ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬

menu

হাজার কোটি টাকার লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে আখ মাড়াই শুরু করছে রাজশাহী চিনিকল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: নভেম্বর ৩, ২০২৬, ১০:১২ এএম

হাজার কোটি টাকার লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে আখ মাড়াই শুরু করছে রাজশাহী চিনিকল

ছবিঃ সংগৃহীত

হাজার কোটি টাকার পুঞ্জীভূত লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে আগামী ১৩ নভেম্বর থেকে নতুন মৌসুমে আখ মাড়াই শুরু করতে যাচ্ছে রাজশাহী চিনিকল। দীর্ঘদিনের উৎপাদন সংকট, আখের অভাব, পুরোনো যন্ত্রপাতি এবং অস্বাভাবিক উৎপাদন ব্যয়ের কারণে একসময় লাভজনক এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন লোকসানের বৃত্তে আটকে আছে। পরিস্থিতি উত্তরণে আখের ক্রয়মূল্য বাড়ানো হলেও চাষিদের চিনিকলে আখ সরবরাহে আগ্রহ ফেরানো যাচ্ছে না। ফলে নতুন মৌসুমেও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

চিনিকল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০২৬-২৭ মাড়াই মৌসুমে ১৩ নভেম্বর থেকে ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত টানা ৬০ দিন আখ মাড়াইয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ সময়ে প্রায় ৭০ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৩ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য আখের দাম গতবারের তুলনায় মণপ্রতি ১১ টাকা বাড়িয়ে ২৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত পরিমাণ আখ সংগ্রহ করা না গেলে আগের বছরগুলোর মতো এবারও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাজশাহী চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাছুমা আকতার জাহান জানান, এবার প্রায় ৭০ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৩ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এ মৌসুমে চিনিকলে আখ সরবরাহের জন্য ৩ হাজার ৯০০ জন চাষির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। উৎপাদন কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি হিসেবে আখ ক্রয়কেন্দ্রগুলো সচল করা হচ্ছে। নিবন্ধিত চাষিদের পাশাপাশি সাধারণ চাষিরাও চিনিকলে আখ সরবরাহ করতে পারবেন।

তিনি জানান, আখ মাড়াই মৌসুম শুরুর পর চিনিকলের অধিক্ষেত্রের মধ্যে কোনো মিনি আখ মাড়াইকল বা গুড় তৈরির কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। আখ সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে খরচ ৩০০ টাকা

রাজশাহী চিনিকলের লোকসানের অন্যতম বড় কারণ উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের বিশাল ব্যবধান। চলতি মাড়াই মৌসুমে প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে প্রায় ৩০০ টাকা ব্যয় হতে পারে বলে প্রাক্কলন করেছে কর্তৃপক্ষ। অথচ সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি কেজি চিনি বিক্রি করতে হয় ১২৫ টাকা দরে। অর্থাৎ উৎপাদন খরচের তুলনায় প্রতি কেজি চিনি বিক্রি করতে হচ্ছে ১৭৫ টাকা কম দামে।

এই ব্যবধানের কারণে যত বেশি চিনি উৎপাদন হচ্ছে, ততই লোকসানের চাপ বাড়ছে চিনিকলের ওপর। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ অন্যান্য পরিচালন ব্যয়।

চিনিকলটির উৎপাদন কার্যক্রম মূলত বছরের দুই মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সারা বছর শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয় বহন করতে হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ১ হাজার ৫ জন শ্রমিক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। ফলে উৎপাদন কমে গেলেও জনবল ও অবকাঠামো পরিচালনার ব্যয় কমানো সম্ভব হচ্ছে না। পুরোনো যন্ত্রপাতির কারণে উৎপাদন ব্যয়ও তুলনামূলক বেশি।

এক মৌসুমেই লোকসান ৭০ কোটি টাকা

রাজশাহী চিনিকলের আর্থিক পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। গত মাড়াই মৌসুমে (২০২৫-২৬) প্রতিষ্ঠানটির লোকসান হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা। এর আগের মৌসুমে (২০২৪-২৫) লোকসানের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৯ কোটি টাকা। আর গত মাড়াই মৌসুম শেষে চিনিকলটির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।

তবে এই হিসাবকে পুরোপুরি লোকসান হিসেবে বিবেচনা করতে নারাজ চিনিকলের অর্থ বিভাগ। চিনিকলের মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মো. সাদ্দাম হোসেনের দাবি, পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণকে সরাসরি নিট লোকসান বলা ঠিক হবে না। কারণ, চিনিকলের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ এবং মানবসম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদের মূল্য হিসাবের সঙ্গে সমন্বয় করা হলে নিট লোকসানের পরিমাণ কমে আসবে।

লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও পূরণ হয়নি উৎপাদনে

চিনিকলের উৎপাদন বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছর ধরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

২০২৫-২৬ মাড়াই মৌসুমে ৬৭ কার্যদিবসে প্রায় ৬ হাজার ৯৩০ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উৎপাদিত হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ১৭১ মেট্রিক টন। আখসংকটের কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই মাত্র ৪৪ দিন চলার পর বন্ধ হয়ে যায় মিলের উৎপাদন কার্যক্রম।

এর আগের মৌসুমে (২০২৪-২৫) চিনি উৎপাদিত হয়েছিল ৩ হাজার ৫৬৭ মেট্রিক টন। তার আগের তিনটি মৌসুমে (২০২১-২৪) সব মিলিয়ে উৎপাদিত হয়েছিল মাত্র ৪ হাজার ৫৩৭ মেট্রিক টন চিনি। এসব মৌসুমেও পর্যাপ্ত আখ না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই উৎপাদন বন্ধ করতে হয়েছিল।

অর্থাৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কাঁচামালের অভাবে চিনিকলটি তার পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছে না। দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি চলতে থাকায় উৎপাদন কমছে, বাড়ছে লোকসানের পরিমাণ।

দশ বছরে আখ চাষের জমি কমেছে অর্ধেকের বেশি

রাজশাহী চিনিকলের উৎপাদন সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে আখ চাষের জমি কমে যাওয়াকে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রাজশাহী কৃষি অঞ্চলে ৪০ হাজার ৮৬৭ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৩৪০ হেক্টরে।

অর্থাৎ প্রায় ১০ বছরের ব্যবধানে আখ চাষের জমি কমেছে ২১ হাজার ৫২৭ হেক্টর। শতকরা হিসাবে এই হ্রাসের পরিমাণ প্রায় ৫৩ শতাংশ। আখ চাষের জমি কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে চিনিকলের কাঁচামাল সংগ্রহ ও চিনি উৎপাদনে।

চিনিকলের কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্টদের মতে, চাষিদের আখ উৎপাদনে অনাগ্রহের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে চিনিকলে আখ সরবরাহের পর মূল্য পরিশোধে বিলম্ব, আখ পরিবহন ও সরবরাহের ভোগান্তি এবং বিকল্প ফসল চাষে বেশি লাভের সুযোগ অন্যতম।

চাষিরা এখন চিনিকলে আখ সরবরাহের পরিবর্তে স্থানীয় মিনি মাড়াইকলের মাধ্যমে গুড় উৎপাদনে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। এতে তুলনামূলক দ্রুত নগদ অর্থ পাওয়া যায়। পাশাপাশি অনেক কৃষক আখের পরিবর্তে সবজি ও অন্যান্য লাভজনক কৃষিপণ্য উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছেন।

চিনিকল কর্তৃপক্ষ মাড়াই মৌসুমে নিজস্ব অধিক্ষেত্রে মিনি আখ মাড়াইকল বন্ধ রাখা, গুড় তৈরির মেশিন জব্দ এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপেও আখ চাষ ও সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হয়নি।

আধুনিকায়ন ও উৎপাদন ব্যয় কমানো জরুরি

সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজশাহী চিনিকলের দীর্ঘদিনের সংকট কাটাতে শুধু আখের ক্রয়মূল্য বাড়ানো যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি চাষিদের সময়মতো আখের মূল্য পরিশোধ, উন্নত জাতের আখ চাষে উৎসাহ দেওয়া, কৃষকদের জন্য প্রণোদনা, আখ পরিবহনে সুবিধা এবং চিনিকলের পুরোনো যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন প্রয়োজন।

একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় কমানো, জনবল ও পরিচালন ব্যয়ের যৌক্তিক ব্যবস্থাপনা এবং চিনিকলের অব্যবহৃত সম্পদ কাজে লাগানোর বিষয়েও কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন। অন্যথায় উৎপাদন বাড়লেও বাজারমূল্যের তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন ব্যয়ের কারণে লোকসান কমানো কঠিন হবে।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রাজশাহী চিনিকল

রাজশাহীর হরিয়ানে ১৯৬২ সালে রাজশাহী চিনিকলের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৯৬৫ সালে তা শেষ হয়। চিনিকলটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ২০ হাজার মেট্রিক টন। ১৯৭২ সালে জাতীয়করণের পরও একসময় প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক ছিল। তবে আশির দশকের শেষ দিক থেকে উৎপাদন কমতে শুরু করে। একপর্যায়ে ধারাবাহিক লোকসানের কারণে প্রতিষ্ঠানটি রুগ্‌ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সচল রাখতে প্রতিবছর নতুন করে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তা অর্জন করা যাচ্ছে না। একদিকে আখের অভাব, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের বিশাল ব্যবধান—সব মিলিয়ে রাজশাহী চিনিকলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

এ অবস্থায় আগামী ১৩ নভেম্বর নতুন মাড়াই মৌসুম শুরু হতে যাচ্ছে। ৬০ দিন উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ, তা বাস্তবায়ন করতে হলে পর্যাপ্ত আখ সংগ্রহ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যথায় হাজার কোটি টাকার পুঞ্জীভূত লোকসানের বোঝা আরও ভারী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!