শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে পণ্য উৎপাদন করে তা রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতেই দেশের বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তবে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্যের প্রকৃত ব্যবহার, উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং রপ্তানির সঙ্গে আমদানি করা কাঁচামালের বাস্তব সম্পর্ক কতটা কার্যকরভাবে যাচাই করা হচ্ছে—এ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
চট্টগ্রামের একটি বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের আমদানি ও রপ্তানি সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কয়েক বছরে বিপুল পরিমাণ কাপড় বন্ড সুবিধায় আমদানি হয়েছে। একই সময়ে বিপুল পরিমাণ পোশাক রপ্তানি দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে আমদানি করা কাঁচামালের ব্যবহার, উৎপাদন এবং রপ্তানির তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কাস্টমসের প্রচলিত ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিষয়টি এখন কাস্টমসের তদন্ত ও নজরদারির আওতায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৫৮ লাখ ৪৪ হাজার কেজি, অর্থাৎ প্রায় ৫ হাজার ৮৪৪ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি করেছে। এসব পণ্যের আমদানি মূল্য প্রায় ২৭৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা এবং প্রযোজ্য শুল্ক-কর প্রায় ১৯১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
অন্যদিকে একই সময়ে প্রায় ৫২ লাখ ১৩ হাজার কেজি, অর্থাৎ ৫ হাজার ২১৩ মেট্রিক টন পোশাক রপ্তানি দেখানো হয়েছে। রপ্তানির নথিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লেবানন, অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশের নাম রয়েছে।
এখানেই সামনে আসছে মূল প্রশ্ন—বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল কোথায় গেল, কীভাবে ব্যবহার হলো এবং রপ্তানি করা পণ্যে সেই কাঁচামালের ব্যবহার কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে?
আমদানি বাড়লেও যাচাই ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী?
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠানটি ২৯টি চালানের মাধ্যমে প্রায় ৩৫৭ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি করে। ২০২২ সালে ২৪টি চালানে আমদানি হয় প্রায় ২৬৪ টন। এরপর আমদানির পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকে।
২০২৩ সালে ৯০টি চালানে প্রায় ১ হাজার ১৩৯ টন, ২০২৪ সালে ১৪৬টি চালানে প্রায় ১ হাজার ৮৬ টন এবং ২০২৫ সালে ২২৭টি চালানে প্রায় ১ হাজার ১০১ টন কাপড় আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে।
চলতি ২০২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ২৩০টি চালানে প্রায় ১ হাজার ৪৬৫ টন কাপড়—যা আগের কয়েকটি পূর্ণ বছরের তুলনায়ও বেশি।
আমদানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বন্ড কর্তৃপক্ষের জন্য পণ্যের ব্যবহার, মজুত, উৎপাদন ও রপ্তানি—এই পুরো চক্রের ওপর কার্যকর নজরদারির প্রয়োজনও বাড়ে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি চালানের কাঁচামাল শেষ পর্যন্ত কোন পণ্যে ব্যবহৃত হয়েছে এবং সেই পণ্যই রপ্তানি হয়েছে কি না, তা শতভাগ নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব হচ্ছে—এ প্রশ্নই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কাগজে রপ্তানি, বাস্তবে উৎপাদন—যাচাইয়ের চ্যালেঞ্জ
বন্ড সুবিধার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো আমদানি করা কাঁচামাল অনুমোদিত ব্যবস্থায় ব্যবহার করে রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদন করা। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শুধু রপ্তানির কাগজপত্র থাকলেই পুরো প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা নয়; আমদানি করা কাঁচামালের সঙ্গে উৎপাদিত ও রপ্তানি করা পণ্যের সম্পর্কও যাচাইয়ের বিষয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কিছু রপ্তানি নথি নিয়ে কাস্টমসের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আমদানি করা কাপড়ের প্রকৃত ব্যবহার এবং রপ্তানির সময় দেখানো পণ্যের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা হচ্ছে।
এক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো—রপ্তানি নথিতে পণ্যের নাম, ক্রেতা, গন্তব্য ও অন্যান্য তথ্য থাকলেও বাস্তবে কারখানায় কী পরিমাণ কাঁচামাল ঢুকেছে, কতটুকু উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়েছে, কতটুকু অপচয় হয়েছে এবং উৎপাদিত পণ্যের কত অংশ শেষ পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে—এসব তথ্যের সমন্বিত যাচাই।
সাব-কন্ট্রাক্টে আরও জটিলতা
বন্ড ব্যবস্থায় সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে উৎপাদনের সুযোগ থাকায় নজরদারির বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে। কারণ কাঁচামাল একটি প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে গেলে তার পরিবহন, গ্রহণ, ব্যবহার ও উৎপাদন—প্রতিটি ধাপের তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে প্রায় ১৯ হাজার ৫০ কেজি কাপড় আমদানির পর বন্ড কমিশনারেটের একটি দল অভিযান চালায়। ওই ঘটনায় আল ইয়াসরা টেক্সটাইল লিমিটেডের নামে করা একটি সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে কাপড় সরিয়ে খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগের তথ্য সামনে আসে। সংশ্লিষ্ট চালানের প্রযোজ্য শুল্ক-কর ছিল প্রায় ৬৯ লাখ ২৪ হাজার ৮৪৭ টাকা। এ ঘটনায় শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে মামলা হয়েছে এবং বিষয়টি বিচারাধীন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আরেকটি ঘটনায় প্রায় ১৬ হাজার ১২১ কেজি কাপড় নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় প্রায় ৭০ লাখ ৩৭ হাজার ৯৩৭ টাকা শুল্ক-কর ফাঁকির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানকে জরিমানার তথ্যও পাওয়া গেছে।
এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয়, কাগজপত্রের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে পণ্য চলাচল ও ব্যবহার পর্যবেক্ষণ না করলে বন্ড ব্যবস্থার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কাস্টমসের নতুন উদ্যোগ
তবে বিষয়টি সামনে আসার পর কাস্টমস কর্তৃপক্ষও নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বন্ড কমিশনারেট থেকে বিভিন্ন কাস্টমস হাউসের কমিশনারদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি চালান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রপ্তানি করা পণ্যে আমদানি করা কাঁচামাল ব্যবহার হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে ১০০ শতাংশ শারীরিক পরীক্ষা এবং নথির সঙ্গে আমদানি করা কাঁচামালের তথ্য মিলিয়ে দেখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি কার্যক্রমেও প্রভাব পড়েছে বলে সূত্রের দাবি।
বন্ড ব্যবস্থায় ডিজিটাল নজরদারি কি আরও জরুরি?
বন্ড ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক করা। রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করতে পারে, সে জন্য এই সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু একই ব্যবস্থায় যদি আমদানি করা কাঁচামালের শেষ গন্তব্য ও ব্যবহার যথাযথভাবে অনুসরণ করা না যায়, তাহলে রাজস্ব সুরক্ষা ও বন্ড ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা—দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কাগজপত্র যাচাইয়ের পরিবর্তে আমদানি থেকে উৎপাদন, মজুত, সাব-কন্ট্রাক্ট, পরিবহন এবং রপ্তানি পর্যন্ত পুরো সাপ্লাই চেইনকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে নজরদারি আরও কার্যকর হতে পারে।
একটি চালানে কত কাঁচামাল আমদানি হয়েছে, তা দিয়ে কত পণ্য উৎপাদন সম্ভব, কতটুকু অপচয় স্বাভাবিক, কতটুকু পণ্য রপ্তানি হয়েছে এবং বাকি কাঁচামালের হিসাব কী—এসব তথ্য একই প্ল্যাটফর্মে দেখা গেলে অসঙ্গতি শনাক্ত করা সহজ হবে।
প্রশ্নটা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়
বন্ড ব্যবস্থায় কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেটির তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়। তবে এর বাইরেও বড় প্রশ্ন হলো—একটি বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা কাঁচামাল থেকে রপ্তানি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া কতটা কার্যকরভাবে নজরদারির আওতায় থাকে?
কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে যদি আমদানি করা কাঁচামাল, উৎপাদন ও রপ্তানির তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি শনাক্ত করতে দীর্ঘ সময় লাগে, তাহলে একই ধরনের ঝুঁকি অন্য প্রতিষ্ঠানেও আছে কি না, সেটিও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
এক্ষেত্রে এনবিআর ও কাস্টমসের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—শুধু চালান ছাড়পত্র দেওয়া বা পরবর্তী সময়ে অডিট করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রিয়েল-টাইম তথ্যভিত্তিক নজরদারি নিশ্চিত করা।
বন্ড ব্যবস্থার সুবিধা শিল্প ও রপ্তানি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এর সঙ্গে রাজস্ব সুরক্ষার ভারসাম্যও জরুরি। আমদানি বন্ডে, উৎপাদন কারখানায় আর রপ্তানি বিদেশে—এই তিনটি ধাপের তথ্য যদি একই ব্যবস্থায় স্বচ্ছভাবে যুক্ত করা যায়, তাহলে কাঁচামালের অপব্যবহার, ভুল তথ্য বা কাগজভিত্তিক রপ্তানির সম্ভাব্য ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সুতরাং প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়; প্রশ্নটি বন্ড ব্যবস্থাপনার কাঠামো, যাচাই প্রক্রিয়া এবং কাস্টমসের নজরদারি সক্ষমতা নিয়ে। আমদানি করা প্রতিটি কাঁচামালের শেষ গন্তব্য থেকে শুরু করে রপ্তানি হওয়া প্রতিটি পণ্যের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিশ্চিত করা—রাজস্ব সুরক্ষার পাশাপাশি দেশের রপ্তানিনির্ভর শিল্পের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ।

