মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা যোদ্ধা থেকে জাতীয় রাজনীতির পরিচিত মুখ, এরপর অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র—বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে নানা পরিচয়ে মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা এবং রাজধানীর নগর প্রশাসনে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি।
আজ ৪ নভেম্বর সাদেক হোসেন খোকার সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৯ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ক্যানসারের চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। মৃত্যুর সাত বছর পরও মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ ও ঢাকার সাবেক মেয়র হিসেবে তাঁর নাম আলোচিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধ দিয়ে শুরু, রাজনীতিতে দীর্ঘ পথচলা
সাদেক হোসেন খোকা ১৯৫২ সালের ১২ মে জন্মগ্রহণ করেন। তরুণ বয়সেই তিনি দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে যুক্ত হন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে অংশ নেন। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়।
স্বাধীনতার পর দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হন খোকা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিতি অর্জন করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং দলটির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন আন্দোলন, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও নির্বাচনী রাজনীতিতে তাঁর অংশগ্রহণ তাঁকে বিএনপির পরিচিত নেতাদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র
সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন। রাজধানীর নগর প্রশাসনের দায়িত্বে থাকাকালে তিনি নগর ব্যবস্থাপনা, নাগরিক সেবা এবং ঢাকার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করেন।
ঢাকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। জনসংখ্যার চাপ, যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির মতো সমস্যার মধ্যে নগর পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে তাঁকে।
মেয়র হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজধানীর নগর প্রশাসনে তাঁর ভূমিকা তাঁকে জাতীয় রাজনীতির বাইরেও পরিচিতি এনে দেয়।
মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচয়ের পাশাপাশি ঢাকার সাবেক মেয়র হিসেবে তাঁর ভূমিকা সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।
ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা
জীবনের শেষ পর্যায়ে ক্যানসারে আক্রান্ত হন সাদেক হোসেন খোকা। উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখানে নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যানসার সেন্টারে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তিনি দেশের রাজনীতিতে পরিচিত একজন নেতা এবং বিএনপির জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের সাবেক নেতা হিসেবে আলোচনায় ছিলেন।
তাঁর অসুস্থতা ও মৃত্যুর খবর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও অনুসারীরা তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন।
জুরাইন কবরস্থানে মায়ের পাশে চিরনিদ্রায়
মৃত্যুর পর সাদেক হোসেন খোকার মরদেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পরে ঢাকার জুরাইন কবরস্থানে তাঁর মায়ের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।
বিদেশের মাটিতে জীবনের শেষ সময় কাটলেও শেষ পর্যন্ত দেশের মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হন এই মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদ।
স্মৃতিতে সাদেক হোসেন খোকা
সাদেক হোসেন খোকার জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, স্বাধীনতার পর রাজনীতিতে সক্রিয়তা, বিএনপির নেতৃত্বে ভূমিকা এবং অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন—সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল ঘটনাবহুল।
রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর ভূমিকা নিয়ে মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে। তবে মুক্তিযোদ্ধা, জাতীয় রাজনৈতিক দলের নেতা এবং রাজধানীর সাবেক মেয়র হিসেবে বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম উল্লেখযোগ্য।
মৃত্যুর সাত বছর পর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী আবারও সামনে এনেছে মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতি ও নগর প্রশাসনে তাঁর দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি। এ দিনে রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও অনুসারীরা স্মরণ করছেন সাদেক হোসেন খোকাকে।

