কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের দমদমিয়া এলাকার ১৪ নম্বর ব্রিজ যেন ক্রমেই অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হচ্ছে। নাফ নদী, পাহাড় ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ, হত্যাকাণ্ড ও মাদক পাচারের অভিযোগে আলোচনায় রয়েছে। রাতের আঁধারের পাশাপাশি এখন দিনের বেলাতেও এ সড়কে সংঘবদ্ধ সশস্ত্র চক্রের তৎপরতার অভিযোগ উঠছে।
সর্বশেষ গত ২ আগস্ট ব্যস্ত সড়কে যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে বিকাশের দুই কর্মীর কাছ থেকে ৫৭ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে ১৪ নম্বর ব্রিজ। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, পরিকল্পিতভাবে বাসটির গতিরোধ করে অস্ত্রের মুখে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুট করা হয়। লুট হওয়া অর্থের একটি অংশ অস্ত্র কেনার কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল বলেও তদন্তে তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। তাদের কাছ থেকে লুট হওয়া ২ লাখ ২৬ হাজার ৭০০ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। তবে লুট হওয়া বিপুল অর্থের সিংহভাগ এখনো উদ্ধার হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দিনের বেলায় বাস থামিয়ে ৫৭ লাখ টাকা লুট
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২ আগস্ট টেকনাফ স্টেশন থেকে একটি যাত্রীবাহী বাস ছেড়ে যাওয়ার পর একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় থাকা বোরকা পরা এক নারী বাসটিকে অনুসরণ করছিলেন। পুলিশ তাকে এই মামলায় গ্রেফতার করেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, ওই নারীর দেওয়া সংকেতের ভিত্তিতেই ১৪ নম্বর ব্রিজ এলাকায় পাহাড় থেকে একটি সংঘবদ্ধ ডাকাতদল সড়কে নেমে আসে। তারা সড়কের ওপর গাছের গুঁড়ি ও পেরেকযুক্ত কাঠ ফেলে বাসটির গতিরোধ করে।
এরপর অস্ত্রধারী চারজন বাসে উঠে বিকাশের দুই কর্মীর কাছ থেকে ৫৭ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। এ সময় তাদের ছুরিকাঘাত ও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
লুটের পর ডাকাতরা দ্রুত পাহাড়ের দিকে চলে যায়। পুরো ঘটনায় সময় লাগে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ মিনিট।
ব্যস্ত মহাসড়কে দিনের আলোয় এত বিপুল অর্থ লুটের ঘটনায় পুলিশের তদন্তে বিষয়টি পরিকল্পিত বলে উঠে এসেছে। বাসের চালক, সহকারী ও যাত্রীদের কেউ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
পাঁচজন গ্রেফতার, টাকা উদ্ধার সামান্য
৫৭ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় পুলিশ ইতোমধ্যে আক্তার হোসেন, নজরুল ইসলাম, রূপবাহারসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে। তাদের মধ্যে আয়াস নামে এক রোহিঙ্গা এবং লেদা এলাকার হোসেন আলী আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
কক্সবাজার আদালত পুলিশের পরিদর্শক গোলাম জিলানী জানান, গ্রেফতার পাঁচজনকে আদালতে হাজির করা হলে তাদের মধ্যে দুজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
এদিকে পুলিশ লুট হওয়া ২ লাখ ২৬ হাজার ৭০০ টাকা উদ্ধার করেছে। তবে বিপুল পরিমাণ অর্থ এখনো উদ্ধার না হওয়ায় ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, মামলার তদন্তে অগ্রগতি রয়েছে। কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং কিছু টাকা উদ্ধার হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেফতার ও লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারে অভিযান চলছে।
আগের ৩০ লাখ টাকার লুটেরও সুরাহা হয়নি
স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৪ নম্বর ব্রিজ এলাকায় এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। গত বছরের ২৫ মে ব্রিজের কাছাকাছি এলাকায় বিকাশের সেলস সুপারভাইজার মজিবর রহমানের চোখে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে ৩০ লাখ টাকা লুট করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ওই ঘটনার এক বছর পার হলেও লুট হওয়া টাকা উদ্ধার কিংবা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
একই এলাকায় একের পর এক বিপুল অর্থ লুটের ঘটনায় ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নগদ অর্থ বহনকারী ব্যবসায়ীরা এখন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
টেকনাফ উপজেলার বিকাশ এজেন্টদের ডিস্ট্রিবিউটর আবদুল করিম বলেন, একের পর এক ডাকাতির ঘটনায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। গত বছরের ৩০ লাখ টাকা লুটের ঘটনার পুরোপুরি সুরাহা না হতেই আবার ৫৭ লাখ টাকা লুটের ঘটনা ঘটেছে।
কেন আতঙ্কের নাম ১৪ নম্বর ব্রিজ?
টেকনাফ শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে ১৪ নম্বর ব্রিজের অবস্থান। এ পথে ধারাবাহিকভাবে থাকা সেতুগুলোর মধ্যে এটি ১৪ নম্বর হওয়ায় স্থানীয়ভাবে এলাকাটি ‘১৪ নম্বর ব্রিজ’ নামে পরিচিত।
ব্রিজটির একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে নাফ নদী ও দুর্গম এলাকা। কাছেই রয়েছে বিজিবির দমদমিয়া চেকপোস্ট এবং কোস্টগার্ডের টেকনাফ স্টেশন। নিরাপত্তা বাহিনীর স্থাপনা কাছাকাছি থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
প্রায় তিন দশক ধরে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে বাস চালানো এক চালক বলেন, তার দীর্ঘ কর্মজীবনে ১৪ নম্বর ব্রিজ এলাকায় বহু ডাকাতির ঘটনা দেখেছেন ও শুনেছেন।
তার ভাষ্য, শুধু বাস নয়—ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, সিএনজি ও অন্যান্য যানবাহনের চালকরাও এই এলাকায় চলাচলের সময় আতঙ্কে থাকেন। অনেক সময় ডাকাতরা টাকা-পয়সা ও মূল্যবান সামগ্রী লুট করে। আবার কিছু না পেলে যাত্রী বা পথচারীদের অপহরণ করার অভিযোগও রয়েছে।
‘পাহাড়ই তাদের নিরাপদ আশ্রয়’
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ব্রিজসংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সড়কে ডাকাতির পর অল্প সময়ের মধ্যেই পাহাড়ের ভেতরে ঢুকে পড়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য তাদের আটক করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিন বছর আগে ১৪ নম্বর ব্রিজ এলাকায় ডাকাতদের হামলার শিকার হয়েছিলেন হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা গ্রামের সিএনজি অটোরিকশাচালক নূর কামাল।
তার ভাষ্য, সন্ধ্যার দিকে যাত্রী নিয়ে টেকনাফের দিকে যাওয়ার সময় ব্রিজের কাছে সড়কে গাছ ফেলে ব্যারিকেড দেওয়া দেখতে পান। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তি তাদের ঘিরে ফেলে। অস্ত্র ও ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকা ও যাত্রীদের মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তাকে মারধর করা হয়।
ওই ঘটনার পর থেকে ১৪ নম্বর ব্রিজের কাছে এলেই তার মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয় বলে জানান তিনি।
সক্রিয় সংঘবদ্ধ চক্রের অভিযোগ
স্থানীয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ১৪ নম্বর ব্রিজকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের সদস্য সংখ্যা ১৫ থেকে ২৫ জনের মতো হতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, আক্তার হোসেন ও মো. আলমের নেতৃত্বে একটি চক্র এলাকায় ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধে জড়িত। তাদের সঙ্গে ইমান হোসেন, কামাল হোসেন, আজিজুর রহমান ওরফে গুরাইয়া, মিজানুর রহমান, মো. রাসেল ওরফে আব্বুয়াসহ আরও কয়েকজনের নাম বিভিন্ন ঘটনায় উঠে এসেছে। তবে এসব ব্যক্তির প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা আদালতের চূড়ান্ত রায়ে নির্ধারিত হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে আরও জানা যায়, ২০২৪ সালে কথিত শীর্ষ ডাকাত শফি গ্রুপ থেকে বের হয়ে আক্তার ও আলম নতুন একটি গ্রুপ গঠন করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
কে এই আক্তার?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, হ্নীলা ইউনিয়নের পশ্চিম লেদা এলাকার মকতুল হোসেনের ছেলে মো. আক্তার হোসেন (৩৬) একটি সংঘবদ্ধ দলের নেতৃত্ব দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার দলের সদস্যদের কাছে দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র থাকার তথ্যও তদন্তকারীদের কাছে রয়েছে।
স্থানীয়ভাবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই চক্রকে ‘আক্তার বাহিনী’ নামেও অভিহিত করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, আক্তারের বিরুদ্ধে মাদক, হত্যা ও ডাকাতিসহ একাধিক মামলা রয়েছে এবং সম্প্রতি তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের আইনগতভাবে অভিযুক্ত হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
লুটের টাকায় অস্ত্র কেনার পরিকল্পনা?
৫৭ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. অহিদুর রহমান বলেন, গ্রেফতার দুই শীর্ষ সন্দেহভাজনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে—লুট হওয়া অর্থের একটি অংশ অস্ত্র কেনার কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল। তবে ঘটনার সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে।
তিনি আরও জানান, কথিত ডাকাতদের আয়ের উৎস হিসেবে মাদক, মানবপাচার ও ডাকাতির বিষয়টি তদন্তে এসেছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরও কয়েকজনকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেফতার এবং লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাতে বাড়ছে উদ্বেগ
১৪ নম্বর ব্রিজ এলাকায় একের পর এক ডাকাতির অভিযোগ শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেই নয়, ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাতেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, নগদ অর্থ বহনের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, পাইকারি ব্যবসা ও পরিবহন খাতের কর্মীদের জন্য এলাকাটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
স্থানীয়দের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। পাহাড়ি এলাকায় নিয়মিত নজরদারি, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিরাপত্তা জোরদার, সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং আগের ডাকাতির ঘটনাগুলোর দ্রুত তদন্ত ও লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রশ্ন এখন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে
বিজিবি ও কোস্টগার্ডের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছাকাছি হয়েও ১৪ নম্বর ব্রিজ এলাকায় দিনের বেলায় একটি যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে ৫৭ লাখ টাকা লুটের ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত অভিযান চালিয়ে চক্রটির সব সদস্যকে আইনের আওতায় আনবে এবং লুট হওয়া অর্থ উদ্ধার করবে।
কারণ, ১৪ নম্বর ব্রিজে যদি দিনের আলোতেও এমন পরিকল্পিত লুটের ঘটনা ঘটে, তাহলে রাতের বেলায় এই সড়কে চলাচলকারী সাধারণ মানুষ, পরিবহন চালক ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়াটাই স্বাভাবিক।
টেকনাফের ১৪ নম্বর ব্রিজ তাই এখন শুধু একটি সেতুর নাম নয়—স্থানীয়দের কাছে এটি নিরাপত্তাহীনতা, পাহাড়ি অপরাধচক্র এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ডাকাতির এক প্রতীক হয়ে উঠেছে।

