ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬

menu

রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি, তবু সংকটে পোশাক খাত: জ্বালানি ব্যয় ও অর্ডার হারানোর শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২০, ২০২৬, ১১:৪৭ এএম

রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি, তবু সংকটে পোশাক খাত: জ্বালানি ব্যয় ও অর্ডার হারানোর শঙ্কা

ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি আয়ের পরিসংখ্যানে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও বাস্তবে সংকট কাটছে না। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়েছে। তবে খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের দাবি, আগের বছরের তুলনামূলক দুর্বল ভিত্তির কারণে প্রবৃদ্ধির হার বেশি দেখাচ্ছে। অন্যদিকে মাসভিত্তিক হিসাবে রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমেছে, বেড়েছে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয়।

জ্বালানি সংকট, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ, সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণের চাপ এবং অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় মোকাবিলা করতে গিয়ে আর্থিক চাপে পড়ছেন উদ্যোক্তারা। ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছে দিতে অনেক কারখানাকে স্বাভাবিক কর্মঘণ্টার চেয়ে বেশি সময় উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। কোথাও অতিরিক্ত শ্রমিকের মজুরি দিতে হচ্ছে, কোথাও ডিজেল ও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। আবার সময়সীমা রক্ষায় কিছু পণ্য আকাশপথে পাঠানোর মতো ব্যয়বহুল সিদ্ধান্তও নিতে হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি দিয়ে তৈরি পোশাক খাতের সামগ্রিক স্বাস্থ্য নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু রপ্তানি আয়ের অঙ্ক নয়, উৎপাদন ব্যয়, মুনাফা, কর্মসংস্থান, কারখানার সক্ষমতা এবং নতুন ক্রয়াদেশের প্রবণতাও বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ করে বড় কারখানাগুলো ব্যবসা ধরে রাখতে পারলেও ছোট ও মাঝারি কারখানার সক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

তিন মাসে রপ্তানি আয় ৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়েছে

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ৫৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৯৯৭ কোটি ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ।

সেপ্টেম্বর মাসেও আগের বছরের একই মাসের তুলনায় তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি হয়েছে বলে ইপিবির পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে রপ্তানি খাতে প্রবৃদ্ধির চিত্র দেখা গেলেও উদ্যোক্তারা বলছেন, এ প্রবৃদ্ধি ব্যবসায়িক পরিস্থিতির প্রকৃত উন্নতির প্রতিফলন নয়।

তাঁদের যুক্তি, গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি তুলনামূলক কম থাকায় চলতি বছরের প্রবৃদ্ধির হার বেশি দেখাচ্ছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি আয় বাড়লেও সেই অনুপাতে মুনাফা বাড়ছে না। ফলে রপ্তানির পরিমাণ ধরে রাখার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠানকে বাড়তি আর্থিক চাপ নিতে হচ্ছে।

মাসের ব্যবধানে টানা কমেছে রপ্তানি আয়

ইপিবির দেওয়া মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিক পতন দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে এ খাতে রপ্তানি আয় ছিল ৩৮৮ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ৩৬০ কোটি ৮৮ লাখ ডলারে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ।

পরের মাস সেপ্টেম্বরে রপ্তানি আয় আরও কমে দাঁড়ায় ৩০৮ কোটি ২৯ লাখ ডলারে। আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরের এ পতনের হার ১৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

এ হিসাবে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—টানা তিন মাসে মাসভিত্তিক রপ্তানি আয় কমেছে। যদিও আগের বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান রপ্তানির গতিতে দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে মাসভিত্তিক আয় কমার কারণ নির্ধারণে মৌসুমি প্রভাব, ক্রয়াদেশের সময়সূচি, পণ্য জাহাজীকরণের সময় এবং অন্যান্য বাজার পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তারপরও উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, বাড়তি উৎপাদন ব্যয় ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

বাড়তি ব্যয়ে রপ্তানি ধরে রাখার চেষ্টা

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ইপিবির হিসাবে যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তার অন্যতম কারণ গত বছরের একই সময়ে রপ্তানি কম থাকা। তাই এ পরিসংখ্যান থেকে ব্যবসায়িক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।

তিনি বলেন, সময়মতো পণ্য পাঠাতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এতে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে এবং সেই চাপ এখনো রয়েছে। তাঁর মতে, রপ্তানি আয়ের হিসাবের পাশাপাশি এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।

জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে জ্বালানি সংকট পোশাক খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বলে জানান তিনি। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি।

মাহমুদ হাসান খানের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে অনেক কারখানায় দৈনিক ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ করে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যেত। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ নিশ্চিত করতে এখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত উৎপাদন চালাতে হচ্ছে।

এতে শ্রমিকদের অতিরিক্ত মজুরি দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেল কিনতে হচ্ছে এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আকাশপথে পণ্য পাঠানোর প্রয়োজনও দেখা দিচ্ছে, যা সমুদ্রপথের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল।

উদ্যোক্তাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ শুধু চুক্তি পালনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে ক্রেতাদের আস্থা ও ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশও জড়িত। নির্ধারিত সময়ে পণ্য দিতে না পারলে ক্রেতারা অন্য দেশের সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকতে পারেন। তাই আর্থিক ক্ষতি হলেও ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে বাড়তি ব্যয় বহন করছেন অনেক উদ্যোক্তা।

গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন সক্ষমতা কমেছে

বিজিএমইএর সহসভাপতি ও এমিটি ডিজাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে বেশির ভাগ কারখানা তাদের পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারেনি।

তাঁর মতে, ইপিবির পরিসংখ্যানে আগের বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। গত বছর ওই সময়ে রপ্তানি কম থাকায় চলতি বছরের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বর্তমান রপ্তানি আয় স্বাভাবিক সময়ের গড় আয়ের চেয়েও কম বলে তিনি মনে করেন।

জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকলে কারখানার উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হয়। নির্ধারিত সময়ে কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করা, পোশাক তৈরি, মান যাচাই এবং রপ্তানির জন্য পণ্য প্রস্তুত করা কঠিন হয়ে পড়ে। উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হলে একদিকে ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছানোর সময়সীমা রক্ষা করা কঠিন হয়ে ওঠে।

এ পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার অন্যতম শর্ত হয়ে উঠেছে। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশকে শুধু পণ্যের মান ও দামের ভিত্তিতে নয়, সরবরাহের সময় এবং নির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতা করতে হয়।

বড় কারখানা টিকে থাকলেও চাপে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান মনে করেন, শুধু রপ্তানি আয়ের পরিসংখ্যান দিয়ে পোশাক খাতের প্রকৃত অবস্থা বোঝা সম্ভব নয়। দেখতে হবে কর্মসংস্থান বাড়ছে কি না, নতুন কারখানা তৈরি হচ্ছে নাকি বন্ধ হচ্ছে এবং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায় টিকে থাকার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারছে কি না।

তিনি বলেন, বড় কারখানাগুলো আরও বড় হচ্ছে, অন্যদিকে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর অনেকগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এটি শুধু তৈরি পোশাক খাতের জন্য নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক।

ফজলে শামীম এহসানের মতে, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব প্রতিষ্ঠান বিকশিত হলে কর্মসংস্থান বাড়ে, উৎপাদনভিত্তি বিস্তৃত হয় এবং অর্থনীতির ওপর নির্ভরতার ক্ষেত্রও বাড়ে। বিপরীতে ছোট ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে কর্মসংস্থান, স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা এবং উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানি কম থাকায় চলতি বছরের পরিসংখ্যানে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি বড় কারখানাগুলো আর্থিক ক্ষতি মেনে নিয়ে বিপুল পরিমাণ ডিজেল ও নিজস্ব উৎস থেকে এলপিজি কিনে উৎপাদন চালু রেখেছে। এতে উৎপাদন ও রপ্তানির ধারাবাহিকতা কিছুটা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এ কারণে পুরো খাতের পরিস্থিতি ভালো—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি বেড়েছে

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান বাজারের পাশাপাশি অপ্রচলিত বাজারেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি বেড়েছে ৯ দশমিক ৪০ শতাংশ।

এতে দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানিতে অপ্রচলিত বাজারের হিস্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।

প্রচলিত বাজারের বাইরে নতুন বাজারে রপ্তানি বাড়ানো বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নির্দিষ্ট কয়েকটি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে সেসব দেশে চাহিদা কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতি কিংবা বাণিজ্যনীতির পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি রপ্তানিতে পড়তে পারে। নতুন বাজারে প্রবেশ ও বিদ্যমান বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করতে পারলে এ ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব।

তবে অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি বাড়লেও তা সামগ্রিক সংকট কাটিয়ে ওঠার প্রমাণ নয়। বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং প্রতিযোগিতামূলক দামে মানসম্মত পণ্য সরবরাহের সক্ষমতাও ধরে রাখতে হবে।

ইউরোপের বাজারে রপ্তানি কমার উদ্বেগ

বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমেছে। এ সময়ে নিট পোশাকের রপ্তানি কমেছে ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ।

সংগঠনটির মতে, ইউরোপের বাজারে এ পতনের পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ভোক্তাদের চাহিদা সংকুচিত হওয়া, মূল্যস্ফীতি এবং বাংলাদেশের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো ভূমিকা রেখেছে।

ইউরোপ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। ফলে এ বাজারে দীর্ঘস্থায়ী পতন হলে উৎপাদন পরিকল্পনা, কারখানার সক্ষমতা ব্যবহার এবং নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে, বৈশ্বিক বাজারে ক্রেতারা পণ্যের দাম, মান, সরবরাহের সময় এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্যতা বিবেচনা করে সরবরাহকারী নির্বাচন করেন। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের পণ্যের দাম প্রতিযোগিতামূলক রাখা কঠিন হতে পারে। আবার ব্যয় বৃদ্ধির পুরোটা ক্রেতার ওপর চাপানোও সব সময় সম্ভব হয় না। ফলে বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ উদ্যোক্তাদের নিজেদের বহন করতে হচ্ছে।

ওভেন ও নিট—দুই খাতেই প্রবৃদ্ধি

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ওভেন পোশাকের রপ্তানি আয় বেড়েছে ৫ দশমিক ১১ শতাংশ। একই সময়ে নিট পোশাকের রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

অর্থাৎ দুই ধরনের পোশাকেই বার্ষিক হিসাবে প্রবৃদ্ধি রয়েছে। তবে এ প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই এবং উৎপাদন ব্যয় ও মুনাফার ওপর এর প্রকৃত প্রভাব কী—তা বুঝতে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন।

রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি উৎপাদনের পরিমাণ, প্রতি ইউনিট পণ্যের ব্যয়, কারখানার সক্ষমতা ব্যবহার, ক্রয়াদেশের প্রবণতা এবং কর্মসংস্থানের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করলে খাতটির প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

রপ্তানি প্রবৃদ্ধির আড়ালে কতটা আর্থিক চাপ?

পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—রপ্তানি আয় বাড়া এবং ব্যবসায়িক পরিস্থিতির উন্নতি এক বিষয় নয়। রপ্তানি বাড়লেও উৎপাদন ব্যয় যদি আরও বেশি হারে বাড়ে, তাহলে প্রতিষ্ঠানের মুনাফা কমে যেতে পারে। একইভাবে, ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে সময়মতো পণ্য পাঠানো সম্ভব হলেও সে জন্য অতিরিক্ত শ্রম, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বহন করতে হলে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।

এ কারণে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি খাতের লাভজনকতা, নগদ অর্থপ্রবাহ, ঋণের চাপ এবং কারখানার টিকে থাকার সক্ষমতার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি ব্যয় বহন করার মতো আর্থিক সামর্থ্য না রাখলে তাদের উৎপাদন কমানো বা কারখানা বন্ধ করার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন পরিকল্পনা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। এতে সময়মতো পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা—দুটিই চাপে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংকট কাটাতে কী প্রয়োজন?

খাতসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও রপ্তানির পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সামনে এখন কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা এবং ছোট ও মাঝারি কারখানার টিকে থাকার পরিবেশ নিশ্চিত করা।

উদ্যোক্তাদের মতে, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা কমানো গেলে উৎপাদন পরিকল্পনা স্থিতিশীল হবে এবং জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত ব্যয় করে পণ্য পাঠানোর প্রয়োজন কমতে পারে। পাশাপাশি ইউরোপের মতো প্রধান বাজারে রপ্তানি পুনরুদ্ধার এবং অপ্রচলিত বাজারে প্রবেশ বাড়ানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

শুধু রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধিকে সাফল্যের একমাত্র সূচক হিসেবে বিবেচনা না করে কর্মসংস্থান, কারখানার সংখ্যা, উৎপাদন সক্ষমতা, মুনাফা এবং ক্রয়াদেশের প্রবণতাও নিয়মিত মূল্যায়ন করা দরকার। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক পরিসংখ্যান হলেও তা খাতটির সংকট কেটে যাওয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। মাসভিত্তিক রপ্তানি আয় কমা, জ্বালানি সংকট, বাড়তি উৎপাদন ব্যয় এবং ইউরোপের বাজারে রপ্তানি হ্রাসের তথ্য খাতটির সামনে থাকা চাপের বিষয়টি তুলে ধরছে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, পরিসংখ্যানের প্রবৃদ্ধিকে বাস্তব ব্যবসায়িক উন্নতি, টেকসই মুনাফা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে রূপ দেওয়া।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!