ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বিরোধীদের বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে দিল্লি পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজধানীর ১৫টি জেলা থেকে অপরাধমূলক রেকর্ড থাকা আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ জনকে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিক্ষোভে লোকসমাগম ঘটাতে পারেন বা সাধারণ মানুষকে কর্মসূচিতে অংশ নিতে উৎসাহিত করতে পারেন—এমন ব্যক্তিদের গতিবিধির ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) যন্তর মন্তরে কাকরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরে দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধীদের এই বিক্ষোভের কারণে রাজধানীর গণপরিবহন ও যান চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
পুলিশের পাশাপাশি দিল্লি মেট্রোরেল করপোরেশন (ডিএমআরসি) ও ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষও বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। বিক্ষোভস্থলে বড় দলকে পৌঁছাতে বাধা দেওয়া এবং সম্ভাব্য যানজট নিয়ন্ত্রণে রাখতে কয়েকটি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন চলাচল স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নিরাপত্তা জোরদার, আটক ৩০ থেকে ৪০ জন
দিল্লি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার অংশ হিসেবে রাজধানীর ১৫টি জেলা থেকে অপরাধমূলক রেকর্ড থাকা আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ জনকে আটক করা হয়েছে। বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে জন্য সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, বিক্ষোভে লোকসমাগম ঘটাতে পারেন কিংবা সাধারণ মানুষকে কর্মসূচিতে অংশ নিতে প্ররোচিত করতে পারেন—এমন কয়েকজনের ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। তাঁদের চলাফেরার পাশাপাশি বাসভবনের আশপাশেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, বিক্ষোভস্থল এবং যাতায়াতের প্রধান পথগুলোতে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ বা তাঁদের পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ, সচল থাকবে অন্যান্য পরিষেবা
বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লির ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়েছে। বিক্ষোভস্থলে বড় জমায়েত ঠেকানো এবং আশপাশের এলাকায় জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে সব মেট্রো পরিষেবা বন্ধ করা হয়নি। নয়াদিল্লি মেট্রো রেলস্টেশন ছাড়া সংশ্লিষ্ট অন্য স্টেশনগুলোতে যাত্রীদের এক লাইন থেকে অন্য লাইনে যাওয়ার সুবিধা চালু রাখার কথা বলা হয়েছে। অন্যান্য মেট্রো পরিষেবাও সচল থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
যেসব স্টেশনে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, সেগুলোর প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ থাকতে পারে। ফলে যাত্রীদের যাত্রাপথ নির্ধারণের আগে ডিএমআরসির আনুষ্ঠানিক যোগাযোগমাধ্যমে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
যাত্রীদের বিকল্প মেট্রো স্টেশন ব্যবহারের পরামর্শ
মেট্রো স্টেশন বন্ধ থাকায় যাত্রীদের বিকল্প যাতায়াতব্যবস্থা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বন্ধ স্টেশনের কাছাকাছি যেসব স্টেশন চালু থাকবে, সেগুলো ব্যবহার করে যাত্রীরা গন্তব্যে যেতে পারবেন। প্রয়োজনে বাস, ট্যাক্সি বা অটোরিকশার মতো পরিবহনও ব্যবহার করা যাবে।
দিল্লির কেন্দ্রীয় অংশে যানজটের আশঙ্কা থাকায় যাত্রীদের হাতে অতিরিক্ত সময় নিয়ে বের হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিক্ষোভস্থল ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দিয়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিবেচনায় বিকল্প পথ বেছে নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।
মেট্রো স্টেশন পুনরায় চালু হওয়ার সময় এবং পরিষেবা-সংক্রান্ত পরিবর্তনের বিষয়ে ডিএমআরসির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।
নয়াদিল্লি ও নিজামুদ্দিন স্টেশনে ১০ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য যানজট ও নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন রেলওয়ে স্টেশনে শনিবার ভোর ৪টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত টানা ১০ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষ।
এই সময়ের মধ্যে স্টেশন দুটি থেকে যেসব মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেন ছাড়ার কথা ছিল, সেগুলোর যাত্রা শুরুর স্টেশন থেকেই বাতিল করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এ সিদ্ধান্তের ফলে যাত্রীদের ট্রেনযাত্রায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। তাই যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট ট্রেনের সময়সূচি, চলাচলের অবস্থা এবং বাতিলের তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিকল্প রেলস্টেশন ব্যবহার করতে পারবেন যাত্রীরা
নির্ধারিত স্টেশনগুলোতে ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় যাত্রীরা বিকল্প হিসেবে পুরোনো দিল্লি, আনন্দ বিহার টার্মিনাল অথবা দিল্লি সরাই রোহিল্লা স্টেশন ব্যবহার করতে পারেন। তবে এসব স্টেশন থেকে নির্দিষ্ট ট্রেনের যাত্রা বা গন্তব্যের সুবিধা সংশ্লিষ্ট সময়সূচির ওপর নির্ভর করবে।
যেসব যাত্রীর ট্রেন বাতিল হয়েছে, তাঁরা ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ক্যাটারিং অ্যান্ড ট্যুরিজম করপোরেশনের (আইআরসিটিসি) ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী টিকিটের অর্থ ফেরতের আবেদন করতে পারবেন।
যাত্রীদের বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে ট্রেনের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই এবং বিকল্প যাত্রাপথ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দিল্লিতে মদের দোকান বন্ধ, রেস্তোরাঁয় পরিবেশনে ছাড়
বিক্ষোভের পাশাপাশি দিল্লিতে মদ বিক্রির ক্ষেত্রেও সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। দিল্লির আবগারি দপ্তরের ঘোষণা অনুযায়ী, ৯ ও ১০ অক্টোবর রাজধানীর খুচরা মদের দোকানগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় বিপণিবিতানসহ নির্দিষ্ট কিছু আউটলেটে ভারতীয়, বিদেশি ও দেশি মদ বিক্রি বন্ধ থাকবে।
তবে লাইসেন্সধারী রেস্তোরাঁ, বার ও ক্লাবগুলোতে স্বাভাবিক নিয়মে মদ পরিবেশন করা যাবে বলে আবগারি দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ফলে খুচরা বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সব ধরনের মদ পরিবেশন সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি।
নমো ভারত পরিষেবায়ও সাময়িক বিধিনিষেধ
দিল্লির সরাই কালে খাঁ ও নিউ অশোক নগর নমো ভারত স্টেশন দুটি ৯ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর রাত ১০টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে এ সময় দিল্লির আনন্দ বিহার থেকে উত্তর প্রদেশের মোদিপুরাম পর্যন্ত নমো ভারত ট্রেন পরিষেবা পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী চালু থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
ফলে সংশ্লিষ্ট স্টেশন ব্যবহারকারী যাত্রীদের বিকল্প স্টেশন ও যাত্রাপথ সম্পর্কে আগে থেকেই খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
বিক্ষোভ ঘিরে রাজধানীতে বাড়তি সতর্কতা
যন্তর মন্তরের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে নিরাপত্তা, গণপরিবহন ও রেল চলাচলে একাধিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশের সতর্কতামূলক আটক, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধির ওপর নজরদারি, মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রেল চলাচল স্থগিত—সব মিলিয়ে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাড়তি সতর্কতা দেখা যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে দিল্লির বাসিন্দা, কর্মজীবী মানুষ এবং দূরপাল্লার যাত্রীদের যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি। বিশেষ করে মেট্রো ও রেল পরিষেবায় পরিবর্তন থাকায় আগাম পরিকল্পনা করলে ভোগান্তি কমানো সম্ভব।

