দেশে ইটভাটার সংখ্যা সাড়ে সাত হাজারের বেশি। অথচ এর মধ্যে পরিবেশগত ছাড়পত্র বা নবায়ন রয়েছে মাত্র ১ হাজার ৬৭৫টির। বাকি ৫ হাজার ৮৫৫টি ইটভাটার পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই অথবা ছাড়পত্র নবায়ন করা হয়নি। অর্থাৎ দেশের মোট ইটভাটার প্রায় ৭৮ শতাংশই প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ছাড়পত্র বা নবায়ন ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক জিগজ্যাগ প্রযুক্তির ইটভাটাগুলোতেও। এ ধরনের ৬ হাজার ৪০৬টি ভাটার মধ্যে ৪ হাজার ৭৮১টিরই পরিবেশগত ছাড়পত্র বা নবায়ন নেই।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই বিপুলসংখ্যক ইটভাটায় উৎপাদন চলছে। এসব ভাটার অনেকগুলো জনবসতিপূর্ণ এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমির কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে বায়ুদূষণ, কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাস, ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তৈরি ‘পরিবেশগত মান উন্নয়নে পোড়ানো ইট ও ব্লকের ব্যবহারবিষয়ক কর্মকৌশল’ শীর্ষক একটি নীতিপত্রেও ইটভাটার দূষণ, কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি অপসারণ, কয়লার ব্যবহার এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। নয় পৃষ্ঠার ওই নথিতে ইটভাটার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পোড়ানো ইটের বিকল্প হিসেবে কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে কয়েক বছরের কর্মপরিকল্পনার প্রস্তাব রয়েছে।
ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে অধিকাংশ ইটভাটা
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে পাঁচ ধরনের প্রযুক্তিতে ইট উৎপাদন করা হচ্ছে। এর মধ্যে জিগজ্যাগ ভাটা ৬ হাজার ৪০৬টি, হাইব্রিড হফম্যান ভাটা ৫৪টি, অটোমেটিক বা টানেল কিলন ৩২টি, ফিক্সড ৮০ থেকে ১২০ ফুট চিমনির ভাটা ৭৮৮টি এবং ড্রাম চিমনির ভাটা ২৫০টি। সব মিলিয়ে ইটভাটার সংখ্যা ৭ হাজার ৫৩০টি।
এসব ভাটার মধ্যে পরিবেশগত ছাড়পত্র বা নবায়ন রয়েছে মাত্র ১ হাজার ৬৭৫টির। বাকি ৫ হাজার ৮৫৫টির ক্ষেত্রে ছাড়পত্র নেই অথবা নবায়ন করা হয়নি। প্রযুক্তিভেদে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ছাড়পত্রহীন ভাটা জিগজ্যাগ পদ্ধতির।
দেশে থাকা ৬ হাজার ৪০৬টি জিগজ্যাগ ভাটার মধ্যে ছাড়পত্র বা নবায়ন রয়েছে মাত্র ১ হাজার ৬২৫টির। বাকি ৪ হাজার ৭৮১টির পরিবেশগত ছাড়পত্র বা নবায়ন নেই। সে হিসাবে এই প্রযুক্তির প্রায় ৭৫ শতাংশ ভাটা প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র বা নবায়ন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে।
এ ছাড়া ৫৪টি হাইব্রিড হফম্যান ভাটার মধ্যে ২৪টি এবং ৩২টি অটোমেটিক বা টানেল কিলনের মধ্যে ১২টির পরিবেশগত ছাড়পত্র বা নবায়ন নেই। অন্যদিকে, ৭৮৮টি ফিক্সড চিমনি এবং ২৫০টি ড্রাম চিমনির ভাটার কোনোটিরই পরিবেশগত ছাড়পত্র বা নবায়ন নেই বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে, শুধু প্রচলিত প্রযুক্তির ভাটা নয়, তুলনামূলক আধুনিক প্রযুক্তিতে পরিচালিত কিছু ভাটার ক্ষেত্রেও পরিবেশগত অনুমোদন নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণ ও নবায়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি এবং আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছেই ছয়টি ইটভাটা
রাজধানীর কাছের দোহার ও নবাবগঞ্জ এলাকায় সরেজমিন পর্যবেক্ষণে জনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি ইটভাটা থাকার চিত্র উঠে এসেছে। নবাবগঞ্জের কলাকোপা ইউনিয়নের বড় জাফরপুর গ্রামে অবস্থিত মাদরাসায় জালালুদ্দীন রুমীর আশপাশে কয়েকশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৫০০ থেকে ৮০০ মিটারের মধ্যে রয়েছে অন্তত ছয়টি ইটভাটা।
ভাটাগুলো হলো—জনতা ব্রিকস, ন্যাশনাল ব্রিকস (এনবিআই), মেসার্স বাংলাদেশ ব্রিকস (বিবিসি), দোহার নবাবগঞ্জ ব্রিকস (এনডিবি), গোল্ড ব্রিকস এবং জয়পাড়া ব্রিকস (জেবিপি)। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে এসব ভাটার পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকার তথ্য উঠে এসেছে।
ভাটাগুলোর ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জনতা ব্রিকসের ব্যবস্থাপক মো. রফিক পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি ছাড়পত্র সংগ্রহের চেষ্টা করছেন বলে দাবি করেন। একইভাবে মেসার্স বাংলাদেশ ব্রিকসের ব্যবস্থাপক মো. সাদেকুর রহমানও অনুমোদন না থাকার কথা স্বীকার করে তা নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানান। তবে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তাঁরা ছাড়পত্রের কোনো নথি দেখাতে পারেননি।
জনবসতিপূর্ণ এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি ইটভাটা থাকলে সেখান থেকে নির্গত ধোঁয়া, ধূলিকণা ও ছাই শিশু-কিশোরসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে বাতাসে ধূলিকণা বেড়ে গেলে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা এবং চোখ ও গলায় অস্বস্তির আশঙ্কা বাড়ে। তবে নির্দিষ্ট এলাকায় কী মাত্রায় দূষণ হচ্ছে, তা নিশ্চিত করতে বায়ুর মান পরিমাপ এবং স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব ভাটার আশপাশে কৃষিজমিও রয়েছে। ফলে ইট উৎপাদনের জন্য মাটি সংগ্রহ এবং ভাটার ধোঁয়া ও ছাই থেকে কৃষিজমির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইন আছে, তবু নিষিদ্ধ এলাকার কাছেই ভাটা
ইটভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে আইনগতভাবে নির্দিষ্ট দূরত্ব ও অবস্থানসংক্রান্ত বিধিনিষেধ রয়েছে। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩-এর সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, নিষিদ্ধ এলাকার সীমারেখা থেকে নির্ধারিত দূরত্ব বজায় রেখে ইটভাটা স্থাপনের বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে ২০১৯ সালের সংশোধিত আইনের ধারা ৮(৩) অনুযায়ী অন্তত এক কিলোমিটার দূরত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের নথিতে নিষিদ্ধ এলাকার এক কিলোমিটারের মধ্যে থাকা বিপুলসংখ্যক ইটভাটার তথ্য উঠে এসেছে। নথিতে বিভিন্ন দূরত্বের শ্রেণিতে ভাটার সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫০০ মিটারের মধ্যে ১ হাজার ৪২৮টি ইটভাটা থাকার তথ্য রয়েছে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে ২২৭টি, চট্টগ্রামে ৪৯০টি, রাজশাহীতে ২৪৬টি, রংপুরে ১৯৩টি, খুলনায় ১৬৬টি, ময়মনসিংহে ৫৩টি, সিলেটে ২৭টি এবং বরিশালে ২৬টি ভাটার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া নথিতে ৫০১ থেকে ৬০০ মিটার, ৬০১ থেকে ৭০০ মিটার, ৭০১ থেকে ৮০০ মিটার এবং ৮০১ থেকে ১ হাজার মিটারের মধ্যে থাকা ভাটার হিসাবও রয়েছে। তবে সরবরাহ করা তথ্যের কয়েকটি দূরত্বভিত্তিক শ্রেণির সংখ্যা ও বর্ণনায় অসংগতি রয়েছে। ফলে এসব শ্রেণির পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা যাচাইয়ের জন্য মূল নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, অতিরিক্ত ১ হাজার ৪৫৮টি ইটভাটার তথ্য সংগ্রহের কাজ চলমান রয়েছে। এসব তথ্য চূড়ান্ত হলে নিষিদ্ধ এলাকার কাছাকাছি ইটভাটার প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, শুধু ভাটার সংখ্যা গণনা নয়—কোন ভাটা কোথায় অবস্থিত, সংশ্লিষ্ট এলাকায় জনবসতি ও কৃষিজমির অবস্থান কী এবং ভাটার দূষণ কতটা ছড়াচ্ছে, সেসব তথ্য সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নিয়মিত অভিযান ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ইট তৈরিতে বছরে ১৫ কোটি টন মাটি ব্যবহারের তথ্য
ইটভাটার পরিবেশগত ক্ষতির অন্যতম বড় দিক হলো কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি অপসারণ। নীতিপত্রে বলা হয়েছে, দেশে ইট তৈরিতে বছরে প্রায় ১৫ কোটি টন মাটি ব্যবহৃত হচ্ছে। কাঁচা ইট তৈরির জন্য জমির উপরিভাগের প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়। এই স্তরেই সাধারণত জৈব পদার্থ ও উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান তুলনামূলক বেশি থাকে।
কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি অপসারণের ফলে জমির গঠন, পানি ধারণক্ষমতা এবং উর্বরতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে ফসলের উৎপাদনশীলতার ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নীতিপত্রে এ ধরনের ক্ষতির ফলে ফসলের ফলন ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ইটভাটার ধোঁয়া, ছাই ও ধূলিকণার মাধ্যমে বিভিন্ন দূষক মাটি ও আশপাশের পরিবেশে জমা হতে পারে। নথিতে লেড, ক্যাডমিয়াম ও আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতুর সম্ভাব্য উপস্থিতির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এসব উপাদান নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি জমা হলে মাটির গুণাগুণ, ফসলের নিরাপত্তা এবং খাদ্যশৃঙ্খলের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে নীতিপত্রে বলা হয়েছে, ইটভাটার এক কিলোমিটারের মধ্যে ধানের ফলন ২০ থেকে ২৫ শতাংশ, গমের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ, সরিষার ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ এবং সবজির ফলন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
তবে এসব ফলনহ্রাসের হার সব এলাকার জন্য একইভাবে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া যায় না। মাটির ধরন, ফসলের জাত, ভাটার প্রযুক্তি, দূষণের মাত্রা, বাতাসের প্রবাহ এবং কৃষি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নির্দিষ্ট এলাকার ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণে মাঠপর্যায়ের গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক পরিমাপ গুরুত্বপূর্ণ।
বছরে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টন কয়লা পোড়ানোর তথ্য
ইট উৎপাদনে জ্বালানি হিসেবে বিপুল পরিমাণ কয়লা ব্যবহৃত হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নীতিপত্রে বছরে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ মেট্রিক টন কয়লা ব্যবহারের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। কয়লার গুণগত মান এবং এতে থাকা সালফারের পরিমাণ ইটভাটার দূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নথি অনুযায়ী, আমদানি নীতিতে কয়লায় সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ সালফারের উল্লেখ রয়েছে। এদিকে ঢাকার পাঁচটি ইটভাটা—শাপলা ব্রিকস, এমআইএন, কেবিসি, এমবিবি ও এআইএম—থেকে কয়লার নমুনা সংগ্রহ করে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে (বিসিএসআইআর) পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় নমুনাগুলোতে সালফারের পরিমাণ শূন্য দশমিক ৯৩ থেকে ১ দশমিক ১৩ শতাংশ পাওয়া গেছে।
তবে মাত্র পাঁচটি ভাটার নমুনার ফলাফল দিয়ে দেশের সব ইটভাটায় ব্যবহৃত কয়লার গুণগত মান সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এ জন্য বিভিন্ন অঞ্চল ও ভাটা থেকে প্রতিনিধিত্বমূলক নমুনা সংগ্রহ করে নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে নীতিপত্রে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
নীতিপত্রে আরও বলা হয়েছে, ইটভাটায় ফ্লু গ্যাস ডি-সালফারাইজেশন (এফজিডি) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় না। এ প্রযুক্তি শিল্পকারখানার নির্গত গ্যাস থেকে সালফারজাত দূষক কমাতে সহায়তা করে। নথিতে কয়লায় সালফারের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ১ শতাংশ নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনার প্রস্তাবও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানির মান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভাটার প্রযুক্তি, চিমনির ধরন, দহনপ্রক্রিয়া এবং নির্গমন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা জরুরি। শুধু জ্বালানিতে সালফারের মাত্রা নির্ধারণ করলেই সামগ্রিক বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না।
পাঁচ বছরে ১ হাজার ৬৭৮টি ইটভাটা ভাঙার তথ্য
অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান ও জরিমানার তথ্যও নীতিপত্রে উঠে এসেছে। অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে ২ হাজার ২০৮টি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করা হয়।
এসব অভিযানে ৪ হাজার ৯৮১টি মামলায় মোট ১১৬ কোটি ৮ লাখ ৭২ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়। এর মধ্যে আদায় হয়েছে ১০৮ কোটি ৪৪ লাখ ৭ হাজার ৫০০ টাকা।
একই সময়ে ১ হাজার ৬৭৮টি ইটভাটা ভেঙে দেওয়া, ১৫ লাখ ইট এবং ২৪০ টন কয়লা জব্দ করার তথ্য জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও ১৭৩টি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময়ে ৩৮৪টি মামলায় ৯ কোটি ৫৫ লাখ ৬১ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য ও আদায়ের তথ্য দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১২৩টি ভাটার চিমনি ভেঙে দেওয়া এবং ৫৬টি অবৈধ ইটভাটার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অভিযান, জরিমানা ও ভাটা ভাঙার তথ্যের পাশাপাশি দেশে পরিবেশগত ছাড়পত্রবিহীন ভাটার সংখ্যা এখনও বেশি থাকার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। জরিমানা আদায় বা চিমনি ভাঙার পর সংশ্লিষ্ট ভাটা আবার চালু হচ্ছে কি না, বন্ধের নির্দেশ কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং পুনরায় আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতির অগ্রগতি মূল্যায়ন সহজ হবে।
পোড়ানো ইটের বিকল্প কংক্রিট ব্লক
ইটভাটার দূষণ ও কৃষিজমির মাটি রক্ষায় পোড়ানো ইটের বিকল্প হিসেবে কংক্রিট ব্লক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের নীতিপত্রে। বর্তমানে দেশে ১৬০টি ব্লক কারখানা রয়েছে এবং সেগুলোতে প্রায় ২১ কোটি ব্লক উৎপাদিত হচ্ছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কংক্রিট ব্লক উৎপাদনে পোড়ানোর প্রয়োজন না থাকায় প্রচলিত পোড়ানো ইটের তুলনায় কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানির ব্যবহার কমানোর সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ব্লক তৈরিতে নদীর ড্রেজিং থেকে পাওয়া উপযুক্ত মাটি ও বালু, পুরোনো ভবনের ভাঙা কংক্রিট, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ইট এবং নির্দিষ্ট ধরনের বর্জ্য ব্যবহারের সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এসব উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্মাণমান, দূষণ ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মানদণ্ড নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সরকারি নির্মাণকাজে পোড়ানো ইটের পরিবর্তে ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছিল। নীতিপত্রে উল্লেখ রয়েছে, ২০২২ সালের জুনের মধ্যে ৩০ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে ১০০ শতাংশ ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
তবে বাস্তব অগ্রগতিতে এখনও ঘাটতি রয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, ১০ ইঞ্চি দেয়ালে ব্লকের ব্যবহার ৮১ শতাংশ, ৫ ইঞ্চি দেয়ালে ৬৭ শতাংশ এবং রাস্তার কাজে ৬০ শতাংশ। সব মিলিয়ে গড় অগ্রগতি ৬৯ শতাংশ বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যান্য সরকারি দপ্তরের অগ্রগতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য নথিতে পাওয়া যায়নি।
ফলে সরকারি নির্মাণকাজে ব্লক ব্যবহারের নীতি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, কোন কোন দপ্তর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে এবং কোথায় ঘাটতি রয়েছে—তা নির্ধারণে সমন্বিত অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্লকের উৎপাদনক্ষমতা, দাম, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারজাতকরণ সহজ করা গেলে বিকল্প নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
হাইকোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
অবৈধ ইটভাটা বন্ধে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ১৩ নভেম্বর দেশের সব জেলার অবৈধ ইটভাটা বন্ধ এবং ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে কাঠের ব্যবহার বন্ধে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।
রিট আবেদনকারী মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে বিভিন্ন সময়ে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সব অবৈধ ভাটা বন্ধের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি।
কালবেলাকে তিনি বলেন, ২০২২ সালে দেশের অবৈধ ইটভাটা বন্ধের বিষয়ে জনস্বার্থে রিট দায়েরের পর আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। ইটভাটার মৌসুম শুরু হলে বিভিন্ন জেলার পরিস্থিতি নিয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছে এবং নির্দেশনা পালন না হলে আদালত অবমাননার অভিযোগও আনা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ভাটা ভাঙার অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হচ্ছিল বলে তিনি জানান।
মনজিল মোরসেদ আরও বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেওয়ায় ওই সময়ে বিষয়টি নিয়ে আদালতে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর আবার কার্যক্রম ও শুনানি শুরু হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অবৈধ ইটভাটা নিয়ে আদালতের নতুন আদেশ এসেছে। পাশাপাশি সারা দেশের যেসব ইটভাটার লাইসেন্স বা পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই, সেগুলো বন্ধ ও ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আদালত খোলার পর এসব আবেদনের শুনানি শেষে নতুন নির্দেশনা আসতে পারে। আগে কতগুলো ভাটা ভাঙা হয়েছে, সে বিষয়ে বকেয়া প্রতিবেদনও আদালতে দাখিলের প্রয়োজন রয়েছে।
আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়নে পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের হালনাগাদ তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। কোন ভাটার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, কোনগুলো বন্ধ রয়েছে এবং কোথায় পুনরায় উৎপাদন শুরু হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে আইন প্রয়োগের স্বচ্ছতা বাড়তে পারে।
শুষ্ক মৌসুমে অবৈধ ভাটার বিরুদ্ধে অভিযান জোরদারের ঘোষণা
সামনে শুষ্ক মৌসুমকে সামনে রেখে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান জোরদারের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট শাখার পরিচালক মো. মাহবুব জামিল।
কালবেলাকে তিনি বলেন, শুষ্ক মৌসুমে ইটভাটাগুলো মূলত বেশি সক্রিয় থাকে। এ কারণে অবৈধ ইটভাটার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং জেলা কার্যালয়গুলোতে এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশেষ করে কাঠ পোড়ানো, ড্রাম চিমনি ও ফিক্সড চিমনি ব্যবহারকারী ভাটাগুলোকে এবার চলতে দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং শিগগিরই দেশজুড়ে জোরদার অভিযান শুরু হবে বলে তিনি জানান।
শুধু অভিযান নয়, নিয়মিত নজরদারিও জরুরি
দেশে পরিবেশগত ছাড়পত্র বা নবায়নবিহীন ইটভাটার বিপুল সংখ্যা পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়। একদিকে ইট উৎপাদনের সঙ্গে নির্মাণ খাতের চাহিদা জড়িত, অন্যদিকে অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত ভাটার কারণে কৃষিজমি, বায়ুর মান এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিবেশগত ছাড়পত্র নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভাটার অবস্থান, প্রযুক্তি, জ্বালানির মান ও নির্গমন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ এলাকায় ভাটা স্থাপন বন্ধ, কৃষিজমির উর্বর মাটি রক্ষা, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রকাশ জরুরি।
পাশাপাশি সরকারি নির্মাণকাজে কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন, ব্লক উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং নির্মাণসামগ্রীর মান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া শুধু মৌসুমি অভিযান দিয়ে অবৈধ ইটভাটার বিস্তার ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে কঠিন হতে পারে।
সব মিলিয়ে, দেশের ইটভাটা খাতে পরিবেশগত অনুমোদন নিশ্চিত করা, আইন মেনে উৎপাদন পরিচালনা এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানো এখন গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ। কৃষিজমির উর্বরতা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ঘোষিত পদক্ষেপ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই পরিস্থিতির উন্নতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।

