ঢাকা রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আছে, তবু আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে পিছিয়ে কক্সবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬, ১০:০১ এএম

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আছে, তবু আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে পিছিয়ে কক্সবাজার

ছবিঃ সংগৃহীত

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বন, দ্বীপ, প্রবাল, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে কক্সবাজারের পর্যটন সম্ভাবনা বিশাল। ইন্দোনেশিয়ার বালি কিংবা থাইল্যান্ডের পাতায়ার মতো আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হওয়ার মতো প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্যও রয়েছে বাংলাদেশের এই পর্যটননগরীতে। বিমান, রেল ও সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন এবং শত শত হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ গড়ে ওঠায় দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কক্সবাজার।

প্রতিবছর লাখ লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক কক্সবাজারে এলেও আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে এখনো কাঙ্ক্ষিত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি শহরটি। পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কিংবা অবকাঠামো থাকলেই আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হওয়া যায় না। প্রয়োজন বৈচিত্র্যময় পর্যটনপণ্য, মানসম্মত সেবা, নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, সরাসরি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, সহজ ভিসাব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং বছরজুড়ে আন্তর্জাতিক মানের আয়োজন।

আজ রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব পর্যটন দিবস। দিবসটিকে সামনে রেখে কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসায়ী, পরিবেশকর্মী, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে কক্সবাজারের সম্ভাবনা এবং বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার চিত্র উঠে এসেছে।

বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে পিছিয়ে কেন কক্সবাজার?

কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত দেশীয় পর্যটকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য। কিন্তু বিদেশি পর্যটকদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে সীমিত। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের ভাষ্য, দুই দশক আগের তুলনায় সমুদ্রসৈকতে বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা কমেছে। তবে বিদেশি পর্যটকদের আগমন নিয়ে হালনাগাদ ও পৃথক পরিসংখ্যান সহজলভ্য না থাকায় প্রকৃত পরিস্থিতি নির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা কঠিন।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্যগুলোর সঙ্গে কক্সবাজারের বড় পার্থক্য হলো পর্যটনপণ্যের বৈচিত্র্য। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে প্রায় ৭০ লাখ বিদেশি পর্যটক গেছেন।

তার মতে, থাইল্যান্ডের পাতায়ায় বছরজুড়ে ম্যারাথন, সংগীত, চলচ্চিত্র, আতশবাজি, জলক্রীড়া, সুস্থতা ও ব্যবসায়িক আয়োজনসহ ৫০টির বেশি বড় ও মাঝারি অনুষ্ঠান হয়। বিপরীতে কক্সবাজারে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ এখনো সমুদ্রসৈকতকেন্দ্রিক। ফলে অধিকাংশ পর্যটকের ভ্রমণ হোটেল, সৈকত, রেস্তোরাঁ ও বাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

আবু মোর্শেদ চৌধুরীর মতে, বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে হলে শুধু সৈকতনির্ভর পর্যটন নয়; বছরজুড়ে সাংস্কৃতিক উৎসব, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, জলক্রীড়া ও বিনোদনমূলক আয়োজন বাড়াতে হবে।

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলেই কি আন্তর্জাতিক গন্তব্য?

কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে বিমানবন্দর উন্নয়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। রেল যোগাযোগ চালুর ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও পর্যটকদের যাতায়াত সহজ হয়েছে। তবে পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে শুধু যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়।

ট্যুরস অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের সভাপতি আনোয়ার কামাল বলেন, বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানের হলেই কক্সবাজার আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হবে না। প্রয়োজন সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, সহজ ভিসাব্যবস্থা, মানসম্মত আবাসন, প্রশিক্ষিত পর্যটনকর্মী, বহুভাষিক তথ্যসেবা, পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ধারাবাহিক প্রচারণা।

তার ভাষ্য, বিদেশি পর্যটকদের কাছে কক্সবাজারকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে হবে। শুধু সমুদ্রসৈকতের ছবি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রচারণার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে অবস্থান তৈরি করা কঠিন।

পর্যটনপণ্যের বৈচিত্র্য কোথায়?

কক্সবাজারের পর্যটন সম্ভাবনা মূলত সমুদ্রসৈকতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হিমছড়ি, ইনানী, পেচারদ্বীপ, পাটুয়ারটেক, রামু, টেকনাফ, মহেশখালী ও সোনাদিয়ার মতো এলাকায় রয়েছে পাহাড়, বন, নদী, দ্বীপ, সমুদ্র, জীববৈচিত্র্য, ইতিহাস ও স্থানীয় সংস্কৃতির নানা উপাদান।

কিন্তু এসব এলাকাকে একটি সমন্বিত পর্যটনপণ্য হিসেবে গড়ে তোলা যায়নি বলে মনে করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্টরা। ফলে একজন বিদেশি পর্যটক কক্সবাজারে এসে একাধিক দিন অবস্থান করে বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম পান।

পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, নিরাপদ জলক্রীড়া, ডাইভিং, স্নরকেলিং, কায়াকিং, প্রকৃতিনির্ভর ভ্রমণ, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনকে পরিকল্পিতভাবে যুক্ত করা গেলে পর্যটকদের অবস্থানকাল বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক মানের বিনোদনের ঘাটতি

আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্যে দিনের পাশাপাশি সন্ধ্যা ও রাতের বিনোদনও পর্যটনপণ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীত, নিরাপদ বিনোদন, কেনাকাটা, পরিবারবান্ধব আয়োজন ও বিভিন্ন ধরনের রাতের কার্যক্রম পর্যটকদের অবস্থানকাল বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

কক্সবাজারে এ ধরনের বৈধ, নিরাপদ ও বৈচিত্র্যময় রাতের বিনোদনের সুযোগ এখনো সীমিত বলে মনে করছেন স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে সুগন্ধা পয়েন্টের একটি রেস্তোরাঁয় পর্যটকদের জন্য আয়োজিত ডিজে নাইট ঘিরে পুলিশি অভিযানও বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আনে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ সেখানে তল্লাশি চালায়। তবে সেখানে অভিযোগ অনুযায়ী কোনো কার্যক্রম পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। পরে পাশের কটেজ জোন থেকে অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগে ২১ নারী-পুরুষকে আটক করা হয়।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, সারা দিন সমুদ্র ও পাহাড় দেখার পর পর্যটকরা রাতে কোথায় যাবেন, কী করবেন—সেই পরিকল্পনাও পর্যটন ব্যবস্থাপনার অংশ হওয়া উচিত।

তার মতে, কোনো পর্যটন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আইন অনুযায়ী তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বৈধ ও নিরাপদ বিনোদনের পরিবেশও নিশ্চিত করা দরকার।

সৈকতের বাইরে সম্ভাবনা থাকলেও সমন্বিত উদ্যোগ কম

কক্সবাজারের মূল শহর ছাড়িয়ে পর্যটনের নতুন ক্ষেত্র তৈরির সুযোগ রয়েছে। হিমছড়ি, ইনানী, পেচারদ্বীপ, পাটুয়ারটেক, রামু, টেকনাফ, মহেশখালী ও সোনাদিয়াকে আলাদা বৈশিষ্ট্যের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকার মতে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কক্সবাজার গন্তব্য উন্নয়ন পরিকল্পনা ২০২৫–২০২৭-এও এসব এলাকার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় পরিবহন, আবাসন, নিরাপত্তা, স্যানিটেশন ও অন্যান্য পর্যটনসেবার ঘাটতি রয়েছে।

পর্যটন ব্যবসায়ীরা মনে করেন, কক্সবাজারের প্রতিটি পর্যটন এলাকার আলাদা বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে সেগুলোকে একটি সমন্বিত ভ্রমণপ্যাকেজে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে পর্যটকেরা শুধু সমুদ্রসৈকতকেন্দ্রিক না থেকে কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় ভ্রমণের সুযোগ পাবেন।

পরিবেশদূষণ বড় চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে কোনো গন্তব্যের পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য। কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশদূষণের বিষয়টিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে বলে পরিবেশকর্মীরা মনে করছেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, গত ঈদুল ফিতরের পর মাত্র তিন দিনে সমুদ্রসৈকত থেকে এক টনের বেশি বর্জ্য অপসারণ করতে হয়েছে। তার তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার শহরে প্রতিদিন প্রায় ১৮০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়।

তিনি অভিযোগ করেন, অধিকাংশ হোটেলে কার্যকর পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার না থাকায় অপরিশোধিত বর্জ্যপানি সাগরে পড়ছে। এর সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট ও জলাবদ্ধতার মতো সমস্যাও রয়েছে।

পরিবেশকর্মীদের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য আধুনিক হোটেল ও বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি সমুদ্র ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পয়ঃবর্জ্য শোধন এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করা জরুরি।

পর্যটক বাড়ছে, কিন্তু বিদেশি পর্যটকের তথ্য কোথায়?

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ৬০ থেকে ৮০ লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক কক্সবাজারে আসেন। পর্যটনকে ঘিরে বছরে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়।

তবে মোট পর্যটকের মধ্যে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা কত, তারা গড়ে কত দিন অবস্থান করেন এবং একজন বিদেশি পর্যটক গড়ে কত টাকা ব্যয় করেন—এসব তথ্য পৃথকভাবে না থাকায় আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে কক্সবাজারের প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ করা কঠিন।

পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু মোট পর্যটকের সংখ্যা দিয়ে একটি আন্তর্জাতিক গন্তব্যের সাফল্য পরিমাপ করা যায় না। বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা, অবস্থানকাল, ব্যয়ের পরিমাণ, পুনরায় আসার প্রবণতা এবং পর্যটনসেবা থেকে স্থানীয় অর্থনীতিতে কতটা মূল্য সংযোজন হচ্ছে—এসব সূচকও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

নিরাপত্তা ও সেবার মানও গুরুত্বপূর্ণ

বিদেশি পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তা, হয়রানিমুক্ত পরিবেশ এবং সহজে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ আন্তর্জাতিক পর্যটন ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান বলেন, কক্সবাজারে বিপুলসংখ্যক হোটেল ও রিসোর্ট থাকলেও বিদেশি পর্যটকদের দীর্ঘ সময় ধরে রাখার মতো পর্যাপ্ত আয়োজন গড়ে ওঠেনি।

তার ভাষ্য, পর্যটকদের নিরাপত্তা, হয়রানি এবং অনুমতি ছাড়া ছবি তোলার অভিযোগের মতো বিষয়গুলোর সমাধান প্রয়োজন। একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে প্রশিক্ষিত গাইড, পর্যটন পুলিশিং, বহুভাষিক নির্দেশনা ও তথ্যকেন্দ্র বাড়ানো দরকার।

বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকদের জন্য ইংরেজির পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষায় পর্যটন নির্দেশিকা, জরুরি যোগাযোগের তথ্য, পরিবহন ও দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজে পাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে তাদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা আরও সহজ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্র্যান্ডিং ও আন্তর্জাতিক প্রচারণায় ঘাটতি

বিশ্বের পরিচিত পর্যটন গন্তব্যগুলো শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ওপর নির্ভর করে না; তারা নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডিং, আন্তর্জাতিক প্রচারণা, পর্যটন মেলা, ট্যুর অপারেটর নেটওয়ার্ক এবং বিদেশি গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত প্রচারণার মাধ্যমে নিজেদের বাজার তৈরি করে।

কক্সবাজারের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক পর্যটন সংস্থা, বিদেশি ট্যুর অপারেটর এবং এয়ারলাইনগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে প্রচারণা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে পর্যটন ব্যবসায়ীরা মনে করেন।

তাদের মতে, কক্সবাজারকে শুধু ‘দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত’ হিসেবে নয়, বরং সমুদ্র, পাহাড়, দ্বীপ, সংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য, খাবার ও অ্যাডভেঞ্চার—সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরতে হবে।

প্রয়োজন সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা

পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজারে বিভিন্ন সময়ে অবকাঠামো উন্নয়ন ও পর্যটনকেন্দ্রিক নানা প্রকল্প নেওয়া হলেও সমুদ্রসৈকত ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপত্তা, পরিবহন, বিনোদন, আবাসন ও আন্তর্জাতিক প্রচারণাকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে।

তাদের মতে, একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পর্যটন ব্যবসায়ী, পরিবেশকর্মী এবং সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা, পরিবেশগত ধারণক্ষমতা বিবেচনায় পর্যটন পরিচালনা, নিরাপদ বিনোদন চালু, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ব পর্যটন দিবসে কক্সবাজারের সামনে বড় প্রশ্ন

বিশ্ব পর্যটন দিবসে কক্সবাজারের সামনে তাই প্রশ্ন শুধু বছরে কত লাখ পর্যটক আসছেন, তা নয়। বরং বিদেশি পর্যটকদের জন্য কক্সবাজারের বিশেষ আকর্ষণ কী, তারা কেন এখানে কয়েক দিন অবস্থান করবেন, কী ধরনের অভিজ্ঞতা পাবেন এবং কেন আবার ফিরে আসবেন—এসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হওয়ার ভিত্তি দিয়েছে। বিমানবন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন এবং বিপুল আবাসন অবকাঠামো পর্যটন শিল্পের বিস্তারের সুযোগ তৈরি করেছে।

এখন আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে হলে সেই প্রাকৃতিক সম্পদকে সুরক্ষিত রেখে বৈচিত্র্যময় পর্যটনপণ্য, মানসম্মত সেবা, নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং বছরজুড়ে আকর্ষণীয় আয়োজনের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

অর্থাৎ কক্সবাজারে পর্যটক আসছেন—এটি যেমন বাস্তবতা, তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের দীর্ঘমেয়াদি আকর্ষণ ও অবস্থান নিশ্চিত করতে পর্যটন ব্যবস্থাপনায় আরও কাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!