জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণে আটটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগে থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে থাকা যেসব কর্মীর চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ১ জুলাইয়ের পরও বহাল রয়েছে, তাদের বেতন সংশোধিত জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী পুনর্নির্ধারণ করা হবে। অন্যদিকে, ১ জুলাইয়ের পর নতুন করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বেতন নির্ধারণে অবসরের আগে পাওয়া মূল বেতনের গ্রেড ও ধাপ বিবেচনায় নেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনটিতে সই করেছেন অর্থ বিভাগের যুগ্ম সচিব শরীফ নজরুল ইসলাম।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, গত ১ জুলাই থেকে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ কার্যকর হওয়ায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা নির্ধারণের ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন অসামরিক পদে জনস্বার্থে চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত কর্মীদের ক্ষেত্রে এসব সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হবে।
চুক্তিভিত্তিক সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন নির্ধারণে কী সিদ্ধান্ত
অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ, পেনশন, ইনক্রিমেন্ট, আনুতোষিক এবং আগের আদেশের কার্যকারিতা নিয়ে আটটি সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া এবং ভবিষ্যতে নিয়োগ পাবেন—উভয় শ্রেণির ব্যক্তির ক্ষেত্রেই প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে।
১. পুরোনো চুক্তির কর্মীদের বেতন পুনর্নির্ধারণ
২০২৬ সালের ১ জুলাইয়ের আগে জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫-এর আওতায় বিভিন্ন গ্রেডে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া যেসব কর্মীর চুক্তির মেয়াদ ১ জুলাইয়ের পরও বহাল রয়েছে, তাদের বেতন নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী পুনর্নির্ধারণ করা হবে।
এ ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি সংশোধন করতে হবে। সংশোধিত চুক্তি ও জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মীর বেতন নির্ধারণের নিয়ম অনুসরণ করে ১ জুলাই থেকে তার বেতন প্রযোজ্য গ্রেড ও ধাপে নির্ধারণ করা হবে।
এ ছাড়া চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬-এর নির্দিষ্ট বিধান অনুযায়ী বর্ধিত হারে বেতন এবং সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে উল্লেখ থাকা প্রযোজ্য ভাতাদি পাবেন তারা। তবে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির বিধান এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
২. নতুন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে বেতন নির্ধারণের নিয়ম
২০২৬ সালের ১ জুলাইয়ের পর যারা চুক্তিভিত্তিক পদে নিয়োগ পেয়েছেন বা ভবিষ্যতে নিয়োগ পাবেন, তাদের বেতন নির্ধারণে অবসর গ্রহণের অব্যবহিত আগে পাওয়া মূল বেতনের গ্রেড ও ধাপ বিবেচনা করা হবে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অবসরের আগে জাতীয় বেতন স্কেলের যে গ্রেড ও ধাপে মূল বেতন পেতেন, নতুন বেতন স্কেলে তার অনুরূপ গ্রেড ও ধাপের বেতন চুক্তিভিত্তিক পদের বেতন হিসেবে নির্ধারণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান চুক্তি থাকলে তা সংশোধন করতে হবে।
চুক্তি অনুযায়ী যোগদানের তারিখ থেকে চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬-এর নির্ধারিত বিধান অনুসারে বর্ধিত হারে বেতন ও প্রযোজ্য ভাতা দেওয়া হবে। তবে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির অংশটি এ সুবিধার অন্তর্ভুক্ত হবে না।
বিশেষ ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত বেতন অথবা উভয় পক্ষের সম্মতিতে সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে নির্ধারিত বেতনই চুক্তিভিত্তিক পদের বেতন হিসেবে বিবেচিত হবে।
৩. পেনশন বাদ দিয়ে চুক্তিভিত্তিক বেতন নির্ধারণ করা যাবে না
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে নির্ধারিত বেতন থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নির্ধারিত গ্রস পেনশন বাদ দেওয়া যাবে না। পেনশন কম্যুটেশন বা সমর্পণের আগের অঙ্কের পাশাপাশি বিশেষ অতিরিক্ত পেনশন থাকলে সেটিও বাদ দেওয়া যাবে না।
অর্থাৎ, প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী চুক্তিভিত্তিক বেতন হিসাব করার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পেনশনকে বাদ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি।
৪. চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে ইনক্রিমেন্ট, আনুতোষিক ও বর্ধিত পেনশন নেই
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদে দায়িত্ব পালনের জন্য কোনো ইনক্রিমেন্ট বা বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি দেওয়া হবে না। একইভাবে এ নিয়োগকালীন চাকরির জন্য আনুতোষিক কিংবা বর্ধিত পেনশনও প্রাপ্য হবে না।
অর্থাৎ, চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে নতুন বেতন স্কেলের বিধান অনুসরণ করা হলেও ওই চাকরির মেয়াদকে ভিত্তি করে অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট, আনুতোষিক বা পেনশন বৃদ্ধির সুবিধা দেওয়া হবে না।
৫. অবসরপ্রাপ্ত নন—এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আলাদা বিবেচনা
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী নন, এমন ব্যক্তিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য শর্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হবে।
এ জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগ সমন্বয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে। এরপর নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী চুক্তিপত্র সম্পাদন করা হবে।
অর্থাৎ, এ ধরনের নিয়োগের ক্ষেত্রে সবার জন্য একই বেতন-ভাতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হবে না; বরং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে চুক্তির শর্ত চূড়ান্ত করা হবে।
৬. আগের পরিপন্থী আদেশ ও নির্দেশনার সংশ্লিষ্ট অংশ বাতিল
নতুন প্রজ্ঞাপনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আগের সব আদেশ, স্মারক ও নির্দেশনার সংশ্লিষ্ট অংশ বাতিল বলে গণ্য হবে। তবে নতুন প্রজ্ঞাপনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আগের জারি করা স্মারকগুলো বহাল থাকবে।
এর ফলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তদের বেতন-ভাতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশনার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ পুরোনো বিধান আর কার্যকর থাকবে না।
৭. পরবর্তী সরকারি আদেশও প্রযোজ্য হবে
প্রজ্ঞাপনে বেতন-ভাতা সম্পর্কে যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর পাশাপাশি চুক্তি অনুযায়ী প্রদেয় বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রে সরকার পরবর্তী সময়ে যে আদেশ জারি করবে, তা-ও প্রযোজ্য হবে।
অর্থাৎ, চুক্তির শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারের পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা নির্ধারণ করতে হবে।
৮. ২০১৬ সালের প্রজ্ঞাপন বাতিল, নতুন নির্দেশনা কার্যকর ১ জুলাই থেকে
অর্থ বিভাগের ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি জারি করা প্রজ্ঞাপন বাতিল করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। নতুন নির্দেশনাটি ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য হবে।
ফলে নতুন বেতন স্কেল কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তদের বেতন-ভাতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ প্রজ্ঞাপনের বিধান অনুসরণ করতে হবে।
কারা এ সিদ্ধান্তের আওতায় আসবেন
অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন অসামরিক পদে জনস্বার্থে চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হবে।
এতে আগে থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে থাকা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের নিয়োগ পাবেন—এমন ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত। তবে কার বেতন কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা নির্ভর করবে নিয়োগের তারিখ, অবসরের আগে পাওয়া মূল বেতনের গ্রেড ও ধাপ, বিদ্যমান চুক্তির শর্ত এবং প্রজ্ঞাপনে উল্লেখিত অন্যান্য বিধানের ওপর।
বেতন-ভাতা নির্ধারণে নতুন নির্দেশনার গুরুত্ব
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তদের বেতন-ভাতা নির্ধারণে আগের ও নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে কী পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে, তা স্পষ্ট করতেই অর্থ বিভাগ এ নির্দেশনা দিয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় পুরোনো চুক্তির মেয়াদ বহাল থাকা কর্মীদের বেতন সংশোধিত স্কেল অনুযায়ী নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে অবসরের আগে পাওয়া বেতনের গ্রেড ও ধাপকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। তবে চুক্তিভিত্তিক চাকরির জন্য ইনক্রিমেন্ট, আনুতোষিক ও বর্ধিত পেনশন না দেওয়ার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে বেতন-ভাতা নির্ধারণ, পেনশন বিবেচনা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে নতুন প্রজ্ঞাপনটি একটি অভিন্ন নির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়োগের ধরন এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এসব বিধান অনুসরণ করতে হবে।

