রাজধানীর প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয় আবদুল গনি রোড থেকে শেরেবাংলা নগরের পুরোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণের এ পরিকল্পনাকে ঘিরে প্রশাসনিক অবকাঠামোর আধুনিকায়নের প্রত্যাশা তৈরি হলেও প্রস্তাবিত ব্যয়, জমির ব্যবহার, পরিবেশের ওপর প্রভাব, যানজট এবং রাজধানীকেন্দ্রিক প্রশাসনিক কার্যক্রমের চাপ নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগারগাঁওয়ে প্রায় ৩১ দশমিক ৫৮ একর জমিতে নির্মিত হবে নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্স। এতে ১২ তলাবিশিষ্ট ১৪টি ভবন, তিনটি বেজমেন্ট, গাড়ি পার্কিং, মসজিদ, বহুমুখী হল, ক্যাফেটেরিয়া ও ডাকঘরের ব্যবস্থা রাখার কথা রয়েছে। পুরো কমপ্লেক্সের আয়তন হবে প্রায় ৩৩ লাখ ১৬ হাজার বর্গফুট। পরিকল্পনায় প্রায় ৩ হাজার ৮০০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থার পাশাপাশি ৩০ শতাংশ জায়গা সবুজ এলাকা ও জলাধার হিসেবে রাখার কথা বলা হয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য, ২০২৯ সালের মধ্যে নতুন কমপ্লেক্স থেকে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করা। তবে প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ৩ হাজার ৪০৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার বেশি হতে পারে বলে বিভিন্ন সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। চূড়ান্ত নকশা, প্রকৌশলগত যাচাই ও ব্যয় নির্ধারণের কাজ শেষ না হওয়ায় এ অঙ্ককে চূড়ান্ত অনুমোদিত ব্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সরকারের যুক্তি, বর্তমান সচিবালয়ে জায়গার সংকট, পুরোনো ভবন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবাদী ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশের আশঙ্কা, স্থানান্তরের নামে সমস্যার সমাধান না হয়ে বরং রাজধানীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যানবাহন ও জনসংখ্যার চাপ বাড়তে পারে। তাদের প্রশ্ন, ব্যয় সাশ্রয় ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলা হলেও এত বড় প্রকল্পের আগে বিকল্প স্থান, পরিবেশগত প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদি সুফল যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদন, ২০২৯ সালের মধ্যে কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য
গত ১৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে শেরেবাংলা নগরের পুরোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন কমপ্লেক্স নির্মাণের পর ২০২৯ সালের মধ্যে সেখানে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করা হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, প্রায় ৩১ দশমিক ৫৮ একর জমিতে নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নকশায় ১২ তলাবিশিষ্ট ১৪টি ভবন থাকবে। ভবনগুলোর নিচে তিনটি বেজমেন্ট, গাড়ি পার্কিংসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া কমপ্লেক্সে মসজিদ, বহুমুখী হল, ক্যাফেটেরিয়া ও ডাকঘর নির্মাণের কথা রয়েছে। প্রায় ৩৩ লাখ ১৬ হাজার বর্গফুট আয়তনের এই কমপ্লেক্সে ৩ হাজার ৮০০টি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০০টি গাড়ি মাটির ওপরে পার্কিং করতে পারবে বলে জানানো হয়েছে।
পরিকল্পনায় প্রকল্প এলাকার ৩০ শতাংশ জায়গা সবুজ এলাকা ও জলাধার হিসেবে রাখার কথাও রয়েছে। তবে এই সবুজ এলাকা কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, জলাধারের পরিমাণ কত হবে এবং নির্মাণ-পরবর্তী সময়ে পরিবেশগত ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে, সেগুলো বিস্তারিত নকশা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
বর্তমান সচিবালয়ে কেন জায়গার সংকট
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সচিবালয় কমপ্লেক্সের জায়গা সীমিত এবং সেখানে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনায় বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৭ দশমিক ৫৭ একর জায়গায় ১৩টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে আটটি ভবন স্বাধীনতার আগে নির্মিত।
বর্তমান ভবনগুলোতে প্রায় ১৮ লাখ ৭৬ হাজার বর্গফুট অফিস স্পেস থাকলেও প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত জায়গার চাহিদা ১০ লাখ বর্গফুটের বেশি বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া কিছু ভবনের ভূমিকম্প সহনশীলতা, স্যানিটেশন সুবিধা ও আধুনিক দাপ্তরিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
বর্তমান সচিবালয় কমপ্লেক্সের বাইরে ১৬টি মন্ত্রণালয়ের অবস্থানও প্রশাসনিক কার্যক্রম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে একটি বিবেচ্য বিষয়। নতুন কমপ্লেক্সে এসব মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম এক জায়গায় আনার সম্ভাবনা রয়েছে বলে পরিকল্পনায় ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
সরকারের দৃষ্টিতে, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে দাপ্তরিক কাজের পরিবেশ উন্নত করা, মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং জায়গার সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে। তবে নতুন ভবন নির্মাণই এসব সমস্যার একমাত্র সমাধান কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
তাদের মতে, প্রশাসনিক কার্যক্রমের দক্ষতা শুধু ভবনের আয়তন বা আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভর করে না। দাপ্তরিক ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল সেবা, মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়, গণপরিবহন এবং নাগরিকদের সহজে সরকারি সেবা পাওয়ার সুযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
৩ হাজার ৪০৯ কোটি টাকার প্রকল্প, ব্যয় সাশ্রয়ের নীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ
সচিবালয় স্থানান্তর প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ৩ হাজার ৪০৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার বেশি হতে পারে বলে বিভিন্ন সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত সময়সূচি অনুযায়ী, চলতি বছরের নভেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ধরা হয়েছে। তবে বিস্তারিত নকশা ও প্রকৌশলগত কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় প্রকৃত ব্যয় কত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত নয়।
এখানেই সরকারের ব্যয় সাশ্রয়, অপচয় কমানো এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতির সঙ্গে নতুন সচিবালয় নির্মাণের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বড় অবকাঠামো প্রকল্পে প্রাথমিক ব্যয় প্রাক্কলনের সঙ্গে বাস্তবায়নকালীন ব্যয়ের পার্থক্য তৈরি হতে পারে। নির্মাণসামগ্রীর মূল্য, নকশায় পরিবর্তন, প্রকৌশলগত জটিলতা, জমির উন্নয়ন এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয় প্রকল্পের মোট খরচ বাড়াতে পারে। ফলে প্রস্তাবিত ব্যয়ের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, বর্তমান সচিবালয়ের অবকাঠামোয় ইতোমধ্যে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব কি না, নতুন প্রকল্পের ব্যয় কতটা যুক্তিসংগত এবং স্থানান্তরের ফলে দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের আর্থিক ও প্রশাসনিক সুফল পাওয়া যাবে—এসব বিষয় তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
শুধু নতুন ভবন নির্মাণের ব্যয় নয়, বর্তমান অবকাঠামো ব্যবহারের সম্ভাবনা, সংস্কারের বিকল্প, পর্যায়ক্রমে ভবন উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম বিভিন্ন স্থানে ভাগ করে দেওয়ার সম্ভাবনাও মূল্যায়ন করা জরুরি। এতে প্রকল্পের প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা ও ব্যয়-সুফলের তুলনা স্পষ্ট হতে পারে।
আগারগাঁওয়ের জমি নিয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আপত্তি
নতুন সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে সবচেয়ে জোরালো আপত্তিগুলোর একটি এসেছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশের দাবি, আগারগাঁওয়ের পুরোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার জমি। কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার জন্য জমির সংকট থাকা অবস্থায় এই মাঠ সচিবালয়ের কাজে ব্যবহার করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
গত ১৫ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মাঠটি পুনরুদ্ধারের দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এর আগেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মাঠটি ফেরত পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে আবেদন জানিয়েছিল বলে তারা উল্লেখ করেন।
শেকৃবির গবেষণা মাঠ পুনরুদ্ধার স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়ক ও উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এম সালাহউদ্দিন চৌধুরী মনে করেন, আগারগাঁওয়ে সচিবালয় নির্মাণ হলে এলাকার বর্তমান পরিবেশ ও শান্ত আবহ ব্যাহত হতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, নতুন কমপ্লেক্স চালু হলে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী, দর্শনার্থী ও যানবাহনের উপস্থিতিতে এলাকাটিতে চাপ বাড়বে।
অধ্যাপক এম সালাহউদ্দিন চৌধুরীর ভাষ্য, সচিবালয়ে প্রতিদিন অতিরিক্ত তিন থেকে চার হাজার গাড়ি প্রবেশ ও বের হতে পারে। এতে এলাকার সড়কে যানজট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি, রাজধানীতে কোনো দুর্যোগ দেখা দিলে মানুষের নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার পথও সংকুচিত হতে পারে।
তিনি আরও মনে করেন, ঢাকার ভেতরে একের পর এক প্রশাসনিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা কেন্দ্রীভূত না করে পূর্বাঞ্চলে জনবসতি ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক কেন্দ্র পুত্রজায়ার উদাহরণ টেনে তিনি আলাদা প্রশাসনিক অঞ্চল গড়ে তোলার পক্ষে মত দেন। তাঁর মতে, আগারগাঁওয়ে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্বেগ ও আপত্তি শোনা উচিত।
পরিবেশ ও উন্মুক্ত জায়গা কমে যাওয়ার শঙ্কা
আগারগাঁওয়ে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)। সংগঠনটির মতে, রাজধানী ঢাকায় উন্মুক্ত জায়গা, খেলার মাঠ ও মানুষের হাঁটাচলার উপযোগী স্থান এমনিতেই সীমিত। অবশিষ্ট উন্মুক্ত জায়গা উন্নয়নের নামে সংকুচিত হলে নগরের বাসযোগ্যতা আরও কমে যেতে পারে।
বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, একটি বাসযোগ্য নগরে যে পরিমাণ উন্মুক্ত জায়গা থাকা প্রয়োজন, ঢাকায় তার তুলনায় অনেক কম জায়গা রয়েছে। আগারগাঁওয়ের প্রস্তাবিত স্থানটি সকাল ও সন্ধ্যায় বহু মানুষের হাঁটাচলা, ব্যায়াম এবং দৈনন্দিন চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর মতে, অবশিষ্ট উন্মুক্ত জায়গা সংরক্ষণ করা নগর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এই জায়গায় সচিবালয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বিকল্প স্থান বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ শুধু নির্মাণকাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন কমপ্লেক্স চালু হলে আশপাশের এলাকায় যানবাহনের সংখ্যা, শব্দ, বায়ুদূষণ, জনসমাগম এবং সড়কের ওপর চাপ বাড়তে পারে। নির্মাণকাজের সময় ধুলাবালি, ভারী যানবাহনের চলাচল এবং সবুজ এলাকার ওপর প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তবে প্রকল্প এলাকায় ৩০ শতাংশ সবুজ জায়গা ও জলাধার রাখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। এই পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, বিদ্যমান উন্মুক্ত জায়গার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী হবে এবং এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য কতটা বজায় থাকবে—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে বিস্তারিত নকশা, পরিবেশগত মূল্যায়ন ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থার ওপর।
বাপার সাধারণ সম্পাদকের মতে, মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। এতে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের সুযোগ তৈরি হবে এবং দূরবর্তী এলাকা থেকে সরকারি কাজে ঢাকায় আসার প্রয়োজনও কমতে পারে।
আগারগাঁও, নাকি পূর্বাচল—বিকল্প স্থান নিয়ে বিতর্ক
সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্তের পর আগারগাঁওয়ের পাশাপাশি পূর্বাচলকে বিকল্প স্থান হিসেবে বিবেচনার প্রশ্নও সামনে এসেছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের একাংশের মতে, রাজধানীর ওপর চাপ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনিক কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্য থাকলে নতুন প্রশাসনিক স্থাপনার অবস্থান নির্ধারণে ঢাকার সামগ্রিক নগর পরিকল্পনা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক এবং ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, আগারগাঁওয়ে সচিবালয় স্থানান্তর করলে ওই এলাকার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে পূর্বাচলে সচিবালয় নির্মাণ করা হলে সেখানে সরকারের বিনিয়োগে গড়ে ওঠা সড়ক অবকাঠামোর ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি ঢাকার ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারত।
তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের ইচ্ছার ওপর ভিত্তি করে নগর পরিকল্পনা করা যায় না। রাজধানীর ওপর চাপ কমানো, সরকারি কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর উন্নয়নের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, নতুন সচিবালয় নির্মাণের আগে বর্তমান অবকাঠামোয় ইতোমধ্যে করা বিনিয়োগ, নতুন প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফলের তুলনামূলক মূল্যায়ন জরুরি। সরকারের ব্যয় সাশ্রয়ের নীতির সঙ্গে এত বড় প্রকল্পের ব্যয় কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিও বিশ্লেষণ করা উচিত।
তবে এ বিষয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আবদুল আওয়াল মজুমদার আগারগাঁওয়ে সচিবালয় নির্মাণের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, রাজধানীর কেন্দ্রীয় যোগাযোগব্যবস্থা এবং সরকারি আবাসন থেকে যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনায় আগারগাঁও কার্যকর স্থান হতে পারে। কৃষি গবেষণার জন্য শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় জমি ধরে রাখার পরিবর্তে অন্য এলাকায় উপযুক্ত জমির ব্যবস্থা করার কথাও তিনি মনে করেন।
এই ভিন্নমত থেকে স্পষ্ট, সচিবালয়ের অবস্থান নির্ধারণে শুধু একটি স্থানের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করলেই চলবে না। বিকল্প স্থানগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামো, পরিবেশ, জমির ব্যবহার, সরকারি বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর উন্নয়নের ওপর প্রভাবও তুলনা করা প্রয়োজন।
ভবন বদলালেই কি যানজট ও নাগরিক দুর্ভোগ কমবে?
নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞদের মতে, সচিবালয় স্থানান্তরের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে নতুন কমপ্লেক্সের নকশা, পরিবহনব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার পদ্ধতির ওপর। বর্তমান সচিবালয়ের জায়গার সংকট দূর হলেও কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দর্শনার্থীদের যাতায়াত, যানবাহনের চাপ এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলো নতুন জায়গায় একইভাবে থেকে গেলে স্থানান্তরের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মুসলেহ উদ্দিন হাসানের মতে, বর্তমান সচিবালয়ের ভবন বিন্যাস, পরিবহন ব্যবস্থা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাতায়াতের সমস্যাগুলো নতুন স্থানে সংশোধন করা গেলে সুফল পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সমস্যার মূল কারণ দূর না করে শুধু স্থান পরিবর্তন করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। একইভাবে, বর্তমান সচিবালয়ের পরিকল্পনাগত ত্রুটি নতুন স্থানে পুনরাবৃত্তি হলে স্থানান্তরের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন সচিবালয়ে ভবনের উচ্চতা বাড়িয়ে অফিসের জায়গার সংকট কমানো সম্ভব হলেও যানবাহনের চাপ নিয়ন্ত্রণে আলাদা পরিকল্পনা দরকার। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমানো, গণপরিবহনের ব্যবহার বাড়ানো, পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং দর্শনার্থীদের প্রবেশব্যবস্থা সহজ করা গুরুত্বপূর্ণ।
আগারগাঁওয়ের ক্ষেত্রে মেট্রোরেল যোগাযোগ একটি সম্ভাব্য সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অধ্যাপক মুসলেহ উদ্দিন হাসানের মতে, প্রস্তাবিত স্থানটি আগারগাঁও ও বিজয় সরণি মেট্রোরেল স্টেশনের মাঝামাঝি হওয়ায় হেঁটে যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে। যারা হেঁটে আসতে পারবেন না, তাঁদের জন্য শাটল সার্ভিস বা বিনামূল্যের পরিবহনসেবা চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে মেট্রোরেল যোগাযোগ থাকলেই যানজটের সমস্যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। স্টেশন থেকে সচিবালয়ে যাতায়াতের পথ, পথচারীদের জন্য ফুটপাত, সড়কের সংযোগ, গণপরিবহনের ধারণক্ষমতা এবং আশপাশের এলাকার দৈনন্দিন চলাচলের ওপর প্রকল্পের প্রভাব একসঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন সচিবালয়ের নকশায় গণপরিবহন ও পথচারীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুবিধা নয়, আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের যাতায়াত, যানজট এবং নাগরিক ভোগান্তিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ কতটা জরুরি
ঢাকার ওপর জনসংখ্যা, যানবাহন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের চাপ কমানোর দাবি দীর্ঘদিনের। রাজধানীতে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কেন্দ্রীভূত থাকায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষকে নানা প্রয়োজনে ঢাকায় আসতে হয়।
নগর পরিকল্পনাবিদদের একাংশের মতে, শুধু সচিবালয়ের অবস্থান পরিবর্তন করে এই চাপের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরের কার্যক্রমের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন স্থানে দপ্তর স্থাপন, আঞ্চলিক পর্যায়ে সরকারি সেবা সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল সেবার ব্যবহার বাড়ানোর মতো উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রশাসনিক কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণ করা গেলে সরকারি কাজের জন্য রাজধানীতে যাতায়াতের প্রয়োজন কমতে পারে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শহরগুলোতে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে ঢাকাকেন্দ্রিক প্রবণতা কমানো সম্ভব হতে পারে।
তবে বিকেন্দ্রীকরণ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়, যোগাযোগব্যবস্থা, দাপ্তরিক তথ্যের আদান-প্রদান এবং নাগরিকদের সেবা পাওয়ার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পরিকল্পনা ছাড়া দপ্তরগুলো ছড়িয়ে দিলে প্রশাসনিক সমন্বয়ের নতুন সমস্যাও তৈরি হতে পারে।
এ কারণে সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্তকে শুধু একটি নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে না দেখে দেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও নগর উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ
নতুন সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে কয়েকটি বিষয়ে স্পষ্ট মূল্যায়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
প্রথমত, বর্তমান সচিবালয়ের জায়গার সংকট সংস্কার, ভবন পুনর্বিন্যাস বা আধুনিকায়নের মাধ্যমে কতটা সমাধান করা সম্ভব, তা যাচাই করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, আগারগাঁও ও পূর্বাচলসহ সম্ভাব্য বিকল্প স্থানগুলোর ব্যয়, যোগাযোগ, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা তুলনা করা জরুরি।
তৃতীয়ত, নতুন কমপ্লেক্স চালু হলে প্রতিদিন কত মানুষ ও যানবাহন এলাকায় প্রবেশ করবে, আশপাশের সড়ক সেই চাপ সামলাতে পারবে কি না এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন প্রয়োজন হবে—এসব বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক সমীক্ষা দরকার। চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার জমি, উন্মুক্ত স্থান, সবুজ এলাকা ও জলাধারের ব্যবহার নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আপত্তি ও প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
পঞ্চমত, প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয় এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের সম্ভাব্য সুফল মূল্যায়ন করতে হবে। এতে সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
সবশেষে, নতুন সচিবালয়ের নকশায় আধুনিক ভবন নির্মাণের পাশাপাশি গণপরিবহন, পথচারীবান্ধব অবকাঠামো, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং প্রশাসনিক দক্ষতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সমস্যা স্থানান্তর নয়, প্রয়োজন পরিকল্পিত সমাধান
সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্তে প্রশাসনিক অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং দাপ্তরিক কার্যক্রমের পরিবেশ উন্নত করার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু প্রকল্পটির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কত বড় বা আধুনিক ভবন নির্মিত হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি—এতে সরকারি সেবার মান কতটা বাড়ছে, নাগরিকদের দুর্ভোগ কতটা কমছে এবং রাজধানীর ওপর চাপ কতটা নিয়ন্ত্রণে আসছে, তার ওপর।
আগারগাঁওয়ে নতুন সচিবালয় নির্মাণের পক্ষে যোগাযোগব্যবস্থা ও আধুনিক অবকাঠামোর যুক্তি রয়েছে। অন্যদিকে জমির ব্যবহার, কৃষি গবেষণা, উন্মুক্ত স্থান, যানজট ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেগুলোও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। পূর্বাচলসহ বিকল্প স্থান বিবেচনার প্রশ্ন এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় রাখা জরুরি।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের চূড়ান্ত ব্যয়, নকশা, পরিবেশগত প্রভাব ও পরিবহন পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত বিবেচনা করা হলে সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং নগরের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষার সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মূল সতর্কতা—বর্তমান সচিবালয়ের সমস্যা যেন নতুন এলাকায় গিয়ে আবারও তৈরি না হয়। শুধু স্থান পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন এমন পরিকল্পনা, যা প্রশাসনিক কার্যক্রমকে দক্ষ করবে, নাগরিকদের সেবা পাওয়া সহজ করবে এবং ঢাকাকে আরও বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।

