পবিত্র মক্কা ও মদিনা এবং পবিত্র দুই মসজিদের সুরক্ষার প্রশ্নে বাংলাদেশ কোনো ধরনের আপস বা ছাড় দেবে না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, সৌদি আরবের সরকার পবিত্র দুই মসজিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সহযোগিতা চাইলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম দেশ হিসেবে রিয়াদের পাশে দাঁড়াবে ঢাকা।
শনিবার (১০ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। এ সময় সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে শ্রমশক্তি রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের প্রচলিত গণ্ডি থেকে বের করে বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত করার সরকারের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
মক্কা-মদিনার নিরাপত্তায় বাংলাদেশের অবস্থান
সৌদি আরবে হুতি বিদ্রোহীদের তৎপরতা এবং এর ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি সেনাসদস্য পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, পবিত্র মক্কা-মদিনা ও পবিত্র মসজিদগুলোর সুরক্ষার জন্য সৌদি সরকার বাংলাদেশের সহায়তা চাইলে ঢাকা তাদের পাশে থাকবে।
তাঁর বক্তব্যে পবিত্র দুই মসজিদের নিরাপত্তার বিষয়ে বাংলাদেশের গুরুত্বারোপের বিষয়টি উঠে আসে। তবে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সামরিক সহায়তা চাওয়া হয়েছে কি না, কিংবা বাংলাদেশি সেনা মোতায়েনের বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না—এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি।
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিনের ধর্মীয়, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি হজ ও ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরব যান। পাশাপাশি দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ফলে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
শ্রমশক্তি ও রেমিট্যান্সের বাইরে কৌশলগত অংশীদারত্ব
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে শুধু শ্রমশক্তি রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না সরকার। দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ ও সমতার ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলাই ঢাকার লক্ষ্য।
এ লক্ষ্যে বিনিয়োগ, শক্তি ও জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং মেরিটাইম সিকিউরিটিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরব একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার ও বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় অংশীদার। অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি, বৃহৎ ভোক্তাবাজার এবং অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে উন্নয়ন-চাহিদা সৌদি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো গেলে জ্বালানি অবকাঠামো, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রেও নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুনির্দিষ্ট প্রকল্প, বিনিয়োগের পরিমাণ ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী বিস্তারিত তথ্য দেননি।
শিগগিরই সৌদি আরব সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে শিগগিরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সৌদি আরব সফর করবেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
প্রস্তাবিত সফরের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ সাধারণত কূটনৈতিক সংলাপ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সৌদি আরবের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বাড়লে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর সৌদি আরব সফরের নির্দিষ্ট তারিখ, সফরসূচি এবং আলোচ্য বিষয়গুলোর বিস্তারিত এখনো জানানো হয়নি।
‘মক্কা চুক্তি’ নিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি
ঐতিহাসিক ‘মক্কা চুক্তি’র বিষয়েও বাংলাদেশ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে বলে জানিয়েছেন হুমায়ুন কবির।
তবে তিনি কোন নির্দিষ্ট চুক্তি বা উদ্যোগের কোন দিককে ইঙ্গিত করেছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। ফলে চুক্তিটির সুনির্দিষ্ট পরিচয়, প্রেক্ষাপট ও সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
২৬ অক্টোবর চার দিনের সফরে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
এদিকে মধ্যপ্রাচ্য সফরের আগে দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে আগামী ২৬ অক্টোবর চার দিনের সরকারি সফরে জাপান যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, সফরকালে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জ্বালানিসহ উদীয়মান গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে।
জাপান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। দেশটি বাংলাদেশের অবকাঠামো, পরিবহন, শিল্পায়ন ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা করে আসছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য এই সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্প খাতে সহযোগিতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার মতো বিষয়ে অগ্রগতি হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
হুমায়ুন কবির আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।
বাংলাদেশের কূটনীতিতে অর্থনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় গুরুত্ব
সৌদি আরব ও জাপানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অর্থনৈতিক কূটনীতি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে।
একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, জ্বালানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব সুফল নির্ভর করবে আলোচনার ফলাফল, সুনির্দিষ্ট চুক্তি, বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এবং সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
সব মিলিয়ে, পবিত্র মক্কা-মদিনার নিরাপত্তার বিষয়ে সৌদি আরবের পাশে থাকার ঘোষণা এবং রিয়াদ ও টোকিওর সঙ্গে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতায় নতুন গুরুত্ব যোগ করেছে।

