ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬

menu

বৈশ্বিক সরকারি ঋণ ১০০ শতাংশে পৌঁছানোর শঙ্কা: ব্যয় নিয়ন্ত্রণে তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ০৯:৪১ এএম

বৈশ্বিক সরকারি ঋণ ১০০ শতাংশে পৌঁছানোর শঙ্কা: ব্যয় নিয়ন্ত্রণে তাগিদ

ছবিঃ সংগৃহীত

বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমেই সরকারি ঋণের বাড়তি চাপের দিকে এগোচ্ছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৯ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট সরকারি ঋণ বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ঋণের বোঝা, সুদ পরিশোধের ব্যয় এবং বাজেট ঘাটতি বাড়তে থাকায় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির সতর্কবার্তা, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আর্থিক বাজারের চাপ সরকারগুলোকে আরও কঠিন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে।

থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা চলাকালে বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রকাশিত সংস্থাটির ফিসকাল মনিটর প্রতিবেদনে বৈশ্বিক সরকারি ঋণের এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বের সরকারি ঋণ বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৯৪ শতাংশে পৌঁছেছে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৯ সালের মধ্যে তা ১০০ শতাংশের সীমা অতিক্রম করতে পারে।

আইএমএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বড় অর্থনীতিগুলোর ক্রমবর্ধমান ঋণ, উচ্চ সুদহার, সরকারি ব্যয়ের চাপ এবং বিভিন্ন দেশের বাজেট ঘাটতি বৈশ্বিক আর্থিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সামাজিক সুরক্ষা, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা, কৌশলগত স্বনির্ভরতা ও অন্যান্য সরকারি খাতে ব্যয়ের চাহিদা বাড়লেও অনেক দেশের রাজস্ব আয় সেই তুলনায় বাড়ছে না। ফলে ঋণ পরিশোধের জন্য সরকারের বাজেটের বড় অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে।

ঋণের সুদ বাড়াচ্ছে বাজেটের চাপ

আইএমএফের রাজস্ববিষয়ক বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস বলেছেন, বৈশ্বিক আর্থিক ঝুঁকি বাড়লেও অনেক দেশে সেই অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। ঋণের উচ্চ মাত্রা, বাড়তি সুদহার এবং সরকারি ব্যয়ের চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

সরকারি ঋণ বাড়লে শুধু মূল অর্থ পরিশোধের দায়ই বাড়ে না, সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে সুদহার দীর্ঘ সময় উঁচু থাকলে নতুন ঋণ নেওয়া এবং পুরোনো ঋণ পুনঃঅর্থায়ন করা আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। এর ফলে সরকারকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় সংকোচনের চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।

ঋণের পরিমাণ ও সুদ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে গেলে সরকারের আর্থিক নমনীয়তাও কমে যায়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক মন্দা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে জরুরি সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়তে পারে।

এ কারণে আইএমএফ মনে করছে, যেসব দেশের ঋণ ও বাজেট ঘাটতি তুলনামূলক বেশি, তাদের আর্থিক বাজারে চাপ আরও বাড়ার আগেই বিশ্বাসযোগ্য ও পর্যায়ক্রমিক আর্থিক সমন্বয়ের পরিকল্পনা নিতে হবে।

সংঘাত ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে নতুন ঝুঁকি

বিশ্ব অর্থনীতিতে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে পারে। এর প্রভাব পরিবহন, উৎপাদন, বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে ছড়িয়ে পড়ে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে রাখতে বাধ্য হতে পারে। এতে সরকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে সরকারি ভর্তুকি ও মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় সহায়তা দিতে গিয়ে বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

আইএমএফের মতে, উচ্চ ঋণ, ব্যয়বহুল অর্থায়ন এবং অনিশ্চিত বৈশ্বিক পরিস্থিতি একসঙ্গে কাজ করলে ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তাই আর্থিক ঝুঁকি বেশি এমন দেশগুলোর জন্য আগেভাগে পরিকল্পনা গ্রহণ, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করা জরুরি।

দরিদ্র দেশগুলোর রাজস্বের বড় অংশ যাচ্ছে ঋণের সুদে

সরকারি ঋণের চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে নিম্ন আয়ের দেশগুলো। আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব দেশের ঋণ পরিশোধের ব্যয় এক দশক আগে রাজস্বের প্রায় ৬ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

এর অর্থ, এসব দেশের সরকারকে সংগৃহীত রাজস্বের উল্লেখযোগ্য অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে।

উন্নত অর্থনীতিগুলোতে সুদহার বেড়ে গেলে তার প্রভাব উদীয়মান ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতেও পড়ে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক বেশি মুনাফার আশায় উন্নত অর্থনীতির বাজারে অর্থ সরিয়ে নিলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিদেশি অর্থায়ন ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়ন সহায়তা কমে গেলে বাজেট ঘাটতি পূরণ এবং জরুরি উন্নয়ন কর্মসূচি চালু রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

এ পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য স্বল্পসুদে অর্থায়ন ও দুর্যোগকালীন ঋণ-স্বস্তির ব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটি দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রবৃদ্ধি সহায়তা ট্রাস্ট (পিআরজিটি) এবং দুর্যোগকালীন ঋণ-স্বস্তি তহবিল (সিসিআরটি)–এর জন্য সদস্য দেশগুলোর প্রতিশ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নিয়েও উদ্বিগ্ন আইএমএফ

বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমএফ। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার মতে, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে বিশাল ঋণের বোঝা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। এ জন্য রাজস্ব ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং বাজেট ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ প্রয়োজন।

ব্যাংককে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জর্জিয়েভা বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঋণের চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে প্রয়োজনীয় আর্থিক সমন্বয়ের বিকল্প হিসেবে প্রবৃদ্ধিকে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো বড় অর্থনীতিগুলোর আর্থিক ও অর্থনৈতিক নীতিও বৈশ্বিক ঋণ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বড় অর্থনীতিগুলোর ঋণ ও বাজেট ঘাটতি বাড়লে আন্তর্জাতিক বন্ডবাজারে সুদহার, বিনিয়োগের প্রবাহ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থায়ন ব্যয়ের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।

চীনের ক্ষেত্রে রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ভোগ ও চাহিদা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন জর্জিয়েভা। তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা শুধু ঋণসংকটে থাকা দেশগুলোর নীতির ওপর নির্ভর করে না; বড় অর্থনীতিগুলোর আর্থিক সিদ্ধান্তও আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে।

শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, প্রয়োজন আর্থিক শৃঙ্খলা

আইএমএফের রাজস্ববিষয়ক বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেসের মতে, বৈশ্বিক ঋণ পরিস্থিতি ছয় মাস আগের প্রত্যাশার তুলনায় খারাপ হয়েছে এবং এক বছর আগের তুলনায়ও অবনতি ঘটেছে। ঋণ ও বন্ডবাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আর্থিক সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।

সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর না করে সরকারের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে কোন খাতে সরকারি ব্যয় সবচেয়ে বেশি ফল দিচ্ছে, কোথায় অপচয় হচ্ছে এবং কোন কর্মসূচির কার্যকারিতা কম—এসব বিষয় পর্যালোচনা করে বরাদ্দের অগ্রাধিকার নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

তবে ব্যয় সংকোচনের নামে প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত করা হলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। তাই আইএমএফের আলোচনায় আর্থিক শৃঙ্খলার পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান এবং অর্থনৈতিক কার্যকারিতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

করব্যবস্থা সংস্কারে জোর, শুধু করের হার বাড়ানো নয়

ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি করব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ওপর জোর দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির অক্টোবর ২০২৬-এর ফিসকাল মনিটর প্রতিবেদনে করের নকশা ও বাস্তবায়ন উন্নত করার মাধ্যমে রাজস্ব আয় ধরে রাখা এবং একই সঙ্গে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক দক্ষতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও করপোরেট করব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানো, কর অব্যাহতির কার্যকারিতা পর্যালোচনা, উদ্ভাবনে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং কর প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আইএমএফের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, রাজস্ব বাড়ানোর অর্থ শুধু করের হার বাড়ানো নয়। বরং কর ফাঁকি ও অনিয়ম কমানো, করের আওতা সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতির যৌক্তিকতা যাচাই এবং কর সংগ্রহের প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন। কোন খাতে ব্যয় অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বেশি ফল দিচ্ছে, তা যাচাই করে বরাদ্দ নির্ধারণ করতে হবে। এতে একদিকে রাজস্বের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের কারণে ঋণ নেওয়ার প্রবণতাও কমানো যেতে পারে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে কঠিন অর্থনৈতিক সমীকরণ

উচ্চ সুদহার, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব দেশকে একদিকে ঋণ পরিশোধের দায় মেটাতে হচ্ছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির প্রভাব থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং উন্নয়ন কার্যক্রম চালু রাখার প্রয়োজন রয়েছে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রশাসক আলেক্সান্ডার ডে ক্রু বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যম আয়ের দেশগুলো উন্নত দেশগুলোর তুলনায় গড়ে তিন গুণ বেশি সুদ পরিশোধ করছে। তাঁর মতে, বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাস্তবায়নযোগ্য উন্নয়ন প্রকল্প তৈরিতে উন্নয়ন সহযোগীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

ঋণের ব্যয় বেড়ে গেলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং মানবসম্পদ তৈরির মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে অর্থায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এ কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি ঋণের শর্ত, সুদহার, পরিশোধের সময়সীমা এবং ঋণের অর্থ ব্যবহারের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করাও জরুরি।

বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে আইএমএফের সতর্কতা

বৈশ্বিক ঋণ পরিস্থিতির এই সতর্কবার্তা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, কর ফাঁকি ও রাজস্ব ফাঁকফোকর কমানো, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলে সরকারের নিজস্ব রাজস্বের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে এবং উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা এবং ভবিষ্যৎ বাজেটের ওপর সম্ভাব্য চাপ বিবেচনা করা প্রয়োজন। ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা হলে তা ভবিষ্যৎ আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। বিপরীতে, ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার না হলে ঋণ পরিশোধের দায় বাড়লেও প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে। এ ধরনের কর্মসূচিতে রাজস্ব আহরণ, ব্যাংক খাতের সংস্কার ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে। তবে বৈশ্বিক প্রতিবেদনের বক্তব্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো নির্দিষ্ট শর্ত বা সময়সীমা চূড়ান্ত হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

ঋণ নিয়ন্ত্রণে আগাম পদক্ষেপই গুরুত্বপূর্ণ

আইএমএফের সামগ্রিক সতর্কবার্তা হলো, ঋণ বাড়তে থাকলে একপর্যায়ে সরকারগুলোর আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কমে যেতে পারে। ঋণের সুদ পরিশোধে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হলে উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও জরুরি অর্থনৈতিক সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংকট তৈরি হতে পারে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর আর্থিক সমন্বয়ের নেতিবাচক প্রভাব যেন অতিরিক্ত না পড়ে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

বিশ্বের সরকারি ঋণ ২০২৯ সালের মধ্যে জিডিপির ১০০ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা তাই শুধু একটি পরিসংখ্যানগত পূর্বাভাস নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির সামনে থাকা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকিরও ইঙ্গিত। এখন থেকেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!