ঢাকা রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

menu

কলকাতার দুর্গাপূজামণ্ডপে পদদলনে ১৮ জনের মৃত্যু, আহত অন্তত ৩৫

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ১০:২৫ এএম

কলকাতার দুর্গাপূজামণ্ডপে পদদলনে ১৮ জনের মৃত্যু, আহত অন্তত ৩৫

ছবিঃ সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ মুহূর্তেই রূপ নিয়েছে শোক ও বেদনায়। উত্তর কলকাতার একটি জনপ্রিয় দুর্গাপূজামণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড়, বৃষ্টি ও সংকীর্ণ যাতায়াতপথের কারণে সৃষ্ট পদদলনের ঘটনায় অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন নারী ও একটি শিশু রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার গিরিশ পার্ক থানা এলাকার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপূজামণ্ডপে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। পূজামণ্ডপটি সারদা পার্ক নামেও পরিচিত। দুর্ঘটনার পরপরই পুলিশ, দমকল বাহিনী, দুর্যোগ মোকাবিলা দল ও জরুরি চিকিৎসাসেবার কর্মীরা উদ্ধারকাজে অংশ নেন। আহতদের উদ্ধার করে কলকাতার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর প্রায় ৩৫ জন আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তবে হতাহতের সংখ্যা, আহতদের শারীরিক অবস্থা এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

বৃষ্টির মধ্যে অতিরিক্ত ভিড়, প্রস্থানপথে পদদলন

কলকাতা পুলিশের দেওয়া আনুষ্ঠানিক বিবরণ অনুযায়ী, শনিবার সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা ৪০ মিনিটে বৃষ্টির মধ্যে পূজামণ্ডপে দর্শনার্থীদের প্রচণ্ড ভিড় জমে। এ সময় মণ্ডপের প্রস্থান গেটের কাছে মানুষের চাপ বেড়ে গেলে পদদলনের ঘটনা ঘটে।

শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে কলকাতার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর সমাগম হয়। জনপ্রিয় মণ্ডপগুলোতে প্রতিমা দর্শনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বৃষ্টি, সংকীর্ণ প্রবেশ ও প্রস্থানপথ এবং একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

প্রাথমিক বিবরণে অতিরিক্ত জনসমাগম ও প্রস্থানপথে মানুষের চাপকে দুর্ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, দর্শনার্থীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না এবং জরুরি নির্গমনপথ কার্যকর ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

উদ্ধারকাজে পুলিশ, দমকল ও দুর্যোগ মোকাবিলা দল

দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই কলকাতা পুলিশের কন্ট্রোল রুমের সমন্বয়ে পুলিশ সদস্য, দমকল বাহিনী, স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের সদস্য এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তারা আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর উদ্যোগ নেয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর প্রায় ৩৫ জন আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহতদের মধ্যে কারও অবস্থা গুরুতর কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।

দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তার স্বার্থে পূজামণ্ডপটি দর্শনার্থীদের জন্য অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আয়োজকেরা মণ্ডপের ভেতরের আলোও নিভিয়ে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

উদ্ধারকাজের সময় আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোই অগ্রাধিকার ছিল বলে জানান পূজা কমিটির এক সংগঠক বিকাশ দাস। হতাহত ব্যক্তিরা ঠিক কী পরিস্থিতিতে পদদলিত হয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সংকীর্ণ গেট ও পর্যাপ্ত আলোর অভাবের অভিযোগ

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পূজামণ্ডপের প্রবেশ ও প্রস্থান গেট ছিল অত্যন্ত সরু। এ ছাড়া ওই এলাকায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ছিল না বলেও অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ।

তাদের দাবি, বৃষ্টির কারণে বাইরে অপেক্ষমাণ দর্শনার্থীদের মধ্যে হঠাৎ ভিড় ও হুড়োহুড়ি তৈরি হয়। একপর্যায়ে অনেকে একসঙ্গে মণ্ডপের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে মানুষের চাপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ভিড়ের মধ্যে অনেকে মাটিতে পড়ে যান এবং কেউ কেউ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। আহতদের কয়েকজনকে স্বজনেরা দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি উদ্ধারকাজ পরিচালনা এবং ভিড়ের মধ্যে আহতদের নিরাপদে বের করে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে প্রবেশ ও প্রস্থানপথের নকশা, আলোর ব্যবস্থা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এখনো অভিযোগ ও প্রাথমিক বর্ণনার পর্যায়ে রয়েছে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

নিহতদের পরিবারকে দুই লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ ঘোষণা

কলকাতার দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ঘটনাটিকে অত্যন্ত মর্মান্তিক উল্লেখ করে তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে দুই লাখ রুপি এবং আহত প্রত্যেককে ৫০ হাজার রুপি করে অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় তিনি দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় শোক প্রকাশ করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।

ক্ষতিপূরণের ঘোষণা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কারা সহায়তা পাবেন, কীভাবে অর্থ বিতরণ করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো কবে নাগাদ সহায়তা পাবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত প্রশাসনিক নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ।

অমিত শাহের রাজনৈতিক কর্মসূচি স্থগিত

দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গ সফররত ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাঁর রোববারের রাজনৈতিক কর্মসূচি স্থগিত করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে ফোনে কথা বলে পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন। পাশাপাশি হাসপাতালে গিয়ে আহতদের দেখতে যাওয়ার কথাও জানান।

এ ঘটনায় কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও শোক প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।

দুর্ঘটনার পর রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ, আহতদের চিকিৎসা এবং নিহতদের পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে।

দুর্গোৎসবে জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন

কলকাতার মতো জনবহুল শহরে দুর্গাপূজার সময় দর্শনার্থীদের চাপ সামলানো প্রশাসন ও পূজা আয়োজকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে জনপ্রিয় মণ্ডপগুলোতে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, জরুরি নির্গমনব্যবস্থা, আলোকসজ্জা, স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব এবং পুলিশি নজরদারি জননিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় জনসমাগমের ক্ষেত্রে প্রবেশ ও প্রস্থানপথ আলাদা রাখা, একসঙ্গে অতিরিক্ত দর্শনার্থী প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, জরুরি বহির্গমনপথ সচল রাখা এবং ভিড়ের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। পাশাপাশি বৃষ্টি বা অন্য কোনো কারণে হঠাৎ জনসমাগমের চাপ বেড়ে গেলে দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য কার্যকর জরুরি পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।

চোরবাগান সর্বজনীন পূজামণ্ডপের দুর্ঘটনাটি জনসমাগম ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা প্রস্তুতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, আয়োজক বা কর্তৃপক্ষের অবহেলাকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তদন্তের ফলাফল জানা জরুরি।

তদন্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহায়তা এখন অগ্রাধিকার

এ ধরনের দুর্ঘটনার পর তাৎক্ষণিক উদ্ধারকাজের পাশাপাশি হতাহতের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ, আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা, নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তাব্যবস্থা, দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, ভিড় নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তদন্তে কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনা বা নিরাপত্তার ঘাটতি পাওয়া গেলে দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দঘন সময়ে কলকাতার এই মর্মান্তিক ঘটনা বহু পরিবারকে শোকের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন, আহতদের যথাযথ চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোই এখন সবচেয়ে জরুরি।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি ও কলকাতা পুলিশের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!