সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি বিদ্রোহীদের হামলার ঘটনায় দুই বাংলাদেশিসহ অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩০৯ জন। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ হতাহতদের সর্বশেষ এ তথ্য জানায়। চলতি সপ্তাহে রিয়াদের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এটি তৃতীয় হামলার ঘটনা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামলার পর বিমানবন্দর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। আহতদের অ্যাম্বুলেন্স ও হেলিকপ্টারে করে বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাসেবা দিতে হাসপাতালগুলোতে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে রিয়াদগামী ফ্লাইটগুলো অন্য বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
নিহতদের মধ্যে দুই বাংলাদেশি, আহত ৩০৯
সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় নিহত ১২ জনের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক এবং দুজন বাংলাদেশি রয়েছেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক নিহত হয়েছেন।
হতাহতের এ ঘটনায় সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে নিহত দুই বাংলাদেশির নাম, পরিচয়, কর্মস্থল কিংবা তাঁদের মরদেহ দেশে পাঠানোর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
আহতদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে। তবে আহতদের জাতীয়তাভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তালিকা এবং চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সতর্কসংকেত ছাড়াই হামলার অভিযোগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার আগে কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। এমনকি সৌদি আরবের সতর্কীকরণ ব্যবস্থাতেও কোনো সংকেত পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে হামলাটি দেশটির নিরাপত্তা ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
গত এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি হিসেবে ঘটনাটিকে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে চলতি সপ্তাহে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আরও দুটি হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলাগুলোতে চারজন নিহত হন। এ ছাড়া বিমানবন্দরের রানওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা সৌদি আরবের একটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে হামলার ধরন, ব্যবহৃত অস্ত্র, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং সৌদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
রিয়াদের সব ফ্লাইট অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়
হামলার পর শনিবার রিয়াদগামী সব ফ্লাইট অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রায় ৮০ লাখ মানুষের শহর রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরের কার্যক্রমও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয় বলে সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় যাত্রী পরিবহন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং বিমান চলাচলের স্বাভাবিক সূচিতে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। তবে কতটি ফ্লাইট বাতিল বা অন্য বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, কতজন যাত্রী আটকা পড়েছেন এবং কখন পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হবে—সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
বিমানবন্দরটি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক যোগাযোগকেন্দ্র হওয়ায় এ ধরনের হামলার প্রভাব দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থায় পড়তে পারে।
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাতের উত্তেজনা
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের সংঘাত রয়েছে। ইয়েমেনের সরকারকে সমর্থন দিয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দেশটিতে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে আসছে। অন্যদিকে, হুতিরা ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে হামলার দাবি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। স্থলযুদ্ধে ইয়েমেন সরকারের বাহিনীকে সহায়তা করতেই এসব অভিযান চালানো হচ্ছে বলে সৌদি আরব ও তার মিত্রদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারের দাবি, হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় শত শত হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে, হুতিদের দাবি, এসব হামলায় নারী ও শিশুসহ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে হুতিদের উত্থাপিত এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে রিয়াদের মতো গুরুত্বপূর্ণ নগরীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার অভিযোগ সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক বিমান চলাচলের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিমানবন্দর বন্ধের দাবি হুতিদের
হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে হুতিদের গণমাধ্যম কার্যালয়ের প্রধান দাবি করেন, তাঁরা রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ করে দিয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনী সোমবার থেকে হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করার পর হুতিরা সৌদি আকাশসীমাকে সামরিক অভিযানের এলাকা ঘোষণা করে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক উড়োজাহাজগুলোকে সৌদি আকাশসীমা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানায় গোষ্ঠীটি।
তবে হুতিদের এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিমানবন্দরের কার্যক্রম কতটা সময় বন্ধ ছিল এবং বিমান চলাচলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্য প্রয়োজন।
হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে অংশ নেবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ওয়াশিংটন বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, তাঁরা বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। সাম্প্রতিক হামলার খবর তাঁরা তখনই পেয়েছেন এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনা করছে, সৌদি আরবের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না কিংবা সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না—তা স্পষ্ট নয়।
হামলার নিন্দা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি এ হামলাকে ‘নিরীহ বেসামরিক মানুষের জীবনের প্রতি চরম অবজ্ঞা’ হিসেবে অভিহিত করেন।
হামলায় বিভিন্ন দেশের নাগরিক নিহত হওয়ায় ঘটনাটি আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বিমানবন্দরের মতো বেসামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগ আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
তবে হামলার দায়, ব্যবহৃত অস্ত্র এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সম্পর্কে সৌদি কর্তৃপক্ষ, হুতি গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। দেশটির রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুই বাংলাদেশির নিহত হওয়ার খবর প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয়, তাঁরা বিমানবন্দরে কী কাজে অবস্থান করছিলেন এবং তাঁদের পরিবারকে অবহিত করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
এ ঘটনায় নিহত বাংলাদেশিদের পরিচয় নিশ্চিত করা, আহত বাংলাদেশি কেউ রয়েছেন কি না তা খোঁজ নেওয়া এবং তাঁদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার অভিযোগ সৌদি আরবের নিরাপত্তা, বেসামরিক বিমান চলাচল এবং ইয়েমেনকে ঘিরে আঞ্চলিক সংঘাতের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে হামলার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, দায় নির্ধারণ এবং হতাহতদের বিষয়ে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও স্বাধীন যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: রয়টার্সের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন।

