ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬

menu

পোশাকশিল্পে অস্থিরতা, হুমকিতে রপ্তানি ও অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: নভেম্বর ৩, ২০২৬, ১২:৪৬ পিএম

পোশাকশিল্পে অস্থিরতা, হুমকিতে রপ্তানি ও অর্থনীতি

ছবিঃ সংগৃহীত

তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, চাকরির নিরাপত্তা, ছাঁটাই বন্ধ, চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহালসহ বিভিন্ন দাবিতে সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও রাজধানীর মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও ভাঙচুর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সোমবার (২ নভেম্বর) এসব শিল্পাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন মালিকরা। এতে একদিকে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি আদেশের পণ্য সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশের পরিবর্তে ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া কিংবা পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে শুধু তৈরি পোশাকশিল্প নয়, দেশের রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করার দাবি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আন্দোলনের নামে সহিংসতা, কারখানা ভাঙচুর, উৎপাদন বন্ধ এবং রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এমন বাস্তবতায় শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, মালিকদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

এক দিনে প্রায় ৪০০ কারখানায় ছুটি, আহত ১২ পুলিশ সদস্য

শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চলের ২৬৪টি এবং গাজীপুরের দেড় শতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এসব অঞ্চলের প্রায় ৪০০ কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এদিন কয়েকটি কারখানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। সংঘর্ষে শিল্প পুলিশের ১২ সদস্য আহত হয়েছেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কারখানা, সড়ক ও শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

এদিকে বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, রোববার মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও ময়মনসিংহসহ পাঁচটি শিল্পাঞ্চলের ৫২৯টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। সোমবারের আরেক হিসাবে দেশের পাঁচটি শিল্পাঞ্চলে ৬৭০টি কারখানা বন্ধ থাকার তথ্য জানিয়েছে সংগঠনটি। অর্থাৎ শিল্পাঞ্চলভেদে পরিস্থিতির বিস্তার ঘটেছে এবং উৎপাদন কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে।

৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি শ্রমিকদের

শ্রমিক অসন্তোষের অন্যতম প্রধান কারণ মজুরি নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ। শ্রমিকদের অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। কিন্তু সেই অনুপাতে তাঁদের আয় বাড়েনি। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এই বেতনে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে পরিবার নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ কারণে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছেন শ্রমিকদের একটি অংশ। তাঁদের বক্তব্য, শুধু মজুরি বাড়ালেই হবে না, কর্মক্ষেত্রে চাকরির নিরাপত্তা, নিয়মিত বেতন-ভাতা, ওভারটাইমের ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং শ্রমিকদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধ করতে হবে।

এর পাশাপাশি আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করা, অন্য কারখানায় চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে কালো তালিকাভুক্ত করা এবং ইচ্ছামতো ছাঁটাইয়ের অভিযোগও রয়েছে। শ্রমিকদের দাবি, চাকরি হারানোর ভয় নিয়ে কাজ করতে হলে কর্মক্ষেত্রে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার বলেছেন, শ্রমিকদের যথাযথ মজুরি দিতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিয়ে মালিকদের আলোচনা করা উচিত। শ্রমিকদের কম মজুরি দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

উৎপাদন বন্ধ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রপ্তানি আদেশ

পোশাকশিল্প মালিকদের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে উৎপাদন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য তৈরি ও জাহাজীকরণ করতে হয়। কোনো কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় অংশ রপ্তানি হয়। এসব বাজারে সময়মতো পণ্য সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে ক্রেতারা আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন, ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিতে পারেন কিংবা বিকল্প উৎপাদনকারী দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে পারেন।

শিল্প মালিকদের আশঙ্কা, বাংলাদেশে শ্রমিক অসন্তোষ ও উৎপাদন বিঘ্নের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প হিসেবে ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের মতো দেশের দিকে ঝুঁকতে পারেন। একবার বড় ক্রেতারা অন্য দেশে চলে গেলে তাঁদের ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।

মালিকদের উদ্বেগ, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

পোশাকশিল্প মালিকদের বক্তব্য, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ন্যায্য মজুরির প্রয়োজনীয়তা তাঁরা উপলব্ধি করেন। তবে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে শিল্পটি নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানিসংকট, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং রপ্তানি আদেশের চাপের কারণে অনেক কারখানা আর্থিক সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে কারখানার আর্থিক ক্ষতি আরও বাড়বে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানিয়েছেন, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় মালিকেরা উদ্বিগ্ন। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হতে পারেন মালিকরা।

তিনি শ্রমিক সংগঠন ও ফেডারেশনগুলোকে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শ্রমিক ও মালিক—উভয় পক্ষের জন্য আইন সমানভাবে প্রয়োগের দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ মালিকেরাও উপলব্ধি করেন। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও শিল্পের সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখতে আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।

নতুন মজুরি বোর্ড গঠন, ছয় সদস্যের কমিটি

শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি বিবেচনায় নিয়ে সরকার ছয় সদস্যের নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। গত ১ নভেম্বর এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। বোর্ডে শ্রমিক, মালিক, সরকার ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নতুন এই বোর্ডের দায়িত্ব হচ্ছে পোশাকশ্রমিকদের বর্তমান মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা করে নতুন মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে সুপারিশ করা।

তবে শ্রমিকদের একাংশের প্রশ্ন, মজুরি বোর্ড গঠন করলেও নতুন মজুরি কার্যকর হতে কত সময় লাগবে এবং প্রস্তাবিত মজুরি তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। শ্রমিকদের দাবি, শুধু বোর্ড গঠন নয়, দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

শ্রমিক প্রতিনিধিদের মতে, মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বর্তমান বাজারদর, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, খাদ্যপণ্য, যাতায়াত ও পরিবারের সদস্যসংখ্যা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণার পরও শ্রমিক অসন্তোষ কমবে না।

আন্দোলনের নামে ভাঙচুরে প্রকৃত শ্রমিকদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে: নাজমা আক্তার

শ্রমিক আন্দোলনের নামে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ও শ্রমিকনেত্রী নাজমা আক্তার।

তিনি বলেছেন, শ্রমিক আন্দোলনের নামে বিভিন্ন স্থানে যে ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে, তার সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকদের সম্পৃক্ততা নেই। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে বহিরাগত ও স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধন রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

নাজমা আক্তার বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলন হতে হবে নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ। কিন্তু আন্দোলনের নামে কোথাও কারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও উৎপাদন বন্ধের মতো ঘটনা ঘটছে। এতে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন শ্রমিকরাই।

তিনি আরও বলেন, কোথাও কারখানা বন্ধ থাকা কিংবা বেতন না পাওয়ার অজুহাতে কারখানার ভেতরে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালানো হচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

শ্রমিকদের নাম ব্যবহার করে নাশকতা ও শিল্পকারখানা ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

তৃতীয় পক্ষের উসকানিতে পা না দেওয়ার আহ্বান আইবিসির

শিল্পাঞ্চলে চলমান পরিস্থিতিতে তৃতীয় পক্ষের উসকানিতে পা না দিয়ে শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিল (আইবিসি)।

সোমবার দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে এ আহ্বান জানান সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মীর আবুল কালাম আজাদ ও সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন স্বপন।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত কয়েক দিন ধরে পোশাকশ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন ও নতুন মজুরি নির্ধারণের দাবিতে গাজীপুর, মিরপুর ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন শ্রমিকেরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ নভেম্বর সরকার ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করে গেজেট প্রকাশ করেছে।

মজুরি বোর্ড গঠনের পরও বিভিন্ন এলাকায় সড়কে অরাজকতা অব্যাহত থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইবিসি। সংগঠনটির নেতারা মনে করেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য আলোচনার পথ খোলা রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো মহল যাতে শ্রমিকদের আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

অর্থনীতিতে বহুমুখী ঝুঁকি

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ শিল্প থেকে। ফলে শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, ব্যাংকিং খাত, পরিবহন, বন্দর, কাঁচামাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষ করে পোশাক রপ্তানি থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিলে অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া লাখ লাখ শ্রমিকের জীবিকা সরাসরি এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা উৎপাদন কমে গেলে শ্রমিকদের আয় কমবে। এর প্রভাব পড়বে তাঁদের পরিবার, স্থানীয় বাজার ও সামগ্রিক ভোগব্যয়ের ওপর।

সংকট উত্তরণে প্রয়োজন কার্যকর সংলাপ

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন কিংবা কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে শ্রমিক অসন্তোষের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য শ্রমিক, মালিক, সরকার ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর সংলাপ প্রয়োজন।

প্রথমত, মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অন্যায়ভাবে শ্রমিক ছাঁটাই, চাকরিচ্যুতির হুমকি এবং কালো তালিকাভুক্তির অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই সঙ্গে কারখানায় নিরাপদ কর্মপরিবেশ, নিয়মিত বেতন-ভাতা এবং শ্রমিকদের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে আন্দোলনের নামে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সড়ক অবরোধ ও সহিংসতা বন্ধে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

কারণ শ্রমিক ও মালিক—উভয় পক্ষের স্বার্থই তৈরি পোশাকশিল্পের সঙ্গে জড়িত। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না হলে উৎপাদনশীলতা ও শিল্পের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন। আবার উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম সচল না থাকলে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

সব মিলিয়ে তৈরি পোশাকশিল্প এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও চাকরির নিরাপত্তার দাবি, অন্যদিকে মালিকদের উৎপাদন ব্যয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চাপ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিল্পাঞ্চলের সহিংসতা ও উৎপাদন বন্ধের পরিস্থিতি। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা না গেলে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!