বাংলাদেশে দলবদ্ধ সহিংসতা বা ‘মব ভায়োলেন্সের’ ঘটনা থামানো যাচ্ছে না। কখনো ধর্ম অবমাননার অভিযোগ, কখনো জমি ও সম্পত্তি দখল, আবার কখনো ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে মানুষকে দলবদ্ধভাবে মারধর, হত্যা ও প্রতিষ্ঠান ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি জননিরাপত্তা, আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সর্বশেষ সাতক্ষীরায় ফেসবুকে লাইভ সম্প্রচারের মধ্যে দফায় দফায় মারধরের ঘটনায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের মৃত্যুর ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। এর আগে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও আলোচনায় আসে। ওই ঘটনায় বিএনপি থেকে নির্বাচিত সাবেক নারী সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম সামনে আসে।
ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয় ও আদালতসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঘিরেও অতীতে দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা ও হামলার ঘটনা সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় কখনো রাজনৈতিক পরিচয়, কখনো ধর্মীয় অনুভূতি, আবার কখনো ব্যক্তিগত বা সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ানোর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং সরকারের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানবাধিকারকর্মীদের একাংশ মনে করছেন, মব সহিংসতা এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; কিছু ঘটনায় এর সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বও জড়িয়ে পড়ছে।
১০ মাসে ৫৩৭টি ঘটনায় নিহত ২৫৬, আহত ৫৭৫
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ৫৩৭টি মবের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২৫৬ জন নিহত এবং ৫৭৫ জন আহত হয়েছেন।
সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মবের ঘটনা ছিল ৪২৮টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৬৯টি। পরিসংখ্যানগুলোতে মব সহিংসতার ব্যাপকতা এবং জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে।
অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মব সহিংসতায় ১৭১ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১২৮ এবং ২০২৫ সালে ছিল ১৯৮ জন।
তবে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি, ঘটনার সংজ্ঞা ও সময়সীমা এক নয়। ফলে তাদের দেওয়া পরিসংখ্যান সরাসরি তুলনা করার আগে তথ্যের ভিত্তি ও গণনার পদ্ধতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
তবু বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—দলবদ্ধ সহিংসতা ও বিচারবহির্ভূত শাস্তির অভিযোগ বাংলাদেশের জননিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে।
মব সহিংসতায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে মবের কিছু ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে সব ঘটনা একই ধরনের নয় এবং প্রতিটি ঘটনায় রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, সম্পত্তি দখলকেন্দ্রিক মবের ঘটনায় ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতা দেখা যায়। অন্যদিকে ধর্মকে কেন্দ্র করে সংঘটিত কিছু ঘটনায় প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি তাঁদের মনিটরিং প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সম্পত্তি দখল ও ধর্মীয় অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত মবের ঘটনাগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঘটনা ধরে তদন্ত, তথ্য-প্রমাণ যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তা প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
‘সব দলের লোকজনের সংশ্লিষ্টতা দেখা যায়’
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশে বা দলীয় সিদ্ধান্তে মবের ঘটনা ঘটেছে—এমন তথ্য তাঁদের সংগঠনের কাছে নেই। তবে বিভিন্ন ঘটনায় কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের কমবেশি সংশ্লিষ্টতা দেখা গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, মব সহিংসতাকে কোনো একটি দল বা গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ বিভিন্ন ঘটনায় সামনে এসেছে।
এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, মব সহিংসতা মোকাবিলায় শুধু একটি রাজনৈতিক দলকে দায়ী করা নয়, বরং প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ, দলটির অস্বীকার
ধর্মীয় অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত কিছু মবের ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান। তাঁর দাবি, সংগঠনটির মনিটরিং প্রতিবেদনে এসব বিষয়ে তথ্য উঠে এসেছে।
তবে জামায়াতে ইসলামী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ বিবিসি বাংলাকে বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরকারের। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও কীভাবে মবের ঘটনা ঘটছে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
মতিউর রহমান আকন্দের দাবি, বিভিন্ন ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করার প্রবণতা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দলটি মবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিবৃতি দিয়েছে এবং তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সঠিক নয়।
ফলে এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠনের অভিযোগ ও জামায়াতের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ।
মবের ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মব সহিংসতা বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে। তবে মানবাধিকারকর্মীদের প্রশ্ন, ঘোষণার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের পদক্ষেপের কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে।
সাইদুর রহমানের মতে, মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে অনীহা, পুলিশের কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি এবং স্থানীয় প্রশাসনের পর্যাপ্ত সক্রিয়তার অভাব।
অন্যদিকে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক নেতৃত্ব মবের ঘটনা সমর্থন না করার কথা বললেও স্থানীয় পর্যায়ে নিজ নিজ দলের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে হয়।
তাঁদের বক্তব্যে মূলত তিনটি বিষয় সামনে এসেছে—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত হস্তক্ষেপ, স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব কর্মী-সমর্থকদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
সরকার বলছে, মবের ঘটনা ৪০ শতাংশ কমেছে
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যানের সঙ্গে একমত নন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর দাবি, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর তুলনামূলক হিসাবে মবের ঘটনা কমেছে।
বিবিসি বাংলাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের নথিভুক্ত অপরাধের তুলনামূলক পরিসংখ্যানে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের তথ্য বিশ্লেষণে মবের ঘটনা ৪০ শতাংশ কমেছে বলে দেখা গেছে।
তিনি আরও বলেন, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও আরও অগ্রগতি প্রয়োজন।
মবের ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নিয়েও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক অবস্থান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, অভিযোগ থাকতে পারে; তবে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারণ করতে হবে কোনো ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কতটা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, সরকারের তদন্তে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার ঘটনা খুব কম পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জমিজমা বা অন্যান্য বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে।
তবে সরকারের পরিসংখ্যান ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকায় মবের প্রকৃত প্রবণতা বুঝতে ঘটনার সংজ্ঞা, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি এবং সময়সীমা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি মব বাড়াচ্ছে কি না
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, মব সহিংসতা মোকাবিলার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা এবং নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা।
কোনো অভিযোগ উঠলেই কাউকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার জনতার নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধ নির্ধারণ—এসবই আইনের শাসনের মৌলিক অংশ।
কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অপরাধী আখ্যা দিয়ে দলবদ্ধভাবে মারধর, হত্যা কিংবা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করা হলে তা বিচারব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে শাস্তি কার্যকরের শামিল। এতে নিরপরাধ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত অপরাধীর বিচারও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সাইদুর রহমানের মতে, মবের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যাঁরা হামলার শিকার, তাঁদের বিরুদ্ধেই উল্টো মামলা দেওয়ার প্রবণতা থাকলে তা বন্ধ করা প্রয়োজন।
অর্থাৎ মব সহিংসতা বন্ধে শুধু কঠোর বক্তব্য যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি।
রাজনৈতিক দলগুলোর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় সরকার ও বিরোধী দলের নেতাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগও দেখা গেছে। কোনো কোনো নেতা মবের জন্য প্রতিপক্ষকে দায়ী করেছেন, আবার কেউ কেউ সরকারকে সহিংসতা বন্ধে ব্যর্থ বলে সমালোচনা করেছেন।
তবে মানবাধিকারকর্মীদের বক্তব্য থেকে যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো—কোনো রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের দায় থেকে কাউকে অব্যাহতি দিতে পারে না। একইভাবে প্রমাণ ছাড়া কোনো দল বা ব্যক্তিকে দায়ী করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
কোনো দলের কর্মী-সমর্থকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট দল কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, পুলিশ কত দ্রুত তদন্ত করছে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে বিচার হচ্ছে কি না—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
মবের ঘটনায় রাজনৈতিক প্রভাব থাকুক বা না থাকুক, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে রাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোরও প্রকাশ্যে সহিংসতার নিন্দা জানানো, কর্মী-সমর্থকদের সংযত রাখা এবং তদন্তে সহযোগিতা করা প্রয়োজন।
মব সহিংসতা বন্ধে করণীয়
বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীদের বক্তব্যের আলোকে মব সহিংসতা মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতে পারে—
দ্রুত পুলিশি হস্তক্ষেপ: দলবদ্ধ হামলার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি ঠেকাতে হবে।
নিরপেক্ষ তদন্ত: রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে প্রত্যেক ঘটনায় তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করতে হবে।
অপরাধীদের বিচার: হামলা, হত্যা, ভাঙচুর ও উসকানির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা: হামলার শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারকে নিরাপত্তা, চিকিৎসা এবং আইনি সহায়তা দিতে হবে।
রাজনৈতিক জবাবদিহি: দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ সহিংসতায় জড়ালে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলকে তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
গুজব ও উসকানি প্রতিরোধ: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অযাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে যাতে জনতা আইন হাতে তুলে না নেয়, সে বিষয়ে দ্রুত তথ্য যাচাই ও জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয়তা: উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আগেই স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
কঠোর বক্তব্য নয়, কার্যকর পদক্ষেপই জরুরি
বাংলাদেশে মব সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগের মূল কারণ শুধু প্রাণহানি বা ভাঙচুরের ঘটনা নয়; বরং কোনো অভিযোগের বিচার করার নামে জনতার হাতে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা। এটি অব্যাহত থাকলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং আইনের শাসন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান, সরকারের বক্তব্য এবং বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, মব সহিংসতার প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
মবের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের ঘোষণা তখনই কার্যকর বলে বিবেচিত হবে, যখন হামলা প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।
শেষ পর্যন্ত মব সহিংসতা বন্ধের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; রাজনৈতিক দল, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সমাজেরও ভূমিকা রয়েছে। তবে আইন প্রয়োগ ও নাগরিকের জীবন-সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের। অভিযোগের বিচার হবে আদালতে—জনতার হাতে নয়।

