বিশ্ব পোশাকশিল্প আবারও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরেছে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানি ৪.৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৭৪.৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু এই সম্প্রসারিত বাজারে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশ প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। একই সময়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ০.৮৯ শতাংশ, যেখানে ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধি ১০.৫৩ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ১৬.৮৮ শতাংশ।
এতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—বিশ্ববাজার যখন সম্প্রসারিত হচ্ছে, তখন কেন সেই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ?
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এর কারণ শুধু গ্যাস সংকট, উচ্চ সুদের হার, বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা বা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সংকট। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বড় একটি অংশ এখনও বাংলাদেশকে ‘কম দামে পোশাক উৎপাদনের দেশ’ হিসেবেই বিবেচনা করে। ফলে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর, উচ্চমূল্যের ও বেশি মূল্য সংযোজনকারী পণ্যের পরিবর্তে বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে কম দামের অর্ডারই বেশি আসে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারণা পরিবর্তন না হলে আগামী দিনে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
‘বাংলাদেশ মানেই সস্তা’—এই ধারণা বদলানোই বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ স্বল্পমূল্যের পোশাক উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে শিল্প উচ্চমূল্যের, উদ্ভাবনী ও প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের দিকে এগোতে চাইলেও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের একটি অংশ এখনও বাংলাদেশকে কম দামের উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবেই দেখে।
তার ভাষায়, একই মানের একটি পোশাকের জন্য অন্য কোনো দেশে যে মূল্য দিতে ক্রেতারা রাজি হন, বাংলাদেশে সেই একই পণ্যের জন্য আরও কম মূল্য প্রস্তাব করেন। ফলে কারখানাগুলো উন্নত পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করলেও তার যথাযথ মূল্য পাচ্ছে না।
তিনি বলেন, "ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা আর শুধু কম দামে উৎপাদনের নয়; বরং উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, গুণগত মান ও দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করার সক্ষমতার।"
বিশ্ব পোশাকশিল্পে বদলে গেছে প্রতিযোগিতার ধরন
এক সময় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর প্রধান লক্ষ্য ছিল সর্বনিম্ন উৎপাদন ব্যয় নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এখন বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো গুরুত্ব দিচ্ছে—
দ্রুত উৎপাদন ও সময়মতো সরবরাহ
ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি
পরিবেশবান্ধব উৎপাদন
কার্বন নিঃসরণ হ্রাস
সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা
প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নির্ভরযোগ্যতা
চীন, ভিয়েতনাম ও অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ ইতোমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), অটোমেশন, স্মার্ট ফ্যাক্টরি, ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন এবং শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের বড় একটি অংশ এখনও স্বল্পমূল্যের অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রযুক্তিগত রূপান্তরের গতি তুলনামূলক ধীর।
অস্বাস্থ্যকর মূল্য প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিল্প
মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা এমন মূল্য প্রস্তাব করেন যা বাস্তব উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, অনেক সময় একটি উন্নতমানের শীতকালীন জ্যাকেটের জন্য মাত্র ৫ ডলার মূল্য প্রস্তাব করা হয়। অথচ ওই দামে আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদন করা বাস্তবে সম্ভব নয়।
তার মতে, এই ধরনের মূল্যচাপ শুধু একটি কারখানার মুনাফাই কমায় না; বরং পুরো শিল্পের প্রযুক্তি বিনিয়োগ, উদ্ভাবন এবং টেকসই উন্নয়নের সক্ষমতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোরও বদলাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি
বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদনের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে ইতোমধ্যে নতুন পরিবেশ আইন, বাধ্যতামূলক ট্রেসেবিলিটি এবং কার্বন নিরপেক্ষ উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বাস্তবতায় শুধু উৎপাদনকারী দেশগুলোর ওপর দায় চাপিয়ে দিলে হবে না। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকেও প্রযুক্তি স্থানান্তর, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অংশীদার হতে হবে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংকটও কম নয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সীমাবদ্ধতাও প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিচ্ছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট
বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা
উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি
উচ্চ সুদের হার
ব্যাংকঋণের সীমাবদ্ধতা
বন্দরজট ও লজিস্টিক ব্যয়
দক্ষ জনবলের ঘাটতি
ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটির সীমিত ব্যবহার
উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে সীমিত সক্ষমতা
এসব কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ছে।
ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু গার্মেন্টস কারখানার সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না। সুতা, কাপড়, ডাইং, ফিনিশিং, রাসায়নিক ও আনুষঙ্গিক শিল্পে আরও বড় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
এতে বিদেশি কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমবে, উৎপাদনের সময় কমবে এবং দ্রুত অর্ডার সরবরাহ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো সংকট দেখা দিলেও উৎপাদন সক্ষমতা স্থিতিশীল থাকবে।
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব
বর্তমান ব্যবসায়িক মডেলে অধিকাংশ অর্ডার আসে স্বল্পমেয়াদি দরপত্রের মাধ্যমে। এতে প্রতিবারই মূল্য কমানোর প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, স্থানীয় প্রস্তুতকারক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক খাতের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে জোর দিতে হবে।
ভবিষ্যতের প্রশ্ন বদলে গেছে
বিশ্লেষকদের মতে, এখন আর মূল প্রশ্ন নয়—বাংলাদেশ আরও কম দামে পোশাক তৈরি করতে পারবে কি না।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—
বাংলাদেশ কীভাবে আরও দ্রুত, আরও প্রযুক্তিনির্ভর, আরও স্বচ্ছ এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে?
কারণ বর্তমান বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার ভিত্তি শুধু কম দাম নয়; বরং গতি, প্রযুক্তি, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা, ডিজিটাল স্বচ্ছতা এবং নির্ভরযোগ্যতা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ যদি দ্রুত এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, তাহলে শুধু বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক হিসেবেই নয়, বরং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন, উদ্ভাবন ও টেকসই শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক নেতৃত্বের অবস্থান তৈরি করতে পারবে। অন্যথায় সম্প্রসারিত বিশ্ববাজারের বড় অংশ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর হাতেই চলে যাবে।

