ঢাকা বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

menu

সৌদি আরবে আটকা ঈশ্বরদীর ৫০ ওমরাহযাত্রী, দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা

ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম

সৌদি আরবে আটকা ঈশ্বরদীর ৫০ ওমরাহযাত্রী, দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা

ছবিঃ সংগৃহীত

পবিত্র ওমরাহ পালন শেষে দেশে ফেরার অপেক্ষায় সৌদি আরবে আটকা পড়েছেন পাবনার ঈশ্বরদীর ৫০ জন ওমরাহযাত্রী। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) তাঁদের দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার ঘটনার পর বিমান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় তাঁদের ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে মক্কায় হোটেলে থাকার নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ায় দেখা দিয়েছে আবাসনসংকট। থাকা-খাওয়ার অনিশ্চয়তার মধ্যে কয়েকজন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলে জানিয়েছেন আটকে পড়া যাত্রীরা।

আটকে পড়া ৫০ জনের দলে নারী-পুরুষের পাশাপাশি কয়েকজন শিশুও রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ বছর বয়সী প্রবীণ ব্যক্তিরাও আছেন। হঠাৎ ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় তাঁদের নতুন করে থাকার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। একদিকে বাড়তি খরচ, অন্যদিকে দেশে ফেরার নির্দিষ্ট সময় না জানায় চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটছে তাঁদের।

হোটেলের মেয়াদ শেষ, আবাসন নিয়ে দুশ্চিন্তা

সৌদি আরবে অবস্থানরত ঈশ্বরদীর মোয়াল্লেম মোহাম্মদ আবু রায়হান জানান, ওমরাহ পালন শেষে মঙ্গলবার ৫০ জনের দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার ঘটনার পর বিমান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় তাঁরা দেশে ফিরতে পারেননি।

তিনি জানান, মক্কায় তাঁদের হোটেলে থাকার নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ফলে এখন নতুন করে থাকার জায়গা খুঁজতে হচ্ছে। কবে ফ্লাইট চালু হবে এবং কখন দেশে ফিরতে পারবেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না থাকায় যাত্রীরা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।

নির্ধারিত সময়ের বাইরে সৌদি আরবে অবস্থান করতে হওয়ায় তাঁদের আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে প্রবীণ ও অসুস্থ যাত্রীদের নিয়ে বাড়তি দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।

পরিবার নিয়ে গিয়ে বিপাকে সাগর সরদার

ঈশ্বরদী পৌর এলাকার সাঁড়াগোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা সাগর সরদার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরবে গেছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান। দেশে ফেরার প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই বিমান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় তাঁরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

সাগর সরদার বলেন, ‘আমি, আমার মা, স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে ওমরাহ পালন করতে এসেছি। দেশে ফেরার প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই বিমানবন্দরে হামলার কারণে পরিস্থিতি ওলটপালট হয়ে গেছে। থাকা-খাওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। মহাবিপদে পড়েছি।’

পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিরাপদে দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি। বিশেষ করে পরিবারের প্রবীণ সদস্য ও শিশুদের নিয়ে অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে অবস্থান করায় তাঁর উদ্বেগ বেড়েছে।

অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে কয়েকজন

ওমরাহযাত্রী ইসমাইল হোসেন জানান, আটকে পড়া ৫০ জনের মধ্যে বেশ কয়েকজন প্রবীণ নারী-পুরুষ রয়েছেন। তাঁদের কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে আবাসনের ব্যবস্থা করা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, প্রবীণ ও অসুস্থ যাত্রীদের নিয়ে তাঁরা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। দেশে ফেরার তারিখ অনিশ্চিত হওয়ায় কত দিন সৌদি আরবে থাকতে হবে, তা-ও বুঝতে পারছেন না তাঁরা।

দীর্ঘ ভ্রমণ, বাড়তি অবস্থান এবং আবাসনসংকটের কারণে যাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে অসুস্থ ব্যক্তি, শিশু ও বয়স্কদের প্রয়োজনীয় যত্ন নিশ্চিত করা এখন তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সৌদিগামী ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন, ভোগান্তিতে ১৩ হাজারের বেশি যাত্রী

এদিকে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে হামলার ঘটনার পর নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের বিমান যোগাযোগেও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা থেকে সৌদিগামী সরাসরি ও ট্রানজিট মিলিয়ে মোট ৮২টি ফ্লাইটের চলাচল ব্যাহত হয়েছে। এতে ১৩ হাজার ৭১ জন যাত্রী ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।

বেবিচকের হিসাব অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত ফ্লাইটগুলোর মধ্যে ৩২টি সরাসরি এবং ৫০টি ট্রানজিট ফ্লাইট। ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তন ও চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় সৌদি আরবগামী যাত্রীদের পাশাপাশি ট্রানজিটের মাধ্যমে গন্তব্যে যাওয়ার পরিকল্পনা করা যাত্রীরাও সমস্যায় পড়েছেন।

বেবিচক জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ফ্লাইটের সময়সূচি পুনর্নির্ধারণে কাজ করছে সংস্থাটি।

১৭ অক্টোবর পর্যন্ত দাম্মাম ও রিয়াদগামী ফ্লাইট স্থগিত

যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ঢাকা থেকে সৌদি আরবের দাম্মাম ও রিয়াদগামী সব ফ্লাইট আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করেছে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে নির্ধারিত সময়ে সৌদি আরবে যাওয়ার পরিকল্পনা করা যাত্রীদের ভ্রমণসূচি পরিবর্তন করতে হতে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরবে অবস্থানরত যেসব যাত্রী দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন, তাঁদেরও সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করতে হচ্ছে।

তবে ১৭ অক্টোবরের পর ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক হবে কি না, তা নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

আটকে পড়াদের খোঁজ রাখছে উপজেলা প্রশাসন

ঈশ্বরদীর ৫০ জন ওমরাহযাত্রী সৌদি আরবে আটকে পড়ার বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনও পর্যবেক্ষণ করছে। ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব জানিয়েছেন, সৌদি আরবে আটকে পড়া যাত্রীদের বিষয়ে পাবনা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, সংকট কেটে যাবে।

দ্রুত দেশে ফেরার ব্যবস্থা চান স্বজনেরা

ওমরাহ পালন শেষে দেশে ফেরার কথা থাকলেও সৌদি আরবে বিমান চলাচলে বিঘ্নের কারণে আটকে পড়া যাত্রীদের দুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে। হোটেলে থাকার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া, নতুন করে আবাসন খোঁজা, থাকা-খাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং কয়েকজনের অসুস্থতার খবর তাঁদের স্বজনদেরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ যাত্রীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের নিরাপদ আবাসন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং দেশে ফেরার বিষয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ অবস্থায় ঈশ্বরদীর ৫০ জন ওমরাহযাত্রী কবে দেশে ফিরতে পারবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাঁদের নিরাপদে দেশে ফেরার বিষয়টি নির্ভর করছে সৌদি আরবের পরিস্থিতি, বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!