ঢাকা বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬

menu

ঈশ্বরদীতে জামায়াত সমর্থকের বিরুদ্ধে দুই সন্তানের জননীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঈশ্বরদী

প্রকাশিত: নভেম্বর ৪, ২০২৬, ১২:২৩ পিএম

ঈশ্বরদীতে জামায়াত সমর্থকের বিরুদ্ধে দুই সন্তানের জননীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ

ছবিঃ সংগৃহীত

পাবনার ঈশ্বরদীতে দুই সন্তানের জননী এক গৃহবধূকে ঘরে ঢুকে জোরপূর্বক শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে মোহাম্মদ আবুল কামাল আজাদ খাঁ (৬২) নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ঘটনার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে অভিযুক্তের বাড়িতে গেলে ওই গৃহবধূ ও তাঁর শ্বশুরকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে অভিযুক্ত, তাঁর ছেলে ও জামাতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

গত রোববার (১ নভেম্বর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের কালিকাপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী ওই গৃহবধূ একই গ্রামের বাসিন্দা এবং মো. পাভেল প্রাংয়ের স্ত্রী। অভিযুক্ত আবুল কামাল আজাদ খাঁ স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী এবং জামায়াতের সমর্থক বলে পরিচিত।

ভুক্তভোগী গৃহবধূ ও তাঁর পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার সময় তাঁর স্বামী বাড়ির বাইরে ছিলেন। এ সুযোগে আবুল কামাল আজাদ খাঁ কৌশলে ঘরে প্রবেশ করে তাঁকে জোরপূর্বক জাপটে ধরেন এবং শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়ে শ্লীলতাহানি করেন। এ সময় তাঁর চিৎকারে অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করলে বাড়ির ফটকের সামনে গৃহবধূর দেবর শাকিল তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করেন। তবে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে অভিযুক্ত পালিয়ে যান।

পরিবারের দাবি, ঘটনার পরপরই বিষয়টি অভিযুক্তের পরিবারের সদস্যদের জানিয়ে বিচার দাবি করা হয়। তখন অভিযুক্তের ছেলে মো. ফারুক খাঁ সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন। পরে স্থানীয় সমাজপ্রধানদের কাছেও বিচার চাওয়া হয়। কিন্তু কয়েক দিন পার হলেও কোনো কার্যকর সমাধান না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

বিচারের দাবিতে অভিযুক্তের বাড়িতে, মারধরের অভিযোগ

ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের আশায় তারা স্থানীয় সমাজপ্রধান ও জামায়াত নেতা মো. আসাদ দেওয়ানের কাছে বিচার প্রার্থনা করেন। কিন্তু অভিযোগের পরও কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় তাঁরা হতাশ হন।

এরপর মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে ভুক্তভোগী গৃহবধূ ও তাঁর শ্বশুর মো. জামাল প্রাং অভিযুক্ত আবুল কামাল আজাদ খাঁর বাড়িতে গিয়ে বিচারের দাবিতে অবস্থান নেন। এ সময় অভিযুক্ত আবুল কামাল আজাদ খাঁ, তাঁর ছেলে মো. ফারুক খাঁ এবং জামাতা মো. সাইফুদ্দিন প্রাং তাঁদের মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।

ভুক্তভোগীর স্বামী মো. পাভেল প্রাংয়ের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকেই তাঁদের ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়ে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। উল্টো অভিযোগ তোলার কারণে তাঁদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এমনকি বিষয়টি নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলে তাঁদের চলাচলের রাস্তাও বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন অভিযুক্তের জামাতা সাইফুদ্দিন প্রাং।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কু-নজর দিতেন অভিযুক্ত

ভুক্তভোগী গৃহবধূ জানান, তাঁর দুটি সন্তান রয়েছে। ঘটনার দিন বড় সন্তান পাশের বাড়িতে দাদির কাছে থাকায় ছোট সন্তানকে নিয়ে তিনি ঘরে শুয়ে ছিলেন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে অভিযুক্ত আবুল কামাল আজাদ খাঁ কৌশলে ঘরে প্রবেশ করে তাঁকে জোরপূর্বক জাপটে ধরেন এবং শ্লীলতাহানি করেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি এর আগেও বিভিন্ন সময় তাঁর প্রতি কু-নজর দিতেন। ঘটনার দিন তাঁর চিৎকার শুনে পরিবারের সদস্যরা এগিয়ে এলে অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় তাঁর দেবর শাকিল তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করলেও অভিযুক্ত ধাক্কা দিয়ে ফেলে পালিয়ে যান।

ভুক্তভোগী ওই গৃহবধূ বলেন, তিনি একজন অসহায় নারী। ঘটনার পর ন্যায়বিচারের আশায় স্থানীয়ভাবে একাধিকবার চেষ্টা করেও কোনো প্রতিকার পাননি। উল্টো বিচারের দাবিতে গিয়ে অপমান ও মারধরের শিকার হয়েছেন। তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

স্বামীর অভিযোগ, বিচার না পেয়ে থানায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত

ভুক্তভোগীর স্বামী মো. পাভেল প্রাং বলেন, ঘটনার সময় তিনি বাড়ির বাইরে ছিলেন। বাড়িতে ফিরে স্ত্রীর কাছ থেকে ঘটনা শুনে অভিযুক্তের বাড়িতে গিয়ে প্রতিবাদ জানান এবং বিচারের দাবি করেন। তখন অভিযুক্তের ছেলে সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দিলেও পরবর্তী সময়ে তাঁদের সঙ্গে অসহযোগিতা করা হয়।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। কিন্তু বিচার চাওয়ার কারণে উল্টো আমাদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এমনকি চলাচলের রাস্তাও বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় আমরা ঈশ্বরদী থানায় মামলা করব।’

অভিযোগ অস্বীকার অভিযুক্তের, পাল্টা দাবি পরিবারের

তবে গৃহবধূর করা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আবুল কামাল আজাদ খাঁ। তাঁর দাবি, ওই পরিবারের সদস্যরা তাঁর গভীর নলকূপের বিভিন্ন জিনিসপত্র চুরি করেন এবং সেখানে মাদকের আসর বসান।

আবুল কামাল আজাদ খাঁ বলেন, ‘ওদের বাড়ির কাছে আমার একটি গভীর নলকূপ রয়েছে। সেখানে প্রায়ই ওই পরিবারের লোকজন নেশার আসর বসায় এবং নলকূপের বিভিন্ন জিনিসপত্র চুরি করে। ঘটনার দিন রাতে নলকূপ থেকে ফেরার পথে জামাল কবিরাজের বাড়ির কাছে বহিরাগত অনেক যুবক দেখতে পাই। পরে তাদের ধাওয়া দিই। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই প্রতিহিংসাবশত আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’

অভিযুক্তের ছেলে মো. ফারুক খাঁও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘ওরা নেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমরা এর প্রতিবাদ করায় আমাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের মিথ্যা অভিযোগ ছড়াচ্ছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তিনি ও তাঁর বাবা দুজনই জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

বিচার করবেন বলে জানালেন সমাজপ্রধান

এ বিষয়ে স্থানীয় সমাজপ্রধান ও জামায়াত নেতা মো. আসাদ দেওয়ান বলেন, এ ঘটনায় তাঁর কাছে বিচার চাওয়া হয়েছে। উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেবেন এবং সুষ্ঠু বিচার করবেন।

তবে ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে বিচার চেয়েও তাঁরা এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর প্রতিকার পাননি।

এদিকে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনা শ্লীলতাহানির অভিযোগ এবং বিচারের দাবিতে গিয়ে মারধরের অভিযোগের বিষয়ে এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভুক্তভোগীর স্বামী থানায় মামলা করার কথা জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের মতে, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কোনো ধরনের সামাজিক প্রভাব বা রাজনৈতিক পরিচয় যেন বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়েও প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!