ঢাকা বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬

menu

সিসিটিভি, এআই ক্যামেরা ও গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যেও থামছে না শাহজালালে স্বর্ণ চোরাচালান

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: নভেম্বর ৩, ২০২৬, ০৯:২৪ এএম

সিসিটিভি, এআই ক্যামেরা ও গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যেও থামছে না শাহজালালে স্বর্ণ চোরাচালান

ছবিঃ সংগৃহীত

রানওয়ে থেকে হ্যাঙ্গার গেট, উড়োজাহাজের অ্যাপ্রন থেকে ইমিগ্রেশন এবং ইমিগ্রেশন পেরিয়ে কাস্টমসের গ্রিন চ্যানেল—হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে রয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, অত্যাধুনিক স্ক্যানার ও গোল্ড ডিটেকশন মেশিন। যাত্রীদের গতিবিধির ওপর নজর রাখছেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, কাস্টমস ও নিরাপত্তা বিভাগের অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা। তারপরও থামছে না স্বর্ণ চোরাচালান। কখনো যাত্রীর শরীরে, কখনো জুতার ভেতরে, আবার কখনো উড়োজাহাজের কার্গো হোল্ড বা বিভিন্ন সরঞ্জামের আড়ালে দেশে ঢুকছে স্বর্ণের চালান।

সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা, নজরদারির কার্যকারিতা এবং চোরাচালান চক্রের নেটওয়ার্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকলেও চোরাকারবারিরা কৌশল পরিবর্তন করে পাচারের চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ করে যাত্রীদের পাশাপাশি বিমানবন্দরে কর্মরত কিছু অসাধু ব্যক্তিকে বাহক হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগও সামনে এসেছে।

সবশেষ গত ২৮ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চীনের দুই যাত্রীর কাছ থেকে প্রায় ১২ কেজি পেস্ট আকারের স্বর্ণ উদ্ধার করে ঢাকা কাস্টমস হাউসের প্রিভেনটিভ টিম। বিকেল সোয়া ৫টার দিকে তাঁদের শরীরে লুকানো অবস্থায় এসব স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য ২৪ কোটি টাকা।

এর আগে গত ৪ অক্টোবর বিমানবন্দরের রানওয়ে এলাকায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুই কর্মীর জুতার ভেতর থেকে ৮০টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করেন শুল্ক গোয়েন্দারা। এসব স্বর্ণের মোট ওজন ছিল ৯ দশমিক ৩৪ কেজি। আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

পরপর এসব ঘটনায় স্পষ্ট হচ্ছে, কঠোর নজরদারি ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও চোরাচালানের চেষ্টা বন্ধ হয়নি। তবে স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনাগুলো নজরদারির ব্যর্থতা প্রমাণ করে কি না, তা নির্ধারণে প্রতিটি ঘটনার তদন্ত, ব্যবহৃত নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রযুক্তির নজরদারির মধ্যেও কীভাবে ঢুকছে স্বর্ণ

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজ থেকে নামার পর একজন যাত্রী বিমানবন্দর ত্যাগ করা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে নজরদারির আওতায় থাকেন। বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরার পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় রয়েছে এআই প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরা। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে মুখ শনাক্তকরণসহ সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের সুযোগ রয়েছে।

কোনো ব্যক্তি আগে স্বর্ণ বা অন্য চোরাচালানের পণ্যসহ আটক হয়ে থাকলে তাঁর পরিচিতি শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করার ব্যবস্থাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া যাত্রী ও মালামাল তল্লাশিতে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক স্ক্যানার এবং স্বর্ণ শনাক্তকরণ যন্ত্র।

তারপরও এসব ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে কি না কোনো দুর্বলতা, নাকি পাচারকারীরা নজরদারির ফাঁকফোকর কাজে লাগাচ্ছেন—তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে বিমানবন্দরের প্রবেশ, অবস্থান, মালামাল পরিবহন ও বের হওয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের মধ্যে সমন্বয় এবং নিরাপত্তা প্রটোকল যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, চোরাকারবারিরা জানেন, বিমানবন্দরে স্বর্ণসহ ধরা পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। তারপরও তাঁরা পাচারের চেষ্টা করছেন। যাত্রীদের পাশাপাশি বিমানবন্দরে কর্মরত কিছু ব্যক্তিকেও বাহক হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁদের কেউ কেউ আটকও হয়েছেন। তবে কিছু চালান কীভাবে নজরদারি এড়িয়ে বাইরে চলে যাচ্ছে, সেটিও তদন্তের বিষয়।

বাহক আটক, আড়ালে মূল কারবারিরা

স্বর্ণ চোরাচালানের তদন্তে বড় একটি বাধা হলো বাহক ও মূল কারবারির মধ্যে যোগাযোগের সীমিত তথ্য পাওয়া। সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, চোরাচালান চক্রের সদস্যরা অনেক ক্ষেত্রে এমন পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যাতে স্বর্ণ বহনকারী ব্যক্তি চালানের প্রকৃত মালিক কিংবা পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে না পারেন।

এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাহককে নির্দিষ্ট কোড দেওয়া হয়। বিমানবন্দরের বাইরে ওই কোড ব্যবহার করে স্বর্ণ হস্তান্তর করা হয়। ফলে বাহককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও তিনি অনেক সময় স্বর্ণের মূল মালিক, অর্থের উৎস কিংবা গন্তব্য সম্পর্কে কার্যকর তথ্য দিতে পারেন না।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হলে চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বাহক গ্রেপ্তার হলেও তাঁদের পেছনে থাকা সংগঠক, অর্থদাতা, সংগ্রাহক ও বিতরণকারীদের শনাক্ত করা না গেলে পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয় না।

তাই শুধু স্বর্ণ উদ্ধারের পরিমাণ বাড়ানো নয়, চালানের উৎস, অর্থায়ন, যোগাযোগের মাধ্যম, বিমানবন্দরের ভেতরে-বাইরে সহযোগীদের ভূমিকা এবং স্বর্ণের চূড়ান্ত গন্তব্য শনাক্ত করাকেও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী পরিচালক কাজী আল মাসুম বলেন, তাঁদের নজরদারি কমেনি। বরং নজরদারির কারণেই বড় বড় স্বর্ণের চালান আটক করা সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, যাত্রীদের পাশাপাশি বিমানবন্দরে কর্মরত এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তিকেও বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তাঁদের পর্যবেক্ষণে এসেছে। এ ঘটনায় বিমানের কয়েকজন কর্মী গ্রেপ্তারও হয়েছেন। তাঁর মতে, বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত নজরদারি, প্রযুক্তির ব্যবহার ও তল্লাশির কারণে আগের তুলনায় স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তিন বছরে স্বর্ণ উদ্ধারের পরিসংখ্যান

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত কয়েক বছরে স্বর্ণ উদ্ধারের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিমানবন্দরটিতে ২৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। ২০২৫ সালে এ পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮৭ কেজিতে। আর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে ৬০ কেজির বেশি স্বর্ণ।

কাস্টমস প্রিভেনটিভ টিমের রাজস্ব কর্মকর্তা ফারুক আব্দুল্লাহ এ তথ্য জানিয়ে বলেন, নির্দিষ্ট সময় পরপর উদ্ধার করা স্বর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়। সর্বশেষ গত ৭ অক্টোবর ২১ কেজি স্বর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

তবে স্বর্ণ উদ্ধারের পরিমাণকে শুধু চোরাচালান বৃদ্ধির সরাসরি সূচক হিসেবে দেখা যায় না। নজরদারি, তল্লাশি, অভিযানের সংখ্যা এবং শনাক্তকরণ সক্ষমতার পরিবর্তনও উদ্ধার করা স্বর্ণের পরিমাণে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই চোরাচালানের প্রকৃত প্রবণতা বুঝতে উদ্ধারসংক্রান্ত পরিসংখ্যানের পাশাপাশি আটক ব্যক্তি, মামলার অগ্রগতি, পুনরাবৃত্ত অপরাধ এবং চক্র শনাক্তের তথ্যও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

যেসব পথে আসছে স্বর্ণের চালান

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছেন। যাত্রীর শরীর, জুতা, শার্টের কলার, লাগেজ ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ভেতরে স্বর্ণ লুকিয়ে আনার নজির রয়েছে। এ ছাড়া ফলের চালান, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, ল্যাপটপের ব্যাটারি, ট্রলির হাতলসহ বিভিন্ন পণ্য বা সরঞ্জামের আড়ালেও স্বর্ণ আনার ঘটনা সামনে এসেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, চোরাচালান চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে বাংলাদেশে থাকা সহযোগীদের মাধ্যমে চালান গ্রহণ ও বিতরণের ব্যবস্থা করে থাকেন। তবে প্রতিটি ঘটনায় ব্যবহৃত রুট, পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।

গোয়েন্দা সূত্রগুলোর মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে আসা স্বর্ণের চালান বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে। এ ছাড়া সৌদি আরব, ওমান, কুয়েত ও কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা যাত্রীদের গতিবিধিও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে আসা যাত্রীদের ওপরও নজরদারি চালানো হয়।

তবে নির্দিষ্ট কোনো দেশ থেকে আসা সব যাত্রীকে সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারির ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য, যাত্রাপথ, আচরণ ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক উপাদান বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

অক্টোবরেই একাধিক চালান উদ্ধার

চলতি বছরের অক্টোবরের শুরুতেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একাধিক স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে।

গত ৩ অক্টোবর এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) পৃথক তিনটি অভিযানে সাতজনকে প্রায় ৭৮১ গ্রাম স্বর্ণালংকারসহ আটক করে। পরদিন ৪ অক্টোবর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুই কর্মীর কাছ থেকে ৯ দশমিক ৩৪ কেজি ওজনের ৮০টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়।

এরপর ২৮ অক্টোবর চীনের দুই যাত্রীর শরীরে লুকানো অবস্থায় প্রায় ১২ কেজি পেস্ট আকারের স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা সামনে আসে। এসব ঘটনায় যাত্রী এবং বিমানবন্দরে কর্মরত ব্যক্তিদের—উভয় শ্রেণিকেই বাহক হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ তদন্তের গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

এ ছাড়া এর আগের কয়েকটি বড় চালান উদ্ধারের ঘটনাও বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ২ জুলাই একটি উড়োজাহাজের কার্গো হোল্ড থেকে ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। ১৯ জুলাই ফলের চালানের আড়ালে উদ্ধার করা হয় ১৬ কেজি স্বর্ণ। অন্যদিকে, গত ২৮ মার্চ দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেট প্যানেল থেকে ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।

এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা ও চালানের উৎস শনাক্তে তদন্ত হয়েছে বা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে প্রতিটি ঘটনার তদন্তের অগ্রগতি ও চূড়ান্ত ফলাফল আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

মামলার তদন্তে মিলছে না সব প্রশ্নের উত্তর

বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম বলেন, স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় থানায় মামলা হলে পুলিশ তা তদন্ত করে। আসামিদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। তদন্তে স্বর্ণের মালিক, চালানের উৎস এবং গন্তব্য সম্পর্কে তথ্য জানার চেষ্টা করা হয়।

তিনি বলেন, সব ঘটনায় আশানুরূপ তথ্য পাওয়া যায় না। তবে দু-একটি ঘটনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কার্গোতে স্বর্ণ উদ্ধারের একটি ঘটনায় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, বাহকের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে পুরো চক্র শনাক্ত করা কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন আর্থিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ, ফোন ও যোগাযোগের সূত্র যাচাই, বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট ফ্লাইট, কার্গো ও মালামাল হস্তান্তরের নথি পরীক্ষা। একই সঙ্গে একাধিক ঘটনায় একই ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা যোগাযোগের সূত্র পাওয়া যায় কি না, তা বিশ্লেষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

কাস্টমস ও এপিবিএনের বক্তব্য

ঢাকা কাস্টমস হাউসের কমিশনার রইছ উদ্দীন বলেন, বিমানবন্দরের সর্বত্র নজরদারি রয়েছে। চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে আগের তুলনায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিমানবন্দরে গোয়েন্দা তৎপরতা ও তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোকেও কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে বলে তিনি জানান।

এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের পুলিশ সুপার (অপারেশন্স) মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান বলেন, বিমানবন্দর এলাকায় চুরি ও অন্যান্য অপরাধ দমনে এপিবিএন সক্রিয় রয়েছে। বিমানবন্দরকে ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ, জনহয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড, চুরি ও চোরাচালান প্রতিরোধে তাদের অভিযান ও কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক অপরাধ প্রতিরোধে বিভিন্ন সংস্থার অভিযান ও নজরদারি চলছে। তবে ধারাবাহিকভাবে স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা দেখাচ্ছে, চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ পর্যালোচনা করা জরুরি।

চোরাচালান বন্ধে প্রয়োজন নেটওয়ার্ক শনাক্ত

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালান প্রতিরোধে শুধু বাহক আটক বা স্বর্ণ উদ্ধারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। চোরাচালানের অর্থদাতা, সংগঠক, সংগ্রাহক ও বিতরণকারীদের শনাক্ত করে পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে। এ জন্য কাস্টমস, শুল্ক গোয়েন্দা, এপিবিএন, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, ইমিগ্রেশন এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।

একই সঙ্গে কার্গো ব্যবস্থাপনা, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, নিরাপত্তা শাখা এবং উড়োজাহাজের ভেতর-বাইরে পণ্য পরিবহনের প্রতিটি ধাপে নজরদারি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের নিয়মিত বদলি ও রোটেশন, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিভিত্তিক তল্লাশি এবং সিসিটিভি ফুটেজের কার্যকর ব্যবহারও নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

এ ছাড়া আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুধু তাৎক্ষণিক চালান নয়, আগের ও পরবর্তী চালানের সঙ্গে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। একই চক্র বারবার একই পদ্ধতি ব্যবহার করছে কি না, কিংবা বিভিন্ন বাহকের পেছনে একই অর্থদাতা বা সংগঠক রয়েছেন কি না—এ ধরনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে তদন্তে অগ্রগতি আসতে পারে।

সব মিলিয়ে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান থাকা সত্ত্বেও স্বর্ণ উদ্ধারের ধারাবাহিক ঘটনা চোরাচালান প্রতিরোধের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। নজরদারি জোরদারের পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করা, অভ্যন্তরীণ সহযোগিতার অভিযোগ তদন্ত করা এবং বাহকের পেছনে থাকা মূল কারবারিদের শনাক্ত করতে পারলেই চোরাচালানের নেটওয়ার্ক ভাঙার পথ আরও সুগম হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code

রাজস্ব বার্তা থেকে আরও পড়ুন

banner
Link copied!