গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছর বয়সী এক মাদরাসাছাত্রীকে চুমু দেওয়া ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষককে মারধর, মাদরাসায় ভাঙচুর এবং টাকা লুটের অভিযোগে করা মামলার আসামি শাহজালাল রুমি দেশ ছেড়েছেন বলে জানিয়েছেন। সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে সাংবাদিকদের পাঠানো এক খুদে বার্তায় তিনি নিজেই দেশ ছাড়ার কথা জানান। তবে তিনি বর্তমানে কোন দেশে অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে কিছু উল্লেখ করেননি।
রাত ৮টার দিকে পাঠানো বার্তায় শাহজালাল রুমি বলেন, ‘আমি এই দেশে আর নেই। এসব নিয়ে যা হয় হোক, যে যা খুশি বলুক, করুক আমার কোনো মন্তব্য নেই। আপনারা সবাই ভালো থাকেন।’
বার্তায় তিনি আরও অভিযোগ করেন, তাঁর প্রকাশ করা ভিডিও থেকে বিভিন্ন অংশ কেটে নিয়ে অনেক সাংবাদিক বিভিন্নভাবে প্রচার করেছেন। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় তাঁকে নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে ঘটনার বিষয়ে আইনের কাছে সঠিক বিচার চাওয়ার কথাও জানান রুমি।
তিনি বলেন, ‘আমি এই দেশবাসীকে একটাই অনুরোধ করব, আপনাদের সঙ্গেও যদি এমন ঘটনা হয়, প্রতিবাদ অবশ্যই করবেন।’
তবে রুমি সত্যিই দেশ ছেড়েছেন কি না এবং বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছেন, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
সাত বছরের শিশুকে নিপীড়নের অভিযোগে শিক্ষক কারাগারে
ঘটনার সূত্রপাত টঙ্গীর আওচপাড়া এলাকার ক্বারিউল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসায় সাত বছর বয়সী এক ছাত্রীর সঙ্গে কথিত অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। শিশুটিকে চুমু দেওয়া ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত হন মাদরাসার শিক্ষক মুসলেম উদ্দিন।
এ ঘটনায় শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হলে পুলিশ মুসলেম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। পরে গত রোববার গাজীপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাঁর জামিনের আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত আবেদনটি নামঞ্জুর করেন।
শিশুর প্রতি যৌন নিপীড়নের অভিযোগটি তদন্তাধীন। অভিযোগের সত্যতা ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
শিক্ষককে মারধর ও মাদরাসা ভাঙচুরের অভিযোগ
শিশুটিকে নিপীড়নের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর গত শুক্রবার টঙ্গীর আওচপাড়া এলাকায় অবস্থিত ক্বারিউল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসায় হামলা, শিক্ষককে মারধর, অফিসকক্ষ ভাঙচুর ও টাকা লুটের অভিযোগে পৃথক মামলা হয়।
মাদরাসার প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলমাস হোসেন বাদী হয়ে শাহজালাল রুমির বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। মামলায় বহিরাগতদের নিয়ে মাদরাসায় প্রবেশ, শিক্ষককে মারধর, অফিসকক্ষ ভাঙচুর এবং ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, শিশুকে নিপীড়নের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার মধ্যে মাদরাসায় এ ঘটনা ঘটে। তবে হামলা, ভাঙচুর ও টাকা লুটের অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
একই ঘটনায় দুই পক্ষের মামলা
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে পৃথক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একদিকে শিশুকে চুমু দেওয়া ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগে শিক্ষক মুসলেম উদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অন্যদিকে মাদরাসায় প্রবেশ, শিক্ষককে মারধর, ভাঙচুর ও টাকা লুটের অভিযোগে শাহজালাল রুমিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ।
এভাবে একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুটি পৃথক অভিযোগ সামনে এসেছে। একটি শিশুর নিরাপত্তা ও কথিত যৌন নিপীড়নের অভিযোগসংক্রান্ত, অন্যটি মাদরাসায় হামলা, ভাঙচুর ও অর্থ লুটের অভিযোগসংক্রান্ত।
দুটি অভিযোগেরই পৃথকভাবে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত নিষ্পত্তি প্রয়োজন।
১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, মাদরাসায় ভাঙচুর, টাকা লুট ও শিক্ষককে মারধরের অভিযোগে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ওই অভিভাবকসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
তবে শাহজালাল রুমি দেশ ছেড়েছেন বলে যে দাবি করেছেন, সে বিষয়ে পুলিশ বা অন্য কোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া গেলে তাঁর অবস্থান এবং মামলার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা
ঘটনাটি নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। শিশুকে নিপীড়নের অভিযোগের পাশাপাশি মাদরাসায় হামলা, শিক্ষককে মারধর এবং ভিডিও প্রকাশ ও প্রচারের বিষয়গুলোও আলোচনায় এসেছে।
এ ধরনের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বা বক্তব্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে শিশুটির পরিচয় ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা এবং তার মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর প্রতি যৌন নিপীড়নের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগকে কেন্দ্র করে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তারও আইনগত জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

