ঢাকা বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

menu

তরুণদের কর্মসংস্থানে বড় উদ্যোগ, ২০২৭ সালের মধ্যে ৪৬টি কারখানা চালুর পরিকল্পনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৮, ২০২৬, ০৫:৩৯ পিএম

তরুণদের কর্মসংস্থানে বড় উদ্যোগ, ২০২৭ সালের মধ্যে ৪৬টি কারখানা চালুর পরিকল্পনা

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এ লক্ষ্য সামনে রেখে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালু, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণে সরকার কাজ করছে।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাপান সফরকালে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন।

সভায় প্রধানমন্ত্রী দেশের জনসংখ্যা, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান।

তরুণদের কর্মসংস্থান সরকারের অগ্রাধিকার

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, কাগজে-কলমে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ থেকে ১৭ কোটি বলা হলেও তাঁর ধারণা, প্রকৃত জনসংখ্যা ২০ কোটির কম হবে না। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ তরুণ। ফলে তাঁদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।

তিনি বলেন, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে কর্মক্ষম জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ এবং নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এ জন্য সরকার বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তরুণ জনগোষ্ঠী একদিকে বড় সম্ভাবনা, অন্যদিকে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে না পারলে তা অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপের কারণ হতে পারে। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, দেশীয় শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

২০২৭ সালের মধ্যে ৪৬টি বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগ

দেশের শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে বন্ধ হয়ে থাকা ৪৬টি মিল-কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করা সম্ভব হলে একদিকে উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি এসব কারখানার সঙ্গে যুক্ত সরবরাহব্যবস্থা, পরিবহন, বিপণন ও অন্যান্য সহায়ক খাতেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়তে পারে।

দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে শিল্প খাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী শিল্পের সম্প্রসারণ শ্রমবাজারে নতুন কর্মী যুক্ত করার পাশাপাশি অভিজ্ঞ কর্মীদের কাজে ফেরার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে কারখানাগুলো পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে বিনিয়োগ, যন্ত্রপাতির অবস্থা, কাঁচামাল সরবরাহ, বাজার পরিস্থিতি এবং আর্থিক সক্ষমতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হবে। সরকারের ঘোষিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে কী পরিমাণ প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে কারখানাগুলো কত দ্রুত চালু করা সম্ভব হয় তার ওপর।

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে চায় সরকার

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন সরকারের কাজ সরাসরি ব্যবসা পরিচালনা করা নয়; বরং বেসরকারি খাতের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। এ লক্ষ্যেই দেশীয় উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান উপায়। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য অনুকূল পরিবেশ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং উৎপাদনমুখী উদ্যোগের বিকাশ ঘটলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পাশাপাশি বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও সম্প্রসারিত হতে পারে।

প্রবাসী বাংলাদেশিরাও দেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, সঞ্চয় ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কাজে লাগানো গেলে নতুন ব্যবসা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা বাড়তে পারে।

প্রাথমিক শিক্ষায় চালু হচ্ছে তৃতীয় ভাষা

শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি জাতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে প্রাথমিক শিক্ষা ও সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের বিকল্প নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি রাষ্ট্র গঠনে কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী বছর থেকে প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শেখানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী জাপানিসহ অন্যান্য ভাষার মধ্য থেকে একটি ভাষা বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে।

এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সম্প্রসারিত হতে পারে। বিশেষ করে জাপানের মতো দেশের ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি হলে দেশটির সঙ্গে শিক্ষা, প্রযুক্তি, ব্যবসা ও শ্রমবাজারভিত্তিক যোগাযোগে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা উপকৃত হতে পারেন।

তবে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম কার্যকর করতে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত শিক্ষক, উপযোগী পাঠ্যক্রম, শিক্ষাসামগ্রী এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

উপজেলা হাসপাতাল ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা

প্রবাসীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন নিয়েও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্বীকার করেন, দেশে এখনো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পরিধি প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। পাশাপাশি প্রতিটি উপজেলায় ডায়ালাইসিস সেবা চালু এবং নারী ও শিশুদের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত পৃথক ওয়ার্ড স্থাপনের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন।

উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানো গেলে স্থানীয় রোগীদের চিকিৎসার জন্য জেলা শহর কিংবা রাজধানীমুখী হওয়ার প্রয়োজন কিছুটা কমতে পারে। বিশেষ করে কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস সুবিধা এবং নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা চালু হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।

তবে হাসপাতালের শয্যা বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ এবং পরীক্ষাগার সুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব সেবা কার্যকরভাবে চালু করা গেলে উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসাব্যবস্থার মান উন্নয়নে উদ্যোগগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি শিল্প পুনরুজ্জীবন, বেসরকারি বিনিয়োগ, শিক্ষা সংস্কার এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। এসব খাতের উন্নয়ন পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।

শিল্পকারখানা চালু ও বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, শিক্ষাব্যবস্থায় ভাষা ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ বাড়লে তরুণদের দেশি-বিদেশি শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত করা সহজ হতে পারে। পাশাপাশি উন্নত স্বাস্থ্যসেবা মানুষের কর্মক্ষমতা ও জীবনমান বাড়াতে সহায়তা করে।

তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তব সুফল পেতে ঘোষণার পাশাপাশি সময়মতো বাস্তবায়ন, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

জাপান সফরকালে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া বক্তব্যে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, বন্ধ শিল্পকারখানা চালু, শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা উঠে এসেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতি ও জনসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!