রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগের প্রতিবাদে আন্দোলনরত শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষার্থীরা দুটি মেলার নির্মাণাধীন স্থাপনা ভাঙচুর করেছেন। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে শিক্ষার্থীদের একটি দল মাঠে গিয়ে এ ঘটনা ঘটায়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের নিবৃত্ত করে ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে নেয়।
শিক্ষার্থীদের দাবি, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠটি তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং এটি গবেষণাকাজে ব্যবহারের জন্য ফিরিয়ে দিতে হবে। সেখানে সচিবালয় স্থাপনের উদ্যোগ তাঁরা কোনোভাবেই মেনে নেবেন না। এ দাবিতে কয়েক দিন ধরে আন্দোলন করছেন তাঁরা।
অন্যদিকে, মাঠটিতে মেলার স্টল নির্মাণের কাজে যুক্ত ব্যক্তিরা অভিযোগ করেছেন, শিক্ষার্থীদের ভাঙচুরে তাঁদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তাঁদের দাবি, সরকারি অনুমতি নিয়ে মেলার প্রস্তুতি চলছিল। এমন পরিস্থিতিতে স্থাপনা ভাঙচুর ও নির্মাণসামগ্রী নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ঘিরে ঘটনাস্থলে উত্তেজনা তৈরি হয়।
পাশাপাশি দুটি মেলার প্রস্তুতি চলছিল মাঠে
পুলিশ ও মেলাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্যমতে, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে পাশাপাশি দুটি মেলার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে মাসব্যাপী ‘এশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা’ আয়োজনের প্রস্তুতি চলছিল। পাশেই এক সপ্তাহব্যাপী ‘যুব মেলা’ আয়োজনের কাজও চলছিল।
দুটি মেলাকে কেন্দ্র করে মাঠে প্রবেশের ফটক, টিনের বেড়া এবং বিভিন্ন স্টল নির্মাণ করা হচ্ছিল। বুধবার সকালে এসব নির্মাণাধীন স্থাপনার কয়েকটিতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
মেলার কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের অভিযোগ, সকালবেলা শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন শিক্ষার্থী মাঠে প্রবেশ করেন। ‘গবেষণার মাঠ ফেরত চাই, সচিবালয় নয়’ লেখা ব্যানার নিয়ে তাঁরা নির্মাণাধীন স্থাপনা ভাঙচুর করেন। এ সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও শিক্ষার্থীদের নিবৃত্ত করতে পারেনি বলে তাঁদের দাবি।
এ ছাড়া ভাঙচুরের সময় নির্মাণসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন মেলার কাজে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পৃথক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভাঙচুরে ক্ষতির অভিযোগ মেলাসংশ্লিষ্টদের
বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে দেখা যায়, মেলার জন্য নির্মিত টিনের বেড়ার একটি অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। কয়েকটি কাঠের কাঠামো মাটিতে পড়ে রয়েছে। স্টল নির্মাণের কাজে যুক্ত শ্রমিকেরা সেগুলো খুলে ফেলছিলেন।
যুব মেলার স্টল নির্মাণের কাজে যুক্ত ইউসুফ সর্দার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা সরকারের অনুমতি নিয়েই স্টল নির্মাণ করছিলেন। মাঠ নিয়ে কোনো আপত্তি থাকলে তা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করা উচিত। এ ক্ষেত্রে স্টল ভাঙচুর করে তাঁদের ক্ষতির মুখে ফেলার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ইউসুফ সর্দারের অভিযোগ, ভাঙচুরের পর শিক্ষার্থীরা স্টল নির্মাণের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিও নিয়ে গেছেন।
অন্যদিকে, এশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার স্টল নির্মাণের কাজে যুক্ত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁদের মেলার মূল ফটক ভাঙচুর করা হয়েছে। তাঁর দাবি, শতাধিক শিক্ষার্থী এসে ভাঙচুর চালিয়ে চলে যান। এতে তাঁদের কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং নির্মাণসামগ্রী নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ ঘিরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন
পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থাপনের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে আন্দোলন করছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের বক্তব্য, মাঠটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই সেখানে সচিবালয় স্থাপন না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য মাঠটি ফিরিয়ে দিতে হবে।
শিক্ষার্থীরা ‘গবেষণার মাঠ ফেরত চাই, সচিবালয় নয়’ স্লোগান সামনে রেখে তাঁদের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের আশঙ্কা, মাঠে সচিবালয় স্থাপন করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম ও প্রয়োজনীয় জায়গা ব্যবহারের সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে, মাঠে মেলার আয়োজন ও স্থাপনা নির্মাণ চলতে থাকায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে নতুন করে বিরোধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মাঠের ব্যবহার নিয়ে শিক্ষার্থীদের আপত্তি এবং মেলা আয়োজনে যুক্ত ব্যক্তিদের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ—দুই দিক থেকেই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
মাটি পরীক্ষার যন্ত্রাংশ ও গাড়ি ক্যাম্পাসে নেওয়ার অভিযোগ
এর আগের দিন মঙ্গলবার পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষার কাজ চলছিল। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সেখানে যান।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা মাটি পরীক্ষার কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ ও দুটি গাড়ি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিয়ে যান। ওই দিন তাঁরা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করেন।
মাঠটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার কাজে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে শিক্ষার্থীরা একটি স্টিয়ারিং কমিটিও গঠন করেছেন। এর মাধ্যমে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ও দাবিগুলো সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভাঙচুর ঠেকাতে পদক্ষেপের আশ্বাস বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের
ভাঙচুরের বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক তাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা কয়েক দিন ধরে আন্দোলন করছেন। তাঁদের দাবির বিষয়ে প্রশাসনিকভাবে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, এ ধরনের ভাঙচুরের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এ বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে প্রশাসনিক উদ্যোগের আশ্বাস পাওয়া গেলেও মাঠের ভবিষ্যৎ ব্যবহার এবং সচিবালয় স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে বিরোধের চূড়ান্ত সমাধান সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি।
মাঠের ব্যবহার নিয়ে সমাধানের অপেক্ষা
পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠ নিয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আপত্তি এবং সেখানে সচিবালয় স্থাপনের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। এর মধ্যে মেলার নির্মাণাধীন স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনায় মেলাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ তুলেছেন।
একদিকে শিক্ষার্থীরা মাঠটি গবেষণার কাজে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন, অন্যদিকে মেলার আয়োজনে যুক্ত ব্যক্তিরা তাঁদের নির্মাণকাজ ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। ফলে মাঠটির ব্যবহার, মেলার আয়োজন এবং সচিবালয় স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট অবস্থান ও কার্যকর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, মাঠটির ব্যবহারসংক্রান্ত অবস্থান এবং ভাঙচুরের অভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তির ওপর পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করছে।

