম্পত্তিটি কন্যার কাছে যাওয়ার শর্ত আরোপ করেন, তাহলে সেটি প্রকৃত হেবার মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। একই সঙ্গে ইসলামি উত্তরাধিকার আইনে নির্ধারিত অধিকার ও অংশকে পাশ কাটানোর উদ্দেশ্যে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মত দেওয়া হয়েছে।

কী বলা হয়েছে ফতোয়ায়?

ফতোয়ায় বলা হয়েছে, ইসলামি উত্তরাধিকার বিধানে প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর প্রাপ্য অংশ কোরআন-সুন্নাহর মাধ্যমে নির্ধারিত। ফলে সামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক প্রয়োজন কিংবা কোনো বিশেষ পরিস্থিতির যুক্তিতে আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত উত্তরাধিকার বিধান পরিবর্তন বা সংশোধন করার সুযোগ নেই।

 

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সম্পত্তির মালিক জীবিত অবস্থায় কন্যার নামে হেবা করলেও নিজের জন্য ওই সম্পত্তির আজীবন ভোগদখল ও আয় গ্রহণের অধিকার সংরক্ষণ করবেন। তাঁর মৃত্যুর পর সম্পত্তিটি কন্যার মালিকানায় যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। ফতোয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের শর্ত সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রকৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

 

কারণ, শরিয়তের দৃষ্টিতে হেবা সম্পন্ন হলে দাতার জীবদ্দশাতেই সম্পত্তির মালিকানা ও দখল গ্রহীতার কাছে হস্তান্তরিত হতে হয়। অন্যদিকে, কোনো সম্পত্তি মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার শর্তে অন্যের কাছে দেওয়ার ব্যবস্থা করলে তা প্রকৃত হেবার পরিবর্তে অন্য ধরনের বিধানের আওতায় পড়তে পারে। তাই ব্যবস্থাটির নাম ‘হেবা’ হলেই সেটি শরিয়তসম্মত হয়ে যায় না; এর প্রকৃত শর্ত, উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা বিবেচনা করতে হবে।

উত্তরাধিকার আইন পাশ কাটানোর সুযোগ নেই

ফতোয়ায় উত্তরাধিকারীদের নির্ধারিত অধিকার ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের কৌশল অবলম্বনের বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে, বাহ্যিকভাবে হেবা দেখিয়ে এমন ব্যবস্থা করা হলে, যার প্রকৃত উদ্দেশ্য মৃত্যুর পর সম্পত্তির বণ্টন নিয়ন্ত্রণ করা বা নির্ধারিত উত্তরাধিকারীদের অধিকার এড়িয়ে যাওয়া, তাহলে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য হবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

ইসলামি উত্তরাধিকার বিধানে কে কতটুকু সম্পত্তি পাবেন, তা নির্দিষ্ট নীতির ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। এ কারণে কোনো ব্যক্তি নিজের সম্পত্তির বণ্টন নিয়ে জীবদ্দশায় পরিকল্পনা করতে পারলেও সেই পরিকল্পনা শরিয়তের বিধান ও অন্যের স্বীকৃত অধিকার লঙ্ঘন করতে পারে না।

 

এ প্রসঙ্গে ফতোয়ায় জামে তিরমিজির একটি হাদিস উদ্ধৃত করা হয়েছে। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক হকদারকে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করেছেন। অতএব কোনো উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই।’ সূত্র হিসেবে জামে তিরমিজি: ২১১৭ উল্লেখ করা হয়েছে।

 

ফতোয়ায় এ হাদিসের আলোকে উত্তরাধিকারীদের নির্ধারিত অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

কন্যাসন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার বৈধ উপায় কী?

কন্যাসন্তানের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জীবদ্দশায় সম্পত্তি হেবা করার সুযোগ রয়েছে বলে ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সেই হেবা যথাযথভাবে সম্পন্ন হতে হবে।

 

অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি তাঁর জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তির কোনো অংশ কন্যাকে দান করতে চাইলে শরিয়তের বিধান অনুসরণ করে তা করতে পারেন। কিন্তু হেবা সম্পন্ন হওয়ার পরও যদি দাতা নিজের জন্য সম্পত্তির মালিকানা ও আজীবন ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণ করেন, তাহলে তা প্রকৃত হেবার শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না বলে ফতোয়ায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

 

এ ক্ষেত্রে সম্পত্তির প্রকৃত হস্তান্তর এবং গ্রহীতার মালিকানা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। শুধু কাগজে-কলমে কন্যার নামে সম্পত্তি লিখে দিলেই হেবা সম্পূর্ণ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না; হেবার শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।

 

ফতোয়ায় আরও বলা হয়েছে, হেবা সম্পূর্ণ হওয়ার আগে দাতা মারা গেলে ওই হেবা অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সম্পত্তিটি দাতার উত্তরাধিকার সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত হবে এবং শরিয়তের বিধান অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের প্রশ্ন আসবে।

 

তবে কোনো নির্দিষ্ট সম্পত্তি হেবা সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির ধরন, হস্তান্তরের প্রক্রিয়া, দখল ও মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য এবং প্রযোজ্য শরিয়তি বিধান বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের সম্মতি থাকলে কী হবে?

ফতোয়ায় জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তর এবং মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের পারস্পরিক সম্মতিতে সম্পত্তি বণ্টনের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে।

 

এতে বলা হয়েছে, দাতার মৃত্যুর পর সব প্রাপ্তবয়স্ক উত্তরাধিকারী যদি স্বেচ্ছায় ও নিজেদের সম্মতির ভিত্তিতে কোনো বিষয়ে রাজি হন, তাহলে সেটি ভিন্ন বিষয়। কারণ, সে ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে উত্তরাধিকার বিধান পরিবর্তনের পরিবর্তে উত্তরাধিকারীরা নিজেদের প্রাপ্য অধিকার সম্পর্কে সম্মতিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

 

তবে এ ধরনের সম্মতি স্বতঃস্ফূর্ত হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অধিকার ও প্রযোজ্য বিধান বিবেচনায় নিতে হবে। কাউকে চাপ প্রয়োগ করে বা প্রতারণার মাধ্যমে তাঁর প্রাপ্য অধিকার ছাড়তে বাধ্য করা আর স্বেচ্ছায় সম্মতি দেওয়ার বিষয় এক নয়।

পুত্রসন্তান না থাকলে কন্যার উত্তরাধিকার কীভাবে নির্ধারিত হয়?

ইসলামি উত্তরাধিকার বিধানে পুত্রসন্তান না থাকলেই কন্যাসন্তান সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হন—এমন নয়। কন্যার উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয় মৃত ব্যক্তির জীবিত উত্তরাধিকারীদের ধরন, সংখ্যা ও প্রযোজ্য শরিয়তি বিধানের ভিত্তিতে।

 

কন্যার পাশাপাশি স্ত্রী, বাবা-মা কিংবা অন্য উত্তরাধিকারী জীবিত থাকলে তাঁদের অধিকারও বিবেচনায় আসতে পারে। আবার একাধিক কন্যা থাকলে তাঁদের অংশ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও শরিয়তের বিধান প্রযোজ্য হয়। তাই শুধু পুত্রসন্তান আছে কি নেই, এই একটি তথ্যের ভিত্তিতে সম্পত্তির চূড়ান্ত বণ্টন নির্ধারণ করা যায় না।

 

ফতোয়াটিতে মূলত বলা হয়েছে, কন্যাসন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য থাকলেও সেই উদ্দেশ্যে উত্তরাধিকার বিধান পরিবর্তন বা নির্ধারিত অধিকার পাশ কাটানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না। বরং জীবদ্দশায় বৈধ হেবা এবং শরিয়তসম্মত অন্যান্য উপায় অনুসরণ করে সম্পত্তির বিষয়ে পরিকল্পনা করা যেতে পারে।

সামাজিক বাস্তবতা ও শরিয়তের বিধান

পুত্রসন্তান না থাকা পরিবারে কন্যার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে দূরবর্তী আত্মীয়দের অধিকার প্রযোজ্য হওয়ার পরিস্থিতিতে অনেক পরিবার কন্যার আর্থিক সুরক্ষা নিয়ে চিন্তিত থাকে।

 

তবে ফতোয়ায় বলা হয়েছে, সামাজিক প্রয়োজন বা পারিবারিক উদ্বেগের কারণে ইসলামি উত্তরাধিকার বিধান পরিবর্তন করার সুযোগ নেই। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শরিয়ত অনুমোদিত পন্থা অনুসরণ করে সমাধান খুঁজতে হবে।

 

এ ক্ষেত্রে জীবদ্দশায় যথাযথভাবে হেবা করা, সম্পত্তির মালিকানা ও দখল হস্তান্তরের শর্ত পূরণ করা এবং উত্তরাধিকারীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সম্পত্তি হেবা বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে হস্তান্তরের আগে সংশ্লিষ্ট বিধান সম্পর্কে অভিজ্ঞ আলেম এবং প্রয়োজন হলে আইনজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াও সহায়ক হতে পারে।

ফতোয়ার তাৎপর্য

মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেকের দেওয়া এ মতামতে মূলত হেবা ও উত্তরাধিকারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। হেবা জীবদ্দশায় সম্পত্তি দান ও হস্তান্তরের একটি ব্যবস্থা; অন্যদিকে উত্তরাধিকার কার্যকর হয় সম্পত্তির মালিকের মৃত্যুর পর প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী। এ দুই ব্যবস্থাকে এক করে দেখা বা হেবার নামে উত্তরাধিকার বিধান এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয় বলে ফতোয়ায় মত দেওয়া হয়েছে।

 

মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া ঢাকার এ মতামতে কোরআন-সুন্নাহ ও ইসলামি ফিকহের আলোকে সম্পত্তি হস্তান্তরের শর্ত এবং উত্তরাধিকারীদের অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

 

সূত্র: মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া ঢাকা; জামে তিরমিজি: ২১১৭; কিফায়াতুল মুগতাযী, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৪১০।

 

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!