ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবিতে চলমান পোশাক শ্রমিকদের অসন্তোষ, সংঘর্ষ ও বিভিন্ন স্থানে অস্থিরতার মধ্যে শ্রমিকদের দ্রুত কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সদ্য গঠিত মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার। তিনি বলেছেন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সম্মানজনক সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে তাঁরা আশা করছেন। নতুন মজুরি জানুয়ারি মাসের বেতনের সঙ্গে কার্যকর করার প্রত্যাশাও জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শ্রমিকদের উদ্দেশে এ আহ্বান জানান বাবুল আখতার। একই সঙ্গে তিনি অন্যের উসকানি বা প্ররোচনায় পড়ে কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি না করার অনুরোধ জানান।
বাবুল আখতার বলেন, ‘শ্রমিক ভাইদের অনুরোধ করছি, আপনারা কাজে ফিরে যান। অন্য কারও উসকানিতে বা প্ররোচনায় পড়ে নিজেদের শিল্পকারখানা ধ্বংস করবেন না। যেহেতু কোনো ফেডারেশন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ধর্মঘট ডাকেনি, তাই কেউ অন্যায়-অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে বিপদে পড়লে ফেডারেশনগুলোর সাহায্য পাবেন না।’
তিনি জানান, বর্তমান মজুরি কাঠামোর তিন বছর মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হবে। এর আগেই শ্রমিকদের জন্য গ্রহণযোগ্য ও সম্মানজনক একটি সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে। নতুন মজুরি জানুয়ারি মাসের বেতনের সঙ্গে কার্যকর হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
এ সময় আন্দোলনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া সাধারণ শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের হয়রানি না করে মুক্তি দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি নিয়ে আলোচনার পথ খোলা রাখা এবং পরিস্থিতি শান্ত করা জরুরি।
আন্দোলনকারীরা কাজে না ফিরলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বাবুল আখতার বলেন, সরকার ও মালিকপক্ষ যে ব্যবস্থা নেবে, সে বিষয়ে তাঁদের সমর্থন থাকবে।
সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কঠোর অবস্থানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
এদিকে শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে সোমবার সাভারের আশুলিয়া ও গাজীপুরের নাওজোড় এলাকায় সংঘর্ষ এবং পুলিশের গাড়ি ও একটি কাভার্ড ভ্যানে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও যারা শ্রমিক আন্দোলনের নামে সড়ক-মহাসড়কে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, তারা কখনোই শ্রমিকদের বন্ধু হতে পারে না। তাদের ভিন্ন স্বার্থ থাকতে পারে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড কঠোর হাতে দমন করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বেশির ভাগই বহিরাগত। তবে তাঁর এ বক্তব্যের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বা আটক ব্যক্তিদের পরিচয় আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়নি।
তিনি উল্লেখ করেন, শ্রমিকদের মজুরি-সংক্রান্ত দাবি নিরসনে গঠিত বোর্ডে শ্রমিক ও মালিক—উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। ফলে আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার ন্যায়সংগত সমাধান সম্ভব। এ জন্য শ্রমিকদের শান্ত থাকার পাশাপাশি নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং রপ্তানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখার স্বার্থে শিল্পকারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখা জরুরি। কোনো ধরনের উসকানি বা সহিংসতায় জড়িত না হয়ে আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায়ের চেষ্টা করা উচিত।
মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনার দিকে তাকিয়ে শ্রমিকরা
পোশাক খাত দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস। এ খাতে শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন, সরবরাহ ও রপ্তানি কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি, অন্যদিকে শিল্পকারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মজুরি বোর্ডের আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিক ও মালিক—উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত আসবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
বাবুল আখতারের বক্তব্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরের মধ্যেই নতুন মজুরি নিয়ে সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে এবং জানুয়ারির বেতনের সঙ্গে তা কার্যকরের প্রত্যাশা রয়েছে। তবে নতুন মজুরির পরিমাণ, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
ফলে শ্রমিকদের কাজে ফেরানো, চলমান অসন্তোষ নিরসন এবং নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে মজুরি বোর্ডের পরবর্তী আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

