বরিশালের হিজলায় মেঘনা নদীতে মা ইলিশ সংরক্ষণে অভিযান চালানোর সময় কোস্ট গার্ডের সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় কোস্ট গার্ডের টহল দলকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং আত্মরক্ষায় কোস্ট গার্ডের সদস্যরা ১১ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়েন। অভিযানে সহায়তা করতে যাওয়া মৎস্য অধিদপ্তরের একটি স্পিডবোটেও হামলার ঘটনা ঘটে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকেলে ইলিশ ধরার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞার দ্বিতীয় দিনে উপজেলার চরজানপুর এলাকার মেঘনা নদীর ৭ নম্বর ঘাটে এ ঘটনা ঘটে। মা ইলিশ রক্ষায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মৎস্য বিভাগের সদস্যদের ওপর এ হামলার ঘটনায় নদীতে অভিযান পরিচালনা এবং নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকারের চেষ্টা
স্থানীয় বাসিন্দা ও কোস্ট গার্ড সূত্রে জানা গেছে, মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে মেঘনা নদীতে নিয়মিত টহল দিচ্ছিল কোস্ট গার্ড। এ সময় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকারের চেষ্টা করা একদল জেলেকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
অভিযোগ অনুযায়ী, একপর্যায়ে সংঘবদ্ধ হয়ে কয়েকজন জেলে কোস্ট গার্ডের টহল দলের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে অভিযান পরিচালনাকারী সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেন। পরে আত্মরক্ষা ও হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে ১১ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়।
একই সময় কোস্ট গার্ডের সহায়তায় ঘটনাস্থলে এগিয়ে যাওয়া মৎস্য অধিদপ্তরের স্পিডবোটেও হামলা চালানো হয় বলে জানা গেছে।
তবে হামলায় কেউ আহত হয়েছেন কি না, স্পিডবোটের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না এবং এ ঘটনায় হামলাকারীদের কাউকে আটক করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
নিষেধাজ্ঞার দ্বিতীয় দিনে নদীতে জেলেদের তৎপরতা
হিজলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহফুজুর রহমান জানান, মা ইলিশ সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞার প্রথম দিনে মেঘনা নদীতে জেলেদের তৎপরতা তেমন দেখা যায়নি। তবে দ্বিতীয় দিনে কিছু জেলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকারের চেষ্টা করেন।
তিনি আরও জানান, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নদীতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নৌ পুলিশের অভিযানে ইতোমধ্যে ১০ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে আটটি নিয়মিত মামলা করা হয়েছে।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে ইলিশ শিকার অব্যাহত থাকলে মাছের প্রজনন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, চলবে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত
মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে গত ৮ অক্টোবর থেকে সারা দেশে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। এ নিষেধাজ্ঞা চলবে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত।
নিষেধাজ্ঞার সময়ে নির্ধারিত এলাকায় সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ রাখার নির্দেশনা রয়েছে। এ সময় ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত ও বিপণনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সরকারি বিধিনিষেধও অনুসরণ করতে হয়।
ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে নদীতে ইলিশের উৎপাদন বাড়তে পারে। এ কারণে প্রতিবছর নির্ধারিত সময়ে সরকার ইলিশ আহরণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে নদী ও উপকূলীয় এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মৎস্য বিভাগের সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
যৌথ অভিযানে কোস্ট গার্ড, নৌ পুলিশ ও মৎস্য বিভাগ
হিজলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহফুজুর রহমান জানান, মা ইলিশ রক্ষায় হিজলা নৌ পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও মৎস্য বিভাগ যৌথভাবে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
মেঘনা নদীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকার বন্ধ করাই এসব অভিযানের মূল লক্ষ্য। অভিযানের মাধ্যমে অবৈধভাবে ইলিশ শিকারকারীদের শনাক্ত করা, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রজনন মৌসুমে ইলিশের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
তবে অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা অভিযান পরিচালনায় বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। নদীতে নিরাপদে টহল ও অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি সরকারি নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে জেলেদের সচেতন করাও গুরুত্বপূর্ণ।
মা ইলিশ রক্ষায় আইন মানার আহ্বান
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং দেশের অর্থনীতি, মৎস্যসম্পদ ও জেলেদের জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
এ কারণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা এবং নির্ধারিত সময়ে নদীতে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা জেলেদের জন্য জরুরি। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
হিজলার মেঘনা নদীতে কোস্ট গার্ডের ওপর হামলা এবং ১১ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ার ঘটনা নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চ্যালেঞ্জের বিষয়টি সামনে এনেছে। ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় এ সময়ে নদীতে নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে মৎস্য বিভাগ।

