ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

menu

দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন কি শুধুই স্বপ্ন, নাকি বাস্তবতার পথে বাংলাদেশ?

সম্পাদকীয়

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩১, ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম

দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন কি শুধুই স্বপ্ন, নাকি বাস্তবতার পথে বাংলাদেশ?

ছবিঃ সংগৃহীত

দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। বাংলাদেশে দুর্নীতির বিস্তার রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন সম্পদের সুষম বণ্টন, প্রশাসনিক সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক আন্দোলন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা অনেকেই সোচ্চার। সভা-সেমিনার, আলোচনা কিংবা ব্যক্তিগত পরিসরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্যও দিই। অথচ বাস্তবতা হলো, সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরেই কমবেশি দুর্নীতির উপস্থিতি রয়েছে। পৃথিবীর কোনো সমাজই পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত নয়। তবে বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটি শুধু দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে না, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও জাতি হিসেবে মর্যাদাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতির ধারণা সূচকে ২০০১ সালে বাংলাদেশ সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকা দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে ছিল। ওই সূচকের ভিত্তি বছর ছিল ২০০০ সাল। পরবর্তী সময়ে টানা কয়েক বছরও বাংলাদেশ সূচকের তলানিতে অবস্থান করে। বিষয়টি তখন দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তবে দুর্নীতি রাতারাতি সৃষ্টি হয় না, আবার একদিনে তা নির্মূল করাও সম্ভব নয়।

পরবর্তী সময়ে সূচকে অন্য দেশগুলোর অবস্থান পরিবর্তিত হলেও বাংলাদেশের দুর্নীতির সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি। কোনো কোনো দেশ সূচকে বাংলাদেশের নিচে নেমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ দুর্নীতি দমনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করেছে। বরং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দুর্নীতির বিস্তার: রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য অশনিসংকেত

অতীতে বাংলাদেশের সমাজ সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত ছিল—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। তবে গত শতাব্দীর শেষ দশক থেকে দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। প্রশাসন, রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারি সেবা, উন্নয়ন প্রকল্পসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ বাড়তে থাকে।

দুর্নীতি যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা শুধু ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকেও বাধাগ্রস্ত করে। সরকারি অর্থের অপব্যবহার, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, নিয়োগ ও পদায়নে অনিয়ম, ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অর্থ পাচারের মতো ঘটনা দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করে।

বিশেষ করে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়ে দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থ পাচারের বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। বিভিন্ন সংস্থার তদন্ত ও অনুসন্ধানেও এ সময়ের অনিয়মের নানা চিত্র উঠে এসেছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, দুর্নীতি দমনে শুধু বক্তব্য বা প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ।

গণঅভ্যুত্থানের পর দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যাশা

দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পর ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়। জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য দূরীকরণ, শোষণমুক্ত সমাজ এবং দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত রাষ্ট্র গঠন ছিল গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর বিএনপি সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা, প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি রয়েছে।

সরকার সন্ত্রাস ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বলে বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে। সংরক্ষিত নারী আসনের একজন সংসদ সদস্যকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগে পদত্যাগে বাধ্য করা এবং প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগে একজন প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা এ ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

তবে একই ধরনের দৃঢ়তা দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রেও দেখাতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক প্রভাব বিবেচনা না করে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকার যদি এ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা বজায় রাখতে পারে, তাহলে জনগণের সমর্থন ও আস্থা অর্জন করা সম্ভব হবে।

দুর্নীতির মূল কারণ কী?

দুর্নীতি দমনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হলে প্রথমেই এর কারণ ও প্রকৃতি বুঝতে হবে। সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, শোষণ, বঞ্চনা, দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো এবং নৈতিক মূল্যবোধের অভাবকে দুর্নীতির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

একজন মানুষ যখন বৈধ আয়ে নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হন, তখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি অনৈতিক উপায়ে অর্থ উপার্জনের দিকে ঝুঁকতে পারেন। আবার কর্মক্ষেত্রে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হওয়া, বৈষম্য কিংবা অনিশ্চিত জীবনযাপনও দুর্নীতির প্রবণতা বাড়াতে পারে।

তবে দারিদ্র্যই দুর্নীতির একমাত্র কারণ নয়। কারণ, সমাজের বিত্তবান ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের মধ্যেও দুর্নীতির প্রবণতা দেখা যায়। যাঁদের পর্যাপ্ত সম্পদ রয়েছে, তাঁদের অনেকেই আরও সম্পদ অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহার করেন। কেউ অভাবের কারণে দুর্নীতিতে জড়ান, আবার কেউ অতিরিক্ত সম্পদ ও ক্ষমতার লোভে দুর্নীতির আশ্রয় নেন।

এখানেই দুর্নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুর্নীতির সঙ্গে অর্থনৈতিক অবস্থার পাশাপাশি ব্যক্তির নৈতিকতা, মূল্যবোধ, লোভ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জবাবদিহির অভাবও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই শুধু দারিদ্র্য দূর করলেই দুর্নীতি নির্মূল হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।

সম্পদের সুষম বণ্টন ও অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে হবে

দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের অন্যতম শর্ত হলো রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধার ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা। সমাজে যখন সম্পদ ও ক্ষমতা অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন বৈষম্য বাড়ে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বঞ্চনা তৈরি হয় এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থাও কমে যায়।

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে জনগণের জীবনমান উন্নত করা। পাকিস্তান আমলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল, তার বিরুদ্ধে বাঙালি জনগোষ্ঠী আন্দোলন করেছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও যদি দেশের সম্পদ একটি বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জীভূত থাকে, তাহলে স্বাধীনতার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গীকার পূর্ণতা পাবে না।

এ জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে জবাবদিহি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা পূরণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বৈষম্য কমাতে হবে।

সরকার দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বিশেষভাবে প্রয়োজন। দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ অর্থ বা সহায়তা যদি দুর্নীতির কারণে প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে না পৌঁছায়, তাহলে এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি

দারিদ্র্য বিমোচন এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষকে বেকার রেখে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। প্রতিটি কর্মক্ষম মানুষের জন্য উৎপাদনশীল কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

নিয়োগ, পদোন্নতি ও কর্মক্ষেত্রে সুযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়, স্বজনপ্রীতি কিংবা আর্থিক লেনদেনের পরিবর্তে যোগ্যতা ও দক্ষতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে তরুণদের জন্য কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বৈষম্য কমানো গেলে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়বে এবং অনৈতিক উপায়ে অর্থ উপার্জনের প্রবণতা প্রতিরোধেও সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে।

প্রশাসনিক সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে

দুর্নীতি দমনে শুধু ব্যক্তিকে শাস্তি দিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। যে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দুর্নীতি বিস্তার লাভ করে, সেগুলোও দূর করতে হবে।

সরকারি দপ্তরে সেবা প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করা, অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার সম্প্রসারণ জরুরি। সরকারি ক্রয়, উন্নয়ন প্রকল্প, ভূমি ব্যবস্থাপনা, কর আদায়, নিয়োগ ও লাইসেন্স প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ সম্পদ শনাক্ত, জব্দ এবং আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের অনুকূলে নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিদেশে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা জরুরি।

নৈতিক শিক্ষা ও পারিবারিক মূল্যবোধের গুরুত্ব

দুর্নীতি শুধু রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক ব্যাধিও। সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটলে মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ওপরে স্থান দিতে শুরু করে। তখন দুর্নীতি, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়ম অনেকের কাছে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের সততা, দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম, মানবিকতা ও নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জন নয়, নৈতিক চরিত্র গঠনের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। একজন মানুষ যদি নিজের বিবেক ও নৈতিক মূল্যবোধের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন, তাহলে তিনি দুর্নীতি ও সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার সম্ভাবনা বেশি।

পরিবারেও সন্তানদের সামনে সততা ও ন্যায়পরায়ণতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। কারণ, দুর্নীতিকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করা না গেলে শুধু আইন প্রয়োগ করে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন হবে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন

দুর্নীতি দমনের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। এ ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিক, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন এবং নাগরিক সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে।

জনগণকে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ঘুষ না দেওয়া, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা এবং অনিয়মের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

গণমাধ্যমকে দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের মধ্যে শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সুরক্ষা দেওয়া হলে দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে।

দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়াই হোক জাতীয় অঙ্গীকার

যে জাতি বুকের রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে, সে জাতি দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধেও ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। তবে এ জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত উদ্যোগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনের শাসন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুধু বক্তৃতা কিংবা সাময়িক অভিযান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি যত ক্ষমতাবানই হোন না কেন, তাঁকে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা যদি জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে দাঁড়াতে চাই, তাহলে দুর্নীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

দেশপ্রেমিক নাগরিক, সৎ প্রশাসক এবং জনকল্যাণে অঙ্গীকারবদ্ধ রাজনীতিবিদদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক কখনোই ব্যক্তিগত স্বার্থে দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করতে পারেন না। তাই দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও জবাবদিহির চর্চা যত বাড়বে, দুর্নীতির বিস্তার তত কমবে।

দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গঠন শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক ও সামাজিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
 

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!