ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা চাইছে গ্রিস ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বিশেষ করে লিবিয়া ও মিসর হয়ে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে প্রবেশের চেষ্টা নিয়ন্ত্রণে ঢাকা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে চায় এথেন্স। বাংলাদেশি নাগরিকদের যাত্রাপথ, পরিচয় শনাক্তকরণ এবং নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়েও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
গ্রিক সংবাদমাধ্যম কাথিমেরিনি–এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর আফ্রিকা থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অভিবাসীদের ক্রিট দ্বীপে পৌঁছানোর ঘটনায় গ্রিক কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে গ্রিসে অভিবাসীদের আগমন কমলেও লিবিয়া থেকে ক্রিটে আসার পথটি এখনো দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কয়েক দিনে ক্রিটে পৌঁছেছেন এক হাজারের বেশি অভিবাসী
কাথিমেরিনি–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক দিনের মধ্যে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে এক হাজারের বেশি অভিবাসী পৌঁছেছেন। তাঁদের অনেকে দ্বীপটির দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের ইয়ারাপেত্রা এলাকায় অবতরণ করেন। উত্তর আফ্রিকা থেকে সমুদ্রপথে অভিবাসীদের এমন আগমন গ্রিসের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণাঞ্চল থেকে ক্রিটে পৌঁছানোর পথটি অভিবাসীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। লিবিয়া থেকে নৌযানে করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেন বিভিন্ন দেশের নাগরিক। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশিরাও রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ক্রিটে সাম্প্রতিক সময়ে পৌঁছানো এক হাজারের বেশি অভিবাসীর মধ্যে কতজন বাংলাদেশি, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ওই আগমনকে সরাসরি বাংলাদেশি অভিবাসীদের সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
গ্রিসে অভিবাসীর আগমন কমলেও উদ্বেগ কাটেনি
প্রতিবেদনে দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত গ্রিসে অভিবাসীদের মোট আগমন প্রায় ৬২ হাজার থেকে কমে ৪২ হাজারে নেমেছে। অর্থাৎ সামগ্রিক আগমনের সংখ্যা কমলেও উত্তর আফ্রিকা থেকে ক্রিটে পৌঁছানোর পথটি নিয়ে গ্রিক কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, লিবিয়ায় পাঁচ লাখের বেশি শরণার্থী ও অভিবাসী অবস্থান করছেন। দেশটিতে অবস্থানরত মানুষের সবাই যে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, এমন নয়। তবে লিবিয়াকে কেন্দ্র করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা গ্রিসসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অভিবাসন নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে অনিয়মিত সমুদ্রযাত্রা, মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা এবং অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এসব কারণে অভিবাসীদের যাত্রাপথে নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে গ্রিস ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
বাংলাদেশি নাগরিকদের যাত্রাপথ নিয়ে উদ্বেগ
গ্রিক কর্তৃপক্ষের উদ্বেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কিছু বাংলাদেশি নাগরিক উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে মিসরের কায়রো এবং লিবিয়ার বেনগাজি ও ত্রিপোলিগামী ফ্লাইট ব্যবহার করে উত্তর আফ্রিকায় পৌঁছান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর তাঁদের কেউ কেউ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে প্রবেশের চেষ্টা করেন।
এ কারণে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি যাত্রার পাশাপাশি তৃতীয় দেশ হয়ে উত্তর আফ্রিকায় পৌঁছানোর পথ নিয়েও নজরদারি ও সহযোগিতা বাড়াতে চায় এথেন্স। বিশেষ করে যাত্রাপথের তথ্য যাচাই, পরিচয় শনাক্তকরণ এবং অনিয়মিত অভিবাসন প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট রুট ব্যবহার করে যাত্রা করলেই একজন ব্যক্তি অনিয়মিত অভিবাসী বা মানবপাচারের শিকার—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। যাত্রার উদ্দেশ্য, প্রবেশের বৈধতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিস্থিতি এবং আশ্রয় চাওয়ার অধিকার পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পরিচয় শনাক্তকরণ ও প্রত্যাবাসনে সমন্বয়ের উদ্যোগ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশি নাগরিকদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং তাঁদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও গ্রিসের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। এ ক্ষেত্রে চার্টার ফ্লাইট পরিচালনার প্রসঙ্গও উল্লেখ করা হয়েছে।
অনিয়মিতভাবে প্রবেশের অভিযোগে আটক বা প্রত্যাবাসনের আওতায় আসা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জাতীয়তা নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। পরিচয় যাচাইয়ের পর প্রযোজ্য আইন, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
তবে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আইনি অবস্থান, আশ্রয়ের আবেদন এবং প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক সুরক্ষার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখা জরুরি। কাথিমেরিনি–এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ও গ্রিসের মধ্যে সমন্বয়ের কথা বলা হলেও, চার্টার ফ্লাইটের নির্দিষ্ট সময়সূচি, প্রত্যাবাসনের সংখ্যা কিংবা এ বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
আশ্রয়প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার সম্ভাবনার কথাও আলোচনায়
প্রতিবেদনে আশ্রয়প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার সম্ভাব্য ব্যবস্থার কথাও এসেছে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপের বাস্তবায়ন, পরিধি, সময়সীমা কিংবা কোন শ্রেণির অভিবাসীদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
আশ্রয়প্রক্রিয়া অভিবাসন ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো ব্যক্তি নিজ দেশে নির্যাতন, সংঘাত বা অন্য কোনো গুরুতর ঝুঁকির আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক সুরক্ষা চাইলে তাঁর আবেদন প্রযোজ্য আইন ও নিয়ম অনুযায়ী বিবেচনা করতে হয়। তাই অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগের পাশাপাশি আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার এবং ব্যক্তিভিত্তিক পরিস্থিতি মূল্যায়নের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে সম্ভাব্য নীতিগত পরিবর্তন সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা বিস্তারিত নির্দেশনা ছাড়া আশ্রয়প্রক্রিয়া স্থগিতের বিষয়টিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
উত্তর আফ্রিকার পরিস্থিতি ও সহযোগিতার চ্যালেঞ্জ
গ্রিসের উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো, লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সমুদ্রপথে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাওয়া নিয়ে জটিলতা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে উত্তর আফ্রিকা থেকে অভিবাসীদের যাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
লিবিয়া থেকে ইউরোপমুখী যাত্রা নিয়ন্ত্রণে শুধু গ্রিসের পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। যাত্রার উৎস, ট্রানজিট রুট, সমুদ্রপথ এবং গন্তব্য—প্রতিটি পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। এ কারণেই বাংলাদেশ, উপসাগরীয় দেশ এবং উত্তর আফ্রিকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে গ্রিস ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
প্রতিবেদনে সুদানের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা মানুষের মতো সংঘাতপীড়িত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকদের অভিবাসনপথের পার্থক্যও তুলে ধরা হয়েছে। তবে অভিবাসীদের পরিস্থিতি একরকম নয়; কারও ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কারণ, কারও ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বা নির্যাতনের আশঙ্কা, আবার কারও ক্ষেত্রে মানবপাচারকারী চক্রের ভূমিকা থাকতে পারে। তাই অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় ব্যক্তির পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য কী অর্থ বহন করছে এই উদ্যোগ?
গ্রিস ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বিদেশগামী বাংলাদেশি নাগরিকদের যাত্রাপথ ও ভিসাসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, অনিয়মিত অভিবাসন এবং মানবপাচার প্রতিরোধে তথ্য বিনিময় ও পরিচয় শনাক্তকরণে সমন্বয় জোরদার করার বিষয়টি সামনে আসতে পারে। তৃতীয়ত, প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে বৈধ পথে বিদেশে কর্মসংস্থান, ভ্রমণ ও অভিবাসনের সুযোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিদেশে যাওয়ার নামে প্রতারণা, ভুয়া ভিসা, অবৈধ যাত্রাপথ এবং মানবপাচারকারী চক্রের ফাঁদ থেকে নাগরিকদের সুরক্ষায় সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।
তবে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে গ্রিস ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতার বিষয়ে কী ধরনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়েছে, সে সম্পর্কে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য নেই। ফলে বিষয়টি এখন পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ ও আলোচনার বিষয় হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
সব মিলিয়ে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে গ্রিস ও ইইউ বাংলাদেশের পাশাপাশি উপসাগরীয় ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে আগ্রহী। এ উদ্যোগের পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে আলোচনার ফল, পরিচয় শনাক্তকরণ ও প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত সহযোগিতা এবং অভিবাসীদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়গুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপর।

