ঢাকা বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬

menu

শীতের আগমনী বার্তায় পাঁচবিবিতে খেজুর রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা, গুড় বিক্রিতে মিলছে আশার আলো

মোঃ বাবুল হোসেন, জয়পুরহাট জেলা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: নভেম্বর ৪, ২০২৬, ১১:৪০ এএম

শীতের আগমনী বার্তায় পাঁচবিবিতে খেজুর রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা, গুড় বিক্রিতে মিলছে আশার আলো

ছবিঃ সংগৃহীত

শীতের আগমনী বার্তা জানান দিচ্ছে প্রকৃতি। ভোরের হালকা কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ায় গ্রামবাংলায় শুরু হয়েছে শীতের প্রস্তুতি। আর শীত এলেই বাংলার ঘরে ঘরে যে ঐতিহ্যের সুবাস ছড়িয়ে পড়ে, তার অন্যতম খেজুরের রস ও গুড়। জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলায় ইতোমধ্যে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন গাছিরা। বিকেল হলেই খেজুরগাছে মাটির হাঁড়ি বা ভাঁড় ঝুলিয়ে দেওয়া এবং ভোরে গাছ থেকে রস নামানোর দৃশ্য জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত অর্ধশত স্থানে রাজশাহী জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা গাছিরা অস্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছেন। খেজুরপাতা দিয়ে তৈরি ছোট ছোট ঘরে চলছে তাদের মৌসুমি কর্মযজ্ঞ। কেউ গাছের পরিচর্যা করছেন, কেউ রস সংগ্রহের জন্য গাছ প্রস্তুত করছেন, আবার কেউ সংগৃহীত রস মাটির চুলায় জ্বাল দিয়ে তৈরি করছেন সুস্বাদু খেজুরের গুড়।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার ধরঞ্জী ইউনিয়নের কোতোয়ালীবাগ গ্রামে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির জন্য অস্থায়ী বসতি গড়েছেন কয়েকজন গাছি। রাজশাহীর বাঘা পৌরসভার দক্ষিণ মিলিকপাড়া মহল্লা থেকে এসেছেন হামিদুল ইসলামসহ তিনজন। কোতোয়ালীবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে খেজুরপাতা দিয়ে তৈরি করেছেন থাকার ঘর। ঘরের পাশেই তৈরি করা হয়েছে রস জ্বাল দেওয়ার জন্য দুটি মাটির চুলা। সেখানেই চলছে রস থেকে গুড় তৈরির প্রস্তুতি।

হামিদুল ইসলাম জানান, প্রতিবছর শীতের শুরুতে তারা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির কাজ করেন। গত মৌসুমেও তারা পাঁচবিবিতে এসেছিলেন। এবারও এসেছেন। রাস্তার পাশের সরকারি জায়গা ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি মিলিয়ে প্রায় ১৬০টি খেজুরগাছ রস সংগ্রহের উপযোগী করে প্রস্তুত করেছেন।

তিনি বলেন, ‘এখনো শীতের তীব্রতা তেমন বাড়েনি। তাই গাছে রসও তুলনামূলক কম হচ্ছে। শীত যত বাড়বে, রসের পরিমাণও তত বাড়বে। তখন প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ কেজি পর্যন্ত গুড় তৈরি করা সম্ভব হবে।’

গাছিরা জানান, খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য প্রথমে গাছের মাথার অংশ পরিষ্কার করে নির্দিষ্ট জায়গায় চাঁছা হয়। এরপর সেখানে নল বসিয়ে নিচে মাটির হাঁড়ি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণত বিকেলে হাঁড়ি বসানো হয় এবং পরদিন ভোরে সেই হাঁড়িতে জমা হওয়া রস সংগ্রহ করা হয়। পরে রস বড় পাত্রে নিয়ে মাটির চুলায় দীর্ঘ সময় জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় গুড়। রসের মান ও আবহাওয়ার ওপর গুড়ের স্বাদ এবং উৎপাদন নির্ভর করে।

উপজেলার উচাই গ্রামে গুড় তৈরির কাজে আসা হারেছ উদ্দিন জানান, প্রতি কেজি খেজুরের গুড় তৈরি করতে প্রায় ৭ থেকে ৮ কেজি রস প্রয়োজন হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে একটি গাছ থেকে প্রতিদিন ৫ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত রস পাওয়া সম্ভব। এবার তিনি প্রায় ১২০টি খেজুরগাছ রস সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত করেছেন।

হারেছ উদ্দিন বলেন, রস সংগ্রহ, জ্বালানি ও শ্রমিকের খরচ রয়েছে। তবে মৌসুমে ভালো উৎপাদন হলে এসব খরচ বাদ দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আয় করা যায়। শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রসের উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।

প্রতি কেজি গুড় বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায়

খেজুরের রস থেকে তৈরি গুড়ের চাহিদা স্থানীয় বাজারে বরাবরই বেশি। বিশেষ করে শীতকালে খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি পিঠা, পায়েস, ক্ষীর ও নানা ধরনের মুখরোচক খাবারের কদর বাড়ে। এ কারণে মৌসুমের শুরু থেকেই গাছিদের কাছ থেকে গুড় কিনতে ভিড় করছেন স্থানীয় ক্রেতারা।

বর্তমানে পাঁচবিবিতে প্রতি কেজি খেজুরের গুড় প্রায় ১৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গাছিরা সরাসরি ক্রেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন হাটবাজার ও দোকানে পাইকারি দরে গুড় বিক্রি করছেন। অনেকে আবার গুড় তৈরির পুরো প্রক্রিয়া নিজের চোখে দেখে খাঁটি গুড় সংগ্রহ করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা কোতোয়ালীবাগ গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, গাছিরা এলাকায় আসায় তারা তুলনামূলক তাজা ও খাঁটি খেজুরের গুড় কেনার সুযোগ পাচ্ছেন। বাজার থেকে কেনা গুড়ে অনেক সময় ভেজাল বা চিনি মেশানোর অভিযোগ থাকে। কিন্তু গাছিদের সামনে গুড় তৈরি হতে দেখলে মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। শীতের সকালে এই গুড় দিয়ে তৈরি পিঠা খাওয়ার আনন্দই আলাদা।

খেজুরগাছ কমে যাওয়ায় হুমকিতে ঐতিহ্যবাহী পেশা

খেজুরের রস ও গুড় শুধু গ্রামবাংলার খাদ্যসংস্কৃতির অংশ নয়, এটি বহু মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থান ও জীবিকারও উৎস। প্রতিবছর শীত মৌসুমে বিভিন্ন জেলা থেকে গাছিরা এক এলাকায় অন্য এলাকায় ছুটে যান। কয়েক মাসের পরিশ্রমে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করে পরিবারের সারা বছরের আয়ের একটি অংশ জোগাড় করেন তারা।

তবে দিন দিন খেজুরগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এ পেশা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বসতবাড়ি, রাস্তা ও কৃষিজমির আশপাশে আগে প্রচুর খেজুরগাছ দেখা গেলেও নানা কারণে অনেক গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। নতুন করে খেজুরগাছ লাগানোর প্রবণতাও আগের তুলনায় কম। ফলে পর্যাপ্ত গাছ না থাকায় অনেক গাছিকে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় গিয়ে কাজ খুঁজতে হচ্ছে।

গাছিদের মতে, খেজুরগাছ সংরক্ষণ, নতুন চারা রোপণ, গাছিদের প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে সরকারি সহায়তা দেওয়া গেলে এ ঐতিহ্যবাহী পেশাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। পাশাপাশি খাঁটি খেজুরের গুড় উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সব মিলিয়ে শীতের আগমনে পাঁচবিবিতে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। গাছিদের ব্যস্ততা, মাটির চুলায় রস জ্বাল দেওয়ার দৃশ্য আর নতুন গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণে গ্রামবাংলার চিরচেনা শীতের ঐতিহ্য ফিরে আসছে। তবে এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে খেজুরগাছ সংরক্ষণ ও গাছিদের পেশাগত নিরাপত্তায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!