ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) ঘোষিত ‘যন্তর মন্তর ২.০’ বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানী নয়াদিল্লিতে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। সম্ভাব্য সহিংসতা ও বড় ধরনের জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের কথা জানিয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে প্রশাসন। বন্ধ রাখা হয়েছে ৪৫টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দুই গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশনে ট্রেন চলাচলও স্থগিত করা হয়েছে।
এ ছাড়া মধ্য দিল্লির একটি বিস্তীর্ণ এলাকায় ২৪ ঘণ্টার জন্য মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিক্ষোভস্থল ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের কথাও বলা হয়েছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) নির্ধারিত এই কর্মসূচিকে ঘিরে দিল্লির কেন্দ্রীয় অংশে যান চলাচল ও জনসাধারণের স্বাভাবিক চলাফেরায় বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এসব বিধিনিষেধের প্রকৃত পরিধি, কার্যকর থাকার সময় এবং বিভিন্ন পরিষেবার সর্বশেষ অবস্থা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

কেন বিক্ষোভ, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে সিজেপি। ভোটার তালিকা পুনর্নিরীক্ষণ বা ‘স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে এই কর্মসূচি পালনের কথা বলা হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা পুনর্নিরীক্ষণ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে ভোটাধিকার ও নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করছেন তাঁরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মসূচিতে সিজেপির নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি ছাত্র সংগঠন, সাধারণ নাগরিক ও বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের লোকজন অংশ নিতে পারেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্ষোভকারীদের দিল্লিতে আসার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।

তবে ভোটার তালিকা পুনর্নিরীক্ষণ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম বা ভোট কারচুপির অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন তথ্য সরবরাহ করা হয়নি। ফলে এসব অভিযোগকে আন্দোলনকারীদের দাবি হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
মধ্য দিল্লিতে ২৪ ঘণ্টা মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মধ্য দিল্লির নির্দিষ্ট এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাত ১০টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার জন্য জনপথ ও কর্তব্য পথের মোড়কে কেন্দ্র করে চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলের ডেপুটি কমিশনার মনিষী চন্দ্রের জারি করা জরুরি বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এ ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা, কর্মজীবী মানুষ ও দর্শনার্থীদের মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারে সমস্যা হতে পারে। অনলাইন যোগাযোগ, ডিজিটাল পেমেন্ট, যাতায়াতের অ্যাপ এবং জরুরি তথ্য সংগ্রহেও বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে নির্দেশটি ঠিক কোন কোন মোবাইল অপারেটর ও পরিষেবার ক্ষেত্রে কার্যকর এবং নির্দিষ্ট এলাকার সীমানা কতটুকু—তা সরকারি বিজ্ঞপ্তি থেকে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
২৮ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের দাবি
বিক্ষোভ ঘিরে রাজধানীতে বড় ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (সিএপিএফ) প্রায় ২৩ হাজার সদস্য এবং দিল্লি পুলিশের আরও পাঁচ হাজার সদস্যসহ মোট ২৮ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
যন্তর মন্তর ও এর আশপাশের প্রধান সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের জমায়েত নিয়ন্ত্রণ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়ানোকে এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মধ্য দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা অনুযায়ী বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এর আওতায় জনসমাবেশ, মিছিল ও একাধিক ব্যক্তির জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে।
তবে কোন এলাকায় ঠিক কী ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর, কতজন নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন রয়েছেন এবং নির্দেশের সুনির্দিষ্ট শর্ত কী—এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
৪৫টি মেট্রো স্টেশনে বিধিনিষেধ, বিপাকে যাত্রীরা
বিক্ষোভস্থলে বড় জমায়েত নিয়ন্ত্রণের জন্য দিল্লি মেট্রোর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্টেশনে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। শুক্রবার রাত ৯টা থেকে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মোট ৪৫টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তালিকায় রাজীব চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, প্যাটেল চক, জনপথ ও মান্ডি হাউসের মতো ব্যস্ত স্টেশনের নাম রয়েছে।
তবে সব মেট্রো পরিষেবা বন্ধ থাকার কথা বলা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে যাত্রীদের এক লাইন থেকে অন্য লাইনে যাওয়ার সুবিধা বা ইন্টারচেঞ্জ চালু রাখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে স্টেশনভেদে বিধিনিষেধের ধরন আলাদা হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে দিল্লির বাসিন্দা, অফিসগামী মানুষ এবং পর্যটকদের যাত্রার আগে দিল্লি মেট্রোরেল করপোরেশনের (ডিএমআরসি) আনুষ্ঠানিক ঘোষণা যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বন্ধ স্টেশনের পরিবর্তে চালু থাকা কাছাকাছি স্টেশন ব্যবহার এবং প্রয়োজনে বাস, ট্যাক্সি বা অটোরিকশার বিকল্প বিবেচনা করতে পারেন যাত্রীরা।
নয়াদিল্লি ও নিজামুদ্দিন স্টেশনে ১০ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল স্থগিত
মেট্রো পরিষেবার পাশাপাশি রেল চলাচলেও বিধিনিষেধের কথা জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার ভোর ৪টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন চলাচল স্থগিত রাখা হয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে চলাচলের কথা থাকা কিছু দূরপাল্লার মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেন যাত্রার প্রারম্ভিক স্টেশন থেকেই বাতিল করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ফলে দূরপাল্লার যাত্রীদের ভ্রমণসূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের ট্রেন ওই দুই স্টেশন থেকে ছাড়ার কথা ছিল অথবা সেখানে পৌঁছানোর কথা ছিল, তাঁদের যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট ট্রেনের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন।
বিকল্প হিসেবে পুরোনো দিল্লি, আনন্দ বিহার টার্মিনাল ও দিল্লি সরাই রোহিল্লা স্টেশনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিকল্প স্টেশন থেকে নির্দিষ্ট ট্রেনে ওঠা বা নামার সুযোগ ট্রেনের রুট ও সময়সূচির ওপর নির্ভর করবে।
টিকিট বাতিল হলে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী ভারতীয় রেলের নির্ধারিত ব্যবস্থায় অর্থ ফেরতের আবেদন করা যেতে পারে।
অ্যাপভিত্তিক পরিবহন ও খাবার সরবরাহে নজরদারির দাবি
প্রতিবেদনে উবার ও ওলার মতো অ্যাপভিত্তিক পরিবহন পরিষেবার ওপর নজরদারির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যন্তর মন্তরমুখী সন্দেহভাজন যাত্রীদের পরিবহন না করার বিষয়ে চালকদের সতর্ক করা হয়েছে।
এ ছাড়া খাবার সরবরাহকারী অ্যাপের বড় অর্ডারগুলোর ওপরও পুলিশ নজর রাখছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব নির্দেশের বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
এ ধরনের পদক্ষেপের খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিবহন ও খাবার সরবরাহ পরিষেবা নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট কোনো নিষেধাজ্ঞা কার্যকর আছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা পরিষেবা প্রদানকারীর কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
দিল্লি সীমান্তে তল্লাশি, খুচরা মদের দোকান বন্ধ
বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লির সঙ্গে হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ ও রাজস্থানের সংযোগপথে তল্লাশিচৌকি বসানোর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্ভাব্য বিক্ষোভকারীদের চলাচল ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ৯ ও ১০ অক্টোবর দিল্লির খুচরা মদের দোকান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে। তবে লাইসেন্সধারী রেস্তোরাঁ, বার ও ক্লাবে মদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে ছাড় থাকার তথ্যও আগের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সরাই কালে খাঁ ও নিউ অশোক নগর নমো ভারত স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কথাও বলা হয়েছে। তবে নমো ভারত রুটের অন্য অংশে পরিষেবা চালু থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছে।
এসব বিধিনিষেধের সময়সীমা ও কার্যকর এলাকার বিষয়ে যাত্রী ও বাসিন্দাদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন।
আন্দোলনকারীদের অনড় অবস্থান, উত্তেজনা ঘিরে উদ্বেগ
প্রতিবেদনে সিজেপি নেতা অভিজিৎ ডিপকের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রশাসনিক বাধা সত্ত্বেও তাঁরা বিক্ষোভ কর্মসূচি চালিয়ে যেতে এবং যন্তর মন্তরের দিকে পদযাত্রা করতে চান।
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্ভাব্য সহিংসতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের দাবির সঙ্গে প্রশাসনের নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপের এই সংঘাত রাজধানীর স্বাভাবিক চলাচলে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মেট্রো স্টেশন বন্ধ, রেল চলাচলে বিরতি এবং ইন্টারনেট পরিষেবায় বিধিনিষেধের কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কাজে ভোগান্তির আশঙ্কা রয়েছে।
সাধারণ মানুষের জন্য কী জানা জরুরি
দিল্লিতে চলাচলকারী বাসিন্দা ও যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যাত্রার আগে পরিবহন পরিষেবার সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করা। মেট্রো, দূরপাল্লার ট্রেন ও নমো ভারত পরিষেবার সময়সূচিতে পরিবর্তন থাকতে পারে।
একই সঙ্গে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ থাকার নির্দেশ কার্যকর এলাকায় থাকলে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা, প্রয়োজনীয় ঠিকানা ও টিকিটের তথ্য সংরক্ষণ এবং জরুরি যোগাযোগ নম্বর সঙ্গে রাখাও সহায়ক হতে পারে।
বিক্ষোভের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে প্রশাসন নতুন নির্দেশনা দিতে পারে। তাই গুজব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অযাচাইকৃত তথ্যের ওপর নির্ভর না করে দিল্লি পুলিশ, ডিএমআরসি ও ভারতীয় রেলের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।

