ঢাকা বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

menu

আইএমএফের ৪.৫ বিলিয়ন ও বিশ্বব্যাংকের ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে আলোচনা কতদূর?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম

আইএমএফের ৪.৫ বিলিয়ন ও বিশ্বব্যাংকের ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে আলোচনা কতদূর?

ছবিঃ সংগৃহীত

অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা, জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া, ব্যাংক খাত পুনর্গঠন এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে নতুন কর্মসূচির আওতায় ৪ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণসহায়তা চাইছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত সহায়তার বাইরে আগামী তিন বছরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছে সরকার।

তবে এই বিপুল অঙ্কের অর্থায়ন নিয়ে দুই আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চললেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ঋণের পরিমাণ, অর্থ ছাড়ের শর্ত, সুদহার, পরিশোধের মেয়াদ এবং অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্র নির্ধারণে আরও আলোচনা প্রয়োজন হবে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থায়নের আলোচনা কয়েক মাস চলতে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল এসব অর্থায়ন ও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে আলোচনা করছে। সরকারের লক্ষ্য, নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে বৈদেশিক অর্থের ওপর চাপ সামাল দেওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। তবে নতুন ঋণ দেশের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ঋণের শর্ত, অর্থের ব্যবহার এবং সংস্কার বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর।

বিশ্বব্যাংকের কাছে তিন বছরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব

বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত উন্নয়ন সহায়তার বাইরে আগামী তিন বছরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন চেয়েছে বাংলাদেশ। গত ১২ অক্টোবর ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এ প্রস্তাব তুলে ধরে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল।

বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, মূল্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং ভর্তুকিসংক্রান্ত ব্যয় মোকাবিলায় অতিরিক্ত অর্থায়নকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে সরকার।

প্রস্তাবিত অর্থায়ন পাওয়া গেলে তা অর্থনীতির ওপর বিদ্যমান চাপ মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। তবে ১০ বিলিয়ন ডলারের পুরো অর্থ কোন কোন খাতে ব্যয় হবে, কতটুকু ঋণ হিসেবে পাওয়া যাবে, অর্থ ছাড়ের সময়সূচি কী হবে এবং ঋণের আর্থিক শর্ত কেমন হবে—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত চূড়ান্ত হয়নি।

অর্থায়নের প্রস্তাবটি বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বৃহত্তর উন্নয়ন সহযোগিতার কাঠামোর সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে অর্থনীতির অগ্রাধিকার, উন্নয়ন পরিকল্পনা, সরকারি ব্যয়ের সক্ষমতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

কয়েক মাস চলতে পারে আলোচনা

গত ১৩ অক্টোবর ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, অতিরিক্ত অর্থায়নের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আলোচনা থেকে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে এবং প্রক্রিয়াটি আরও কয়েক মাস চলতে পারে। ঢাকাতেও এ বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি নানা সংকট ও আগের সময়ের আর্থিক দায়ের চাপে ছিল। এর সঙ্গে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা নতুন চাপ তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের এই বাস্তবতা অনুধাবন করছে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের নীতি ও কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে।

বাংলাদেশের মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়েও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। অংশীদারত্বের কাঠামো নির্ধারণে বাংলাদেশ লিখিত প্রস্তাব জমা দিয়েছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, অর্থায়নের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আলোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

অর্থাৎ, বিশ্বব্যাংকের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দেওয়া হলেও অর্থ ছাড়ের নিশ্চয়তা এখনো পাওয়া যায়নি। প্রস্তাবটি মূল্যায়ন, অর্থায়নের ধরন নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত অগ্রগতি স্পষ্ট হবে।

আইএমএফের কাছে নতুন ঋণ কর্মসূচির প্রস্তাব

বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি আইএমএফের কাছেও নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনা করছে বাংলাদেশ। সম্ভাব্য কর্মসূচির আওতায় ৪ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের কথা আলোচনায় রয়েছে। তবে আইএমএফ এখনো ঋণের নির্দিষ্ট পরিমাণ চূড়ান্তভাবে প্রকাশ করেনি।

২০২৩ সালে বাংলাদেশ আইএমএফের সঙ্গে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কর্মসূচির আকার বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়। আগের কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ প্রায় ৩ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

আগের কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তি ছাড় এবং সংস্কারের শর্ত নিয়ে আলোচনায় জটিলতা তৈরি হওয়ার পর নতুন সরকার নতুন ঋণ কর্মসূচির প্রস্তাব সামনে আনে। গত ৩ জুন আইএমএফ বাংলাদেশের নতুন অর্থায়নের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদনের বিষয়টি জানিয়েছিল। তবে সম্ভাব্য নতুন কর্মসূচির পরিমাণ, মেয়াদ ও শর্ত নিয়ে আলোচনা এখনো চলমান।

নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন নিশ্চিত করা, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।

আইএমএফের অর্থায়ন সাধারণত নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে। ফলে নতুন কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে কোন কোন শর্ত পূরণ করতে হবে, কীভাবে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে এবং কোন পর্যায়ে অর্থ ছাড় হবে—এসব বিষয় চূড়ান্ত আলোচনার ওপর নির্ভর করবে।

সংস্কারের শর্ত ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে চায় সরকার

আইএমএফের সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির শর্ত একসঙ্গে বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

সরকারের যুক্তি, দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কার কার্যক্রম নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শর্ত বাস্তবায়নের চাপ তৈরি হলে অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি প্রভাব পড়তে পারে। তাই পর্যায়ক্রমে সংস্কার কার্যকর করার সুযোগ থাকলে তা বাস্তবায়ন সহজ হতে পারে বলে মনে করছে সরকার।

বিশেষ করে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের সুশাসন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ভর্তুকির কার্যকারিতা বাড়ানোর মতো বিষয়গুলো অর্থনৈতিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি প্রশাসনিক সক্ষমতা, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।

তবে আইএমএফ সরকারের প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে কতটা সম্মত হবে, কোন সংস্কারগুলো বাধ্যতামূলক থাকবে এবং ঋণের কিস্তি ছাড়ের সঙ্গে কী ধরনের শর্ত যুক্ত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

এ কারণে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার ফলাফল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে বৈদেশিক অর্থায়ন প্রয়োজন, অন্যদিকে ঋণদাতা সংস্থার শর্ত ও দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের মধ্যে সমন্বয় করাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

ব্যাংক খাত পুনর্গঠন ও রাজস্ব আয় বাড়ানোর চাপ

বাংলাদেশের নতুন অর্থায়ন আলোচনায় ব্যাংক খাতের সংস্কার ও রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে শুধু নতুন ঋণ নেওয়াই যথেষ্ট নয়; আর্থিক খাতের দুর্বলতা কমানো, সরকারি আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য উন্নত করা এবং অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, আর্থিক অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি বাড়ানো অর্থনৈতিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। একইভাবে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, করজাল সম্প্রসারণ এবং কর আদায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।

সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, এসব সংস্কার বাস্তবায়নের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা এবং সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি না করা। ঋণের অর্থ যদি উৎপাদনশীল খাত, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে সুফল দিতে পারে। বিপরীতে, অর্থের ব্যবহার অনুৎপাদনশীল হলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের দায় বাড়লেও প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের অবস্থান নিয়ে কী জানা যাচ্ছে

বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কাজ করা বাংলাদেশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় ইতিবাচক দিক রয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি বলে তিনি মনে করেন।

ওই কর্মকর্তার ধারণা, আইএমএফ বাংলাদেশের প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে পারে। আইএমএফের সঙ্গে ঋণসহায়তার বিষয়ে সমঝোতা হলে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন প্রস্তাবের অগ্রগতিতেও সহায়ক পরিবেশ তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, সাধারণত আইএমএফ কোনো দেশের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিলে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তা প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এ বক্তব্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মূল্যায়ন; দুই সংস্থার অর্থায়ন অনুমোদনের প্রক্রিয়া আলাদা এবং প্রতিটি প্রস্তাব নিজস্ব শর্ত ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে দুই সংস্থার সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও ঋণ অনুমোদন, অর্থ ছাড় এবং শর্ত নির্ধারণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত প্রস্তাবিত অর্থায়নকে নিশ্চিত সহায়তা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

বৈশ্বিক ঋণচাপের মধ্যে বাংলাদেশের নতুন উদ্যোগ

উন্নয়নশীল দেশগুলো বর্তমানে ঋণের উচ্চ ব্যয় ও পরিশোধের বাড়তি চাপের মুখে রয়েছে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে জি-২৪-এর চেয়ারম্যান ও নাইজেরিয়ার অর্থমন্ত্রী তাইও ওয়েদেলে বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলো উন্নত দেশগুলোর তুলনায় ঋণসংক্রান্ত ব্যয়ে আনুমানিক ৫০০ বিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় করছে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু ঋণের মোট পরিমাণ নয়, ঋণের ব্যয়ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় সমস্যা। ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয় হলে নতুন উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিনিয়োগের সুযোগ কমে যায়।

এ পরিস্থিতিতে জি-২৪ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন বাড়াতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

বাংলাদেশের জন্যও এ বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ঋণ সাময়িকভাবে বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ কমাতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সুদ ও আসল পরিশোধের দায় তৈরি করে। তাই শুধু কত বিলিয়ন ডলার ঋণ পাওয়া যাবে, সেটিই বিবেচ্য নয়। ঋণের সুদহার, পরিশোধের সময়সীমা, অর্থ ছাড়ের শর্ত এবং অর্থের ব্যবহার কতটা উৎপাদনশীল হবে, সেসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন ঋণ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলতে পারে

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবিত অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা সফল হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়নের প্রয়োজন মেটানো, জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর উদ্যোগে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন ও উন্নয়ন কর্মসূচি চালু রাখার ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থায়ন ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে অর্থায়ন পাওয়ার পর তা কীভাবে ব্যবহৃত হবে, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঋণের অর্থ যদি জরুরি অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কাজে লাগে, তাহলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।

অন্যদিকে ঋণের অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত না হলে অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে। একই সঙ্গে নতুন ঋণের দায় যেন ভবিষ্যৎ বাজেট, উন্নয়ন ব্যয় এবং জনসেবামূলক খাতে অযাচিত চাপ তৈরি না করে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের মূল্যায়নে সাধারণত ঋণের শর্ত, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, রাজস্ব সক্ষমতা এবং অর্থ ব্যবহারের কার্যকারিতা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। তবে প্রস্তাবিত অর্থায়নের চূড়ান্ত শর্ত ও ব্যবহার নির্ধারিত না হওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রকৃত প্রভাব এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বাংলাদেশ

আইএমএফের কাছে সম্ভাব্য ৪ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি এবং বিশ্বব্যাংকের কাছে আগামী তিন বছরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রস্তাব—দুটিই বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। জ্বালানি ব্যয়, বৈশ্বিক অস্থিরতা, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন থেকেই এ আলোচনা এগোচ্ছে।

তবে এখনো কোনো অর্থায়ন চূড়ান্ত হয়নি। আইএমএফের সঙ্গে নতুন কর্মসূচির শর্ত ও সংস্কার নিয়ে আলোচনা এবং বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থায়নের প্রস্তাব মূল্যায়নের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

সামনের মাসগুলোতে দুই সংস্থার সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতি, ঋণের শর্ত এবং সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। শেষ পর্যন্ত অর্থায়ন পাওয়া গেলে তা কতটা সুফল বয়ে আনবে, তা নির্ভর করবে ঋণের শর্ত কতটা সহনীয়, অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে সংস্কার কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে—তার ওপর।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!