ঢাকা রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬

menu

সবুজ ধানখেতের বুকে সাদা-গোলাপি পদ্মের মেলা, মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে আটাইকিরি বিল

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: অক্টোবর ১১, ২০২৬, ১০:১৬ এএম

সবুজ ধানখেতের বুকে সাদা-গোলাপি পদ্মের মেলা, মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে আটাইকিরি বিল

ছবিঃ সংগৃহীত

আশ্বিনের উজ্জ্বল দুপুর। শরতের রোদে ঝলমল করছে গ্রামীণ সড়কের দুই পাশের বিস্তীর্ণ আমন ধানের খেত। যত দূর চোখ যায়, সবুজের সমারোহ। সেই সবুজের বুক চিরে দূর থেকে চোখে পড়ে অন্য রঙের এক অপরূপ দৃশ্য। মনে হয়, প্রকৃতি যেন সবুজ ক্যানভাসে নিজের হাতে এঁকেছে সাদা-গোলাপি রঙের নান্দনিক ছবি। কাছে যেতেই দেখা যায়, পানির ওপর মাথা তুলে ফুটে আছে অসংখ্য পদ্মফুল।

এটি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাগাবলা ইউনিয়নের রতনপুর-বীরগাঁও গ্রামের আটাইকিরি পদ্মবিল। জেলা শহর থেকে সড়কপথে প্রায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জলাভূমি বর্ষা ও শরৎকালে পদ্মফুলের অপরূপ সৌন্দর্যে সেজে ওঠে। বিস্তীর্ণ ধানখেতের মাঝখানে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বিলটি যেন গ্রামীণ বাংলার চিরচেনা সৌন্দর্যের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।

গত বুধবার দুপুরে বিলটিতে গিয়ে দেখা যায়, পানির ওপর ছড়িয়ে আছে বড় বড় সবুজ পদ্মপাতা। সেগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ফুটে আছে সাদা ও গোলাপি পদ্মফুল। কোথাও পূর্ণ প্রস্ফুটিত ফুল, কোথাও আবার ফুটতে শুরু করেছে ছোট-বড় কলি। ফুলের পাশে দেখা যাচ্ছে পদ্মফল। কোনোটি পরিপক্ব, কোনোটি এখনো কচি। পদ্মের ফাঁকে ফাঁকে ফুটে আছে সাদা শাপলাও।

চারপাশে বিস্তীর্ণ আমন ধানের খেত, মাঝখানে পদ্মে ঢাকা জলাভূমি আর তার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু বাতাস—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ।

ধানখেতের মাঝখানে পদ্মের রাজ্য

আটাইকিরি পদ্মবিলে পৌঁছাতে হলে গ্রামের পাকা সড়ক থেকে নেমে ধানখেতের সরু আলপথ ধরে এগোতে হয়। কয়েক দিন বৃষ্টি না হওয়ায় আলগুলো তখন শুকনো। ঘাসে ঢাকা পথের কোথাও কোথাও জমির আগাছা তুলে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। রোদে শুকিয়ে সেগুলো খড়ের মতো হয়ে আছে।

এই গ্রামীণ পথ ধরে কিছুটা এগোলেই চোখের সামনে খুলে যায় পদ্মফুলের এক বিস্তৃত জগৎ। দূর থেকে যে রঙের ছোপ চোখে পড়ে, কাছে গেলে তার সৌন্দর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিলের পাড়ের দিকে পদ্মপাতা, শাপলা ও শালুক বেশি দেখা গেলেও ফুলের আধিক্য মাঝের দিকে। সেখানে পানির ওপর মাথা তুলে থাকা সাদা-গোলাপি পদ্মফুলগুলো বাতাসে দুলছে। দু-একটি ভ্রমর ফুলের আশপাশে উড়ছে। কোথাও পদ্মপাতার ফাঁকে জমে আছে পানি, কোথাও পাতার ওপর রোদের ঝিলিক।

প্রকৃতির এই দৃশ্য শহরের কোলাহল থেকে দূরে এক শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশের অনুভূতি দেয়। বিশেষ করে শরতের নীল আকাশ আর সবুজ ধানখেতের পটভূমিতে পদ্মফুলের সৌন্দর্য যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

বর্ষার শুরু থেকে ফোটে পদ্ম, থাকে বোরো চাষের আগপর্যন্ত

স্থানীয় তরুণ নয়ন সরকার জানান, জলাভূমিটির নাম আটাইকিরি পদ্মবিল। বর্ষার শুরু থেকেই এখানে পদ্মফুল ফুটতে থাকে। বোরো ধানের চাষ শুরু হওয়ার আগপর্যন্ত বিলে পদ্ম দেখা যায়। প্রতিবছরই প্রাকৃতিকভাবে এই বিলে প্রচুর পদ্মফুল ফোটে।

বিলের পানিতে নেমে নৌকা ঠেলে ঘাস সংগ্রহ করছিলেন নয়ন সরকার। গবাদিপশুর খাবারের জন্য জলাভূমি থেকে ঘাস তুলতে এসেছিলেন তিনি। হাঁটুপানির মধ্যে দিয়ে বিলের আরও গভীরে যাওয়ার সময় তাঁর চারপাশে দেখা যাচ্ছিল অসংখ্য পদ্মপাতা ও ফুল।

নয়ন সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিলের কম পানির অংশের অনেক ফুল ইতিমধ্যে মানুষ তুলে নিয়েছেন। ফলে পাড়ের কাছাকাছি ফুল তুলনামূলক কম দেখা যায়। তবে বিলের গভীরের দিকে এখনো প্রচুর পদ্মফুল রয়েছে।

স্থানীয় মানুষের কাছে বিলটি শুধু সৌন্দর্যের জায়গা নয়; দৈনন্দিন জীবন ও গ্রামীণ পরিবেশেরও একটি অংশ। গবাদিপশুর খাবারের জন্য ঘাস সংগ্রহের মতো কাজে জলাভূমিটি ব্যবহৃত হয়। ফলে প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি স্থানীয় জীবনের সঙ্গেও এর রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক।

পদ্মপাতা, ফুল ও ফল—এক জলজ উদ্ভিদের বৈচিত্র্য

পদ্ম বাংলাদেশের পরিচিত জলজ উদ্ভিদগুলোর একটি। কাদামাটিতে জন্মানো এই উদ্ভিদের মূল বা কন্দ পানির নিচে মাটিতে থাকে। সেখান থেকে লম্বা ডাঁটা উঠে পানির ওপর পাতা ও ফুল ছড়িয়ে দেয়।

পদ্মপাতা সাধারণত বড়, গোলাকার ও সবুজ। ফুল সাদা কিংবা গোলাপি রঙের হয়ে থাকে। ফুলের সৌন্দর্যের পাশাপাশি পদ্মের ফলও সহজে চোখে পড়ে। ফুলের কেন্দ্রের অংশ থেকেই পদ্মফল তৈরি হয়। পরিপক্ব হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর বীজও বিকশিত হয়।

বর্ষা ও শরৎকালে পদ্মের সৌন্দর্য বিশেষভাবে চোখে পড়ে। অনুকূল পরিবেশে শরৎকালেও প্রচুর ফুল ফোটে এবং কিছু এলাকায় হেমন্ত পর্যন্ত পদ্ম দেখা যায়।

আটাইকিরি বিলে একই সঙ্গে পদ্মের ফুল, কলি, পাতা ও ফল দেখা যাওয়ায় জলজ উদ্ভিদটির জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রকৃতিপ্রেমী ও আলোকচিত্রীদের জন্যও এ ধরনের জলাভূমি আকর্ষণীয় হতে পারে।

জলাভূমি কমে যাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে পদ্মের আবাস

প্রাকৃতিক জলাভূমি পদ্মের মতো জলজ উদ্ভিদের বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। পুরোনো পুকুর, বিল, হ্রদ, হাওর ও অন্যান্য জলাভূমির কাদাময় তলদেশে পদ্ম জন্মাতে পারে। উপযুক্ত পানির গভীরতা, মাটির অবস্থা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ এ উদ্ভিদের বিস্তারে ভূমিকা রাখে।

কিন্তু জলাভূমি ভরাট, প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহে পরিবর্তন এবং আবাসস্থল নষ্ট হওয়ার কারণে অনেক এলাকায় জলজ উদ্ভিদের স্বাভাবিক বিস্তার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। পদ্মের মতো উদ্ভিদ টিকিয়ে রাখতে তাই প্রাকৃতিক জলাশয় সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।

আটাইকিরি পদ্মবিলের মতো জলাভূমি শুধু ফুলের সৌন্দর্যই বাড়ায় না; এগুলো স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশেরও অংশ। জলাশয়ের স্বাভাবিক অবস্থা বজায় থাকলে জলজ উদ্ভিদসহ বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল টিকে থাকার সুযোগ তৈরি হয়।

তাই বিলটির প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় জলাভূমি ভরাট ও দূষণ থেকে বিরত থাকা, প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ বজায় রাখা এবং নির্বিচারে উদ্ভিদ সংগ্রহ নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণ হতে পারে আটাইকিরি পদ্মবিল

মৌলভীবাজারের রতনপুর-বীরগাঁও গ্রামের আটাইকিরি পদ্মবিল স্থানীয়ভাবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের একটি উল্লেখযোগ্য স্থান। বিস্তীর্ণ আমন ধানের খেতের মাঝখানে পদ্মফুলে ভরা জলাভূমিটি গ্রামীণ বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য ও প্রকৃতির রূপ তুলে ধরে।

জেলা শহর থেকে সড়কপথে প্রায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার দূরত্বে হওয়ায় আগ্রহীরা জায়গাটি ঘুরে দেখতে পারেন। তবে বিলের কাছে পৌঁছাতে ধানখেতের আলপথ ব্যবহার করতে হয়। তাই ভ্রমণের সময় স্থানীয় মানুষের জমি ও ফসলের প্রতি যত্নশীল থাকা জরুরি।

প্রকৃতিপ্রেমী, আলোকচিত্রী এবং গ্রামীণ পরিবেশ দেখতে আগ্রহী মানুষের কাছে জায়গাটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বর্ষা ও শরৎকালে পদ্মফুলের উপস্থিতি এ জলাভূমিকে ভিন্ন সৌন্দর্য দেয়।

তবে পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে হলে বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। ফুল ও পাতা নির্বিচারে না তোলা, পানিতে প্লাস্টিক বা অন্য বর্জ্য না ফেলা এবং স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্মে বিঘ্ন না ঘটানো—এসব বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন।

প্রকৃতির সৌন্দর্য বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব সবার

আটাইকিরি পদ্মবিলের সৌন্দর্য শুধু সাদা-গোলাপি ফুলে সীমাবদ্ধ নয়। বিস্তীর্ণ সবুজ ধানখেত, গ্রামীণ আলপথ, পানির ওপর ছড়িয়ে থাকা পদ্মপাতা এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা মিলিয়ে এটি প্রকৃতির এক সামগ্রিক ছবি তুলে ধরে।

শরতের রোদে যখন পদ্মফুলগুলো বাতাসে দুলতে থাকে, তখন মনে হয়, গ্রামবাংলার প্রকৃতি নিজের মতো করে সাজিয়ে রেখেছে এক শান্ত সৌন্দর্যের জগৎ। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে এমন জলাভূমি মানুষকে প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।

কিন্তু এই সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখতে হলে জলাভূমি সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিতে হবে। পদ্মফুলের পাশাপাশি বিলের পানি, কাদামাটি, উদ্ভিদ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সুরক্ষাও জরুরি।

মৌলভীবাজারের আটাইকিরি পদ্মবিল তাই শুধু একটি ফুলে ভরা জলাভূমি নয়; এটি গ্রামীণ বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যেরও একটি সুন্দর নিদর্শন। যথাযথ সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতেও এই বিল শরতের সাদা-গোলাপি পদ্মে প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!