দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও আটজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন মোট ১ হাজার ৮৬ জন। শনিবার (১০ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে একজন করে মারা গেছেন। সব মিলিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আটজনের মৃত্যু হয়েছে।
দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃত্যু ১১৫৫
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৫৫ জনে। তাঁদের মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে মারা গেছেন ১০৪ জন। অন্যদিকে, হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ১ হাজার ৫১ জন।
মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ ও জটিলতা প্রতিরোধে দ্রুত শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং টিকাদান কার্যক্রমের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
তবে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সব ঘটনা পরীক্ষায় নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু নয়। তাই নিশ্চিত হাম এবং সন্দেহভাজন হামের কারণে মৃত্যুর হিসাব আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
২৪ ঘণ্টায় সন্দেহভাজন হাম শনাক্ত ৯৫৫ জনের
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯৫৫ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে মোট সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩ হাজার ৮৪৮ জনে।
সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় সংক্রমণ শনাক্ত, রোগীদের পর্যবেক্ষণ এবং আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হামের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে সাধারণত জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ অন্য রোগের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। তাই উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করানো জরুরি।
নিশ্চিত হামে নতুন আক্রান্ত ১৩১ জন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ১৩১ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৩২৮ জনে।
সন্দেহভাজন রোগী এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা এক নয়। সন্দেহভাজন রোগীদের মধ্যে যাঁদের সংক্রমণ পরীক্ষা বা নির্ধারিত চিকিৎসা মানদণ্ডে নিশ্চিত হয়, তাঁদের নিশ্চিত আক্রান্ত হিসেবে গণনা করা হয়।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করা, চিকিৎসার আওতায় আনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যদের থেকে আলাদা রাখার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
হাসপাতালে ভর্তি ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি রোগী
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম সন্দেহে মোট ১ লাখ ৮০ হাজার ৯৪৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৭৩ হাজার ৪৫৪ জন।
হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা রোগীর এই পরিসংখ্যান থেকে সংক্রমণের কারণে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপের বিষয়টি বোঝা যায়। তবে হাসপাতালে ভর্তি ও ছাড়পত্র পাওয়া রোগীর সংখ্যা দিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না; কারণ অনেক রোগী হাসপাতালে ভর্তি না হয়েও চিকিৎসা নিতে পারেন।
শিশুদের সুরক্ষায় টিকাদান ও দ্রুত চিকিৎসা জরুরি
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ানো জীবাণু থেকে অন্য ব্যক্তির সংক্রমণ হতে পারে। বিশেষ করে টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি।
হামের কারণে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রচলিত পরামর্শ অনুযায়ী, হাম প্রতিরোধে নির্ধারিত সময়সূচি অনুসারে টিকা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর টিকাদান সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের টিকাকার্ড পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজন হলে নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্র বা স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
শিশুর জ্বরের সঙ্গে ফুসকুড়ি, কাশি, চোখ লাল হওয়া কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। শ্বাসকষ্ট, খেতে বা পান করতে না পারা, অস্বাভাবিক নিস্তেজ হয়ে পড়া কিংবা খিঁচুনির মতো লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে হবে।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নজরদারি জোরদারের প্রয়োজন
দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর পাশাপাশি সন্দেহভাজন সংক্রমণের সংখ্যা বাড়তে থাকায় রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসাসেবা, টিকাদান এবং জনসচেতনতা কার্যক্রমের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে কোন বয়সের মানুষের মধ্যে সংক্রমণ বেশি হচ্ছে, কোন এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে এবং টিকাদানের আওতার বাইরে থাকা শিশুদের কীভাবে শনাক্ত করা যায়—এসব বিষয়ে নিয়মিত তথ্য বিশ্লেষণ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত পরিস্থিতি প্রতিবেদন থেকে সংক্রমণের প্রবণতা পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় জনস্বাস্থ্য পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়।
সার্বিকভাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আটজনের মৃত্যু এবং সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মিলিয়ে নতুন করে ১ হাজার ৮৬ জন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য দেশে হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এনেছে। সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকাদান, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদন, ১০ অক্টোবর।

