ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬

menu

আইএমএফের ঋণ পেতে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে: অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ০২:১৯ পিএম

আইএমএফের ঋণ পেতে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে: অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী

ছবিঃ সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নতুন ঋণ সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, নতুন কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। তবে ঋণ সহায়তার শর্ত, সংস্কার বাস্তবায়ন এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আরও আলোচনা ও সমঝোতা প্রয়োজন হবে।

 

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।

 

তিনি জানান, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণ রয়েছে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশেরও নিজস্ব মূল্যায়ন রয়েছে এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে মতৈক্য হয়েছে। যেসব বিষয় এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, সেগুলো নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আইএমএফের সঙ্গে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে ঋণ সহায়তা পেতে হলে সংস্থাটির নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ করতে হবে। কোন কোন শর্ত থাকবে এবং সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে আরও আলোচনা হবে।

 

তিনি বলেন, ঋণ কর্মসূচির ক্ষেত্রে কিছু শর্ত থাকা স্বাভাবিক। এসব শর্ত পূরণের পাশাপাশি যেসব বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে। উভয় পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

 

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগোলেও শর্ত নির্ধারণ ও সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো আলোচনার বিষয়। তবে বৈঠকের আলোচনার ভিত্তিতে ঋণের পরিমাণ, মেয়াদ কিংবা কিস্তি ছাড়ের সম্ভাব্য সময়সূচি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও পুনঃমূলধনীকরণে গুরুত্ব

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সংস্কার আইএমএফের সঙ্গে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

 

অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যাংকিং খাত নিয়ে আইএমএফের কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। এসব পর্যবেক্ষণের সঙ্গে বাংলাদেশও একমত। এরই মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে এবং বাকি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চলছে।

 

ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণও আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কোনো ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ত না থাকলে তার আর্থিক সক্ষমতা ও আমানতকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ অবস্থায় ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং সুশাসন নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

 

তবে কোন ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণ কীভাবে হবে কিংবা এ বিষয়ে আইএমএফের নির্দিষ্ট শর্ত কী, তা নিয়ে বৈঠক শেষে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো নিয়ে আলোচনা

আইএমএফের পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাতও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, এ বিষয়ে সংস্থাটির পর্যবেক্ষণের সঙ্গে বাংলাদেশেরও সম্মতি রয়েছে।

 

কর-জিডিপি অনুপাত বলতে একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় সরকারের কর রাজস্বের পরিমাণকে বোঝায়। এই অনুপাত কম হলে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো নির্মাণ এবং জনসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনায় নিজস্ব রাজস্বের ওপর নির্ভরতা সীমিত হয়ে পড়ে। তখন বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় ঋণনির্ভরতা বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।

 

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কর আদায়ের পরিধি বাড়ানো, কর ফাঁকি প্রতিরোধ, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা গেলে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা শক্তিশালী হতে পারে।

 

তবে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে কী ধরনের নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং এ বিষয়ে আইএমএফের সঙ্গে কী সমঝোতা হবে, তা আলোচনার পরবর্তী পর্যায়ে স্পষ্ট হতে পারে।

সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণ

সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আইএমএফের প্রশ্ন রয়েছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশেরও কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। ব্যাংকিং খাত ও কর-জিডিপি অনুপাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই পক্ষের পর্যবেক্ষণ রয়েছে এবং এসব বিষয়ে বাংলাদেশ একমত। এরই মধ্যে অনেক বিষয় পূরণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

 

অর্থমন্ত্রীর এ বক্তব্য অনুযায়ী, সংস্কার কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা চললেও সব বিষয়ে কাজ শেষ হয়নি। বাকি বিষয়গুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

 

আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিতে সাধারণত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং নীতিগত পদক্ষেপের মতো বিষয় গুরুত্ব পায়। তবে বাংলাদেশের নতুন কর্মসূচিতে ঠিক কী কী শর্ত থাকবে, তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো শর্তকে চূড়ান্ত বলে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট আইএমএফ

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে আইএমএফ সন্তোষ প্রকাশ করেছে। বাজেট-পরবর্তী অগ্রগতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসহ বৈশ্বিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সংস্থাটি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে বলে জানান তিনি।

 

বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ও পণ্যবাজারের ওঠানামা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তন বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

 

তবে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে আইএমএফের সন্তুষ্টির বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান বা মূল্যায়ন প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়নি।

বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ

অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু আইএমএফ নয়, বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গেও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করবে বাংলাদেশ। দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে এসব সংস্থার সঙ্গে আলোচনা ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

 

বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন ও নীতিগত সহায়তা অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক খাতের বিনিয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সংস্কারে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ ধরনের সহায়তার কার্যকারিতা নির্ভর করে অর্থের যথাযথ ব্যবহার, প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর।

নতুন কর্মসূচিতে নজর অর্থনীতিসংশ্লিষ্টদের

আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ ধরনের কর্মসূচির সঙ্গে রাজস্বনীতি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় যুক্ত থাকতে পারে।

 

তবে নতুন কর্মসূচির সম্ভাব্য ঋণের পরিমাণ, শর্ত, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে চূড়ান্ত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

 

এখন আলোচনার পরবর্তী ধাপে কোন কোন বিষয়ে সমঝোতা হয় এবং বাংলাদেশ কীভাবে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করে, সেদিকেই নজর থাকবে অর্থনীতিসংশ্লিষ্টদের। একই সঙ্গে এসব সংস্কার দেশের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় কতটা ভূমিকা রাখে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!