ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

menu

উখিয়ার রিসোর্টে আগুন: ১০ মরদেহ শনাক্ত, মেলেনি মুক্তার ডিএনএ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ১০:০৪ এএম

উখিয়ার রিসোর্টে আগুন: ১০ মরদেহ শনাক্ত, মেলেনি মুক্তার ডিএনএ

ছবিঃ সংগৃহীত

কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেকে ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে নিখোঁজ স্কুলশিক্ষক নাসরিন আক্তার মুক্তার ডিএনএ নমুনার সঙ্গে উদ্ধার করা ১০টি মরদেহের কোনোটিরই মিল পাওয়া যায়নি। ফলে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ থাকা এই শিক্ষকের অবস্থান নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রিমন ঘোষ। তিনি জানান, সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিহত ১০ জনের পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত হওয়া গেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) স্বজনদের কাছে তাঁদের মরদেহ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরের কথা রয়েছে।

অন্যদিকে, নিখোঁজ নাসরিন আক্তার মুক্তার সন্ধানে তাঁর মোবাইল ফোনের কল ডেটা ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।

নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত

গত ১৭ অক্টোবর সকালে উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকায় মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন তিনতলা টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু হয়। তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়।

শনাক্ত হওয়া নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের চারজন রয়েছেন। তাঁরা হলেন ঢাকার শ্যামলীর গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদুর রহমান (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন (৩৬) এবং তাঁদের দুই মেয়ে রোজাইনা ইনায়া (৯) ও মুনাইনা ইহানা (৬)।

একই অগ্নিকাণ্ডে ঢাকার বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকার বাসিন্দা আরেক পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা হলেন মৌলিতা মেহজাবিন আলভি (১৯), লায়লা জাহান নাবিলা (২৫), ইসরাত জাহান মালিহা (২৭), ফারিয়া কবির (৩৩), ফারিয়ার ছয় বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ ফাইজান নূর এবং তাঁর ভাই মোহাম্মদ নাফিস তেহামি (২৪)।

ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

নিখোঁজ স্কুলশিক্ষক মুক্তার সন্ধান মেলেনি

অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন সাভারের আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের ২৭ বছর বয়সী শিক্ষক নাসরিন আক্তার মুক্তা। দুই বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছিলেন তিনি।

মুক্তার স্বামী দেওয়ান ফয়সালের দাবি, আগুন লাগার সময় তাঁর স্ত্রী রিসোর্টের ভেতরের একটি কক্ষে আটকে পড়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে থাকা দুই বান্ধবী অক্ষত অবস্থায় বের হতে পারলেও মুক্তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

অগ্নিকাণ্ডের পর প্রথমদিকে ১১ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য সামনে আসে। পরে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার এবং তাঁদের পরিচয় শনাক্ত হলেও মুক্তার সন্ধান না মেলায় স্বজনদের উদ্বেগ কাটেনি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উদ্ধার করা ১০টি মরদেহের কোনো একটির সঙ্গেও মুক্তার ডিএনএ নমুনার মিল পাওয়া যায়নি। ফলে তিনি ওই ১০ জনের মধ্যে নেই—এ তথ্য নিশ্চিত হলেও তাঁর প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মুক্তার অবস্থান নির্ণয়ে তাঁর মোবাইল ফোনের কল ডেটা রেকর্ড (সিডিআর) ও লোকেশনসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এসব তথ্যের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের সময় তাঁর সম্ভাব্য অবস্থান এবং পরবর্তী যোগাযোগের বিষয়ে সূত্র পাওয়ার চেষ্টা চলছে।

তবে মুক্তা কোথায় আছেন, তিনি বেঁচে আছেন কি না কিংবা তাঁর নিখোঁজ হওয়ার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

আগুনে আহত হন আরও সাতজন

গত ১৭ অক্টোবর সকাল ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকার তিনতলা রিসোর্টটিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুনে ১০ জনের মৃত্যু ছাড়াও আরও সাতজন গুরুতর আহত হন। তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ, ভবনের অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ এবং আগুন লাগার পর উদ্ধার কার্যক্রমে কোনো ঘাটতি ছিল কি না—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।

তবে আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো অনিয়ম ছিল কি না, তা তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে।

সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অপেক্ষমাণ

অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহানকে প্রধান করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে কমিটির প্রতিবেদন এখনো জমা পড়েনি।

তদন্ত প্রতিবেদনে আগুনের সূত্রপাত, রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা, ভবন পরিচালনায় বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং প্রাণহানি এড়াতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব ছিল—এসব বিষয় উঠে আসতে পারে।

এ ধরনের ঘটনায় তদন্তের পাশাপাশি ভবন ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং অগ্নিকাণ্ডের সময় দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ।

রিসোর্টের মালিকসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা

অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনায় উখিয়া থানায় মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় রিসোর্টের মালিক মোহাম্মদ তানভীর সুলতান মিয়াকে প্রধান আসামি করে মোট ২৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।

ঘটনার পর থেকে প্রধান আসামি তানভীর সুলতান মিয়া এবং অপর মালিক নেওয়াজ মোর্শেদ পলাতক রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার তদন্তে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়; তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।

ডিএনএ শনাক্তের পরও কাটেনি স্বজনদের উদ্বেগ

টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত হওয়ায় তাঁদের স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এগিয়েছে। কিন্তু নিখোঁজ নাসরিন আক্তার মুক্তার সন্ধান না পাওয়ায় পুরো ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

মুক্তার মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ, অগ্নিকাণ্ডের সময় তাঁর অবস্থান অনুসন্ধান এবং তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন—এসবের ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী অগ্রগতি।

নিহতদের পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর, নিখোঁজ শিক্ষকের সন্ধান এবং অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এখন সংশ্লিষ্টদের প্রধান অগ্রাধিকার। পাশাপাশি এ ঘটনায় দায় বা অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!