সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে, অর্থাৎ ডিসেম্বরেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে কেন্দ্রটি থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হবে। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
তিনি বলেছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর ক্ষেত্রে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শতভাগ নিরাপত্তা জোরদার ও নিশ্চিত করেই বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করা হবে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী এসব তথ্য জানান।
মন্ত্রী বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রাথমিকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো হবে। আগামী পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ডিসেম্বরেই শুরু হতে পারে রূপপুরের বিদ্যুৎ সরবরাহ
দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। দীর্ঘ প্রস্তুতি, নির্মাণকাজ ও প্রযুক্তিগত কার্যক্রম শেষে কেন্দ্রটি থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে দেশ।
প্রাথমিক পর্যায়ে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরে উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রস্তুতি বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন শুরু হলে দেশের জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ যুক্ত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন শুরু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্য বাড়বে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ কারণে রূপপুর কেন্দ্রের উৎপাদন কার্যক্রম শুরুর আগে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও কারিগরি প্রস্তুতি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানিয়েছেন, শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই কেন্দ্রটির উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করা হবে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, রিঅ্যাক্টরের কার্যক্রম, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, বিকিরণ নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিশ্চিত করা বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর অন্যতম শর্ত।
সরকারের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে ডিসেম্বরেই রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বা প্রাথমিক পর্যায়ের বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে।
৫ নভেম্বর ঢাকায় আন্তর্জাতিক এআই বিজনেস সামিট
সংবাদ সম্মেলনে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি নিয়েও কথা বলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী।
তিনি জানান, আগামী ৫ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬’। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান অতিথি হিসেবে সামিটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) যৌথভাবে এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করছে।
‘আগামীর অর্থনীতির জন্য এআই-ফিকশন’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আয়োজিত এ সামিটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে।
ব্যবসা-বাণিজ্যে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা
মন্ত্রী জানান, সামিটে ব্যবসায়িক রূপান্তর, শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সহযোগিতা, নতুন উদ্ভাবন, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং দায়িত্বশীল এআই অবকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থান পাবে।
বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থনীতি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, তথ্য বিশ্লেষণ, স্বয়ংক্রিয় কার্যক্রম পরিচালনা এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতেও এ প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ব্যাংকিং, আর্থিক সেবা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও উৎপাদনশিল্পে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব।
এআই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের পরিবেশ গড়ে তোলার বিষয়গুলোও সামিটে গুরুত্ব পাবে বলে জানান মন্ত্রী।
সব মিলিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ডিসেম্বরেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সম্ভাবনা এবং ঢাকায় আন্তর্জাতিক এআই বিজনেস সামিট আয়োজন—দুটি উদ্যোগই দেশের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

