চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের অবনতি দেখা গেছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে, যা গত ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে এবার ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। গত বছর শূন্যপাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শূন্যপাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি।
প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, এবার ৯ হাজার ৩৯০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ২৯৩টি প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশ করা হয়। সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সারাদেশে একযোগে ফল প্রকাশের ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এ সময় ফলাফলের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়।
২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার
এবারের ফলাফলে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো সামগ্রিক পাসের হার কমে যাওয়া। ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার হয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ।
ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, এর চেয়ে কম পাসের হার সর্বশেষ ছিল ২০০৪ সালে। ওই বছর এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেছিলেন ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। এরপর দীর্ঘ ২১ বছরে পাসের হার আর কখনো এত নিচে নামেনি। সেই হিসাবে চলতি বছরের ফলাফল গত দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ।
পাসের হার কমে যাওয়ায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় পর পাসের হার এতটা নিচে নেমে আসার কারণ খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
শূন্যপাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি
এবারের ফলাফলে শূন্যপাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। গত বছর ২০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৩টিতে। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় শূন্যপাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯১টি বেশি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নিলেও কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ না হওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষার্থী প্রস্তুতি ও সামগ্রিক একাডেমিক কার্যক্রমের মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
তবে শুধু শূন্যপাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিয়ে সামগ্রিক শিক্ষার মান নির্ধারণ করা যায় না। এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থান, শিক্ষার্থীসংখ্যা, বিষয়ভিত্তিক ফলাফল এবং পাস না করার কারণ বিশ্লেষণ করা জরুরি।
ফলাফল নিয়ে সামনে যেসব প্রশ্ন
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হার কমে যাওয়া এবং শূন্যপাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, শিক্ষকসংকট, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং পরীক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করলে ফলাফলের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেননি, সেগুলোর বোর্ডভিত্তিক ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য পর্যালোচনা করে দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি গত কয়েক বছরের পাসের হার ও ফলাফলের ধারাবাহিক তুলনাও গুরুত্বপূর্ণ।
সামগ্রিকভাবে এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল দেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার মান, পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। পাসের হার কমে যাওয়ার কারণ চিহ্নিত করার পাশাপাশি শূন্যপাস প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার পরিবেশ ও একাডেমিক কার্যক্রম উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

