ঢাকা বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬

menu

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে চাপে ট্রাম্প, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর শঙ্কায় রিপাবলিকানরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: নভেম্বর ৪, ২০২৬, ০৯:৫১ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে চাপে ট্রাম্প, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর শঙ্কায় রিপাবলিকানরা

ছবিঃ সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা কয়েকটি আসনে এগিয়ে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টির কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনার সুযোগ পাবেন ডেমোক্র্যাটরা। এমনকি সিনেটেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়তে পারে।

সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওহাইও, জর্জিয়া ও নর্থ ক্যারোলাইনাসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ভোট গণনা ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে, হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দুই বছর কংগ্রেসে তাঁর দল কতটা কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারবে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা, সরকারের নীতির প্রতি জনগণের সমর্থন এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। এবারও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের প্রভাব নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব ইস্যুতে ভোটারদের অসন্তোষ রিপাবলিকানদের নির্বাচনী সম্ভাবনাকে চাপে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে মোট ৪৩৫টি আসন রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে একটি দলকে অন্তত ২১৮টি আসন নিশ্চিত করতে হয়। ফলে অল্প কয়েকটি আসনের ব্যবধানও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রাথমিক ফলাফল ও নির্বাচনী পূর্বাভাসে ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি রিপাবলিকান শিবিরে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেলে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন বাধা তৈরি হতে পারে।

ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে বিভিন্ন সরকারি নীতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও ব্যয়ের বিষয়ে শুনানি আয়োজন করতে পারবেন। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত শুরু, সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের নথি তলব করার সুযোগও বাড়বে।

এ ছাড়া রিপাবলিকানদের সমর্থন ছাড়া বিতর্কিত কোনো আইন পাস করানো ট্রাম্পের জন্য কঠিন হয়ে পড়তে পারে। যদিও প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকবে, তবু কংগ্রেসে বিরোধী দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের গতি কমিয়ে দিতে পারে।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে মোট ১০০টি আসন রয়েছে। সাধারণত সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণে ৫১টি আসন প্রয়োজন হয়। তবে সিনেটে ৫০-৫০ সমতা তৈরি হলে ভাইস প্রেসিডেন্টের ভোট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এবার সিনেটের ৩৫টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব আসনের ফলের ওপর নির্ভর করবে রিপাবলিকানরা তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবেন কি না।

সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিচারক, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এবং জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। কারণ, অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।

তবে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নির্বাচনী সমীকরণ এক নয়। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি থাকলেও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হলে তাদের একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে জয় নিশ্চিত করতে হবে।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও ইরান ইস্যুতে চাপে ট্রাম্প

নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগের পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের প্রভাবকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, আবাসন ব্যয়, জ্বালানি খরচ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রাজনৈতিক বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব ক্ষেত্রে সরকারের নীতিতে অসন্তুষ্ট ভোটাররা মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন।

অন্যদিকে ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত ও পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্তও ভোটারদের মনোভাবকে প্রভাবিত করতে পারে। যুদ্ধের ব্যয়, নিরাপত্তাঝুঁকি এবং অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে তার রাজনৈতিক দায়ভার ক্ষমতাসীন দলের ওপর পড়তে পারে।

এ কারণে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নির্ধারণের লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং ট্রাম্পের নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারণ এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর কর্মকাণ্ডের প্রতি ভোটারদের সমর্থন যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।

রিপাবলিকান শিবিরে উদ্বেগ

সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জর্জিয়ায় রিপাবলিকান দলের এক কর্মকর্তা অঙ্গরাজ্যজুড়ে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ সিনেট ও গভর্নর নির্বাচনের ফল অনিশ্চিত থাকায় ডেমোক্র্যাটদের মোকাবিলায় পর্যাপ্ত সমর্থন পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে রিপাবলিকান প্রচারশিবিরগুলোর মধ্যে।

নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে অল্পসংখ্যক ভোটের ব্যবধানও চূড়ান্ত ফল পাল্টে দিতে পারে। ডেমোক্র্যাটদের সমর্থক ভোটারদের উপস্থিতি বেশি হলে রিপাবলিকানদের জন্য আসন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

তবে প্রাথমিক ফলাফল বা নির্বাচনী পূর্বাভাসের ভিত্তিতে চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করা যায় না। ভোট গণনা শেষ হওয়া এবং আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের পরই কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা পাওয়া সম্ভব।

৪৩৫টি প্রতিনিধি পরিষদ ও ৩৫টি সিনেট আসনে নির্বাচন

এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসনে এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট হচ্ছে। পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর পদেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

প্রতিনিধি পরিষদে মাত্র কয়েকটি আসনের পরিবর্তনই সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব পাল্টে দিতে পারে। অন্যদিকে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী পরিস্থিতি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর ফল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

কানসাস, টেক্সাস, আইওয়া, ওহাইও ও আলাস্কার মতো ঐতিহ্যগতভাবে রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ার বিষয়টি নির্বাচনী সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে। এসব রাজ্যে ডেমোক্র্যাটরা প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করলে রিপাবলিকানদের জন্য সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

অন্যদিকে মিশিগানসহ কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখাও ডেমোক্র্যাটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ ও প্রার্থী নিয়ে বিতর্ক কিছু আসনে তাদের নির্বাচনী সম্ভাবনায় প্রভাব ফেলতে পারে।

পূর্বাভাসে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ডিসিশন ডেস্ক এইচকিউর পূর্বাভাসে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের ২৪১টি এবং রিপাবলিকানদের ১৯৪টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। সিনেটেও ডেমোক্র্যাটদের ৫২-৪৮ ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

তবে নির্বাচনী পূর্বাভাস চূড়ান্ত ফল নয়। ভোটারদের উপস্থিতি, অঙ্গরাজ্যভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ভোট গণনার অগ্রগতির সঙ্গে এসব হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ট্রাম্প প্রশাসনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেট—যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালেও আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। আর দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণই হারালে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির বাকি দুই বছর আরও কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!