ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬

menu

সাধারণ ফ্যান বদলে বিএলডিসি ব্যবহারেই কমতে পারে ২,৫৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: নভেম্বর ৩, ২০২৬, ০৯:৫৯ এএম

সাধারণ ফ্যান বদলে বিএলডিসি ব্যবহারেই কমতে পারে ২,৫৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা

ছবিঃ সংগৃহীত

গ্রীষ্মকালে বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত সাধারণ বৈদ্যুতিক ফ্যানের পরিবর্তে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী বিএলডিসি (ব্রাশলেস ডাইরেক্ট কারেন্ট) ফ্যান ব্যবহার করা গেলে দেশের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ২ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এতে বছরে প্রায় ৮ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকার বিদ্যুৎ সাশ্রয় হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন এড়ানো সম্ভব বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সোমবার (৩ নভেম্বর) প্রকাশিত ‘হাউসহোল্ড স্পেস কুলিং ইন বাংলাদেশ: রোল অব এনার্জি-এফিশিয়েন্ট ফ্যানস’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানিবিশ্লেষক শফিকুল আলম।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলায় নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুতের ব্যবহার দক্ষ করাও জরুরি। বিশেষ করে আবাসিক খাতে সাধারণ ফ্যানের পরিবর্তে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী বিএলডিসি ফ্যানের ব্যবহার বাড়ানো গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

২৬ জেলার ৪৩৫ পরিবারের ওপর জরিপ

গবেষণাটি তৈরিতে দেশের ২৬ জেলার ৪৩৫টি পরিবারের ওপর জরিপ চালানো হয়। মাসিক আয় বিবেচনায় পরিবারগুলোকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে তাদের ফ্যান ব্যবহারের ধরন, বিদ্যুৎ খরচ এবং বিদ্যুৎসাশ্রয়ী প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রীষ্মকালে বাসাবাড়িতে ফ্যান ব্যবহারের কারণে দেশের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ২১২ মেগাওয়াট। রাত ৯টার দিকে ফ্যানের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময় আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপ জাতীয় গ্রিডের ওপর বাড়তি বোঝা তৈরি করে।

জরিপে দেখা গেছে, স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোও গরমের সময় গড়ে দুটি পর্যন্ত ফ্যান ব্যবহার করে। ফলে শুধু উচ্চ ও মধ্যবিত্ত নয়, নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ফ্যান ব্যবহারের বিষয়টিও বিদ্যুতের সামগ্রিক চাহিদার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

সাধারণ ফ্যানের তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ লাগে বিএলডিসিতে

গবেষণায় সাধারণ ফ্যান ও বিএলডিসি ফ্যানের বিদ্যুৎ ব্যবহারে বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেছে। একটি বিএলডিসি ফ্যান চালাতে গড়ে মাত্র ৩৫ ওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। বিপরীতে সাধারণ ফ্যান চালাতে লাগে ৭০ ওয়াট বা তারও বেশি।

অর্থাৎ, একই ধরনের ব্যবহার নিশ্চিত করতে সাধারণ ফ্যানের পরিবর্তে বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহার করলে বিদ্যুতের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। দেশের বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত সব ফ্যানের একটি বড় অংশ বিদ্যুৎসাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা গেলে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ২ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমতে পারে।

তবে দেশে বিএলডিসি ফ্যানের ব্যবহার এখনো খুবই সীমিত। গবেষণা অনুযায়ী, মোট ব্যবহৃত ফ্যানের মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ বিএলডিসি প্রযুক্তির। অর্থাৎ, অধিকাংশ পরিবার এখনো তুলনামূলক বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী সাধারণ ফ্যানের ওপর নির্ভরশীল।

বছরে সাশ্রয় হতে পারে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএলডিসি ফ্যানের ব্যবহার বাড়ানো গেলে বছরে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৯১৩ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ৮ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা বা ৭৩ কোটি মার্কিন ডলার।

এ ধরনের ফ্যান ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিল কমানো এবং জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ—দুই ক্ষেত্রেই সুফল পাওয়া যেতে পারে। গবেষণায় বিদ্যুৎসাশ্রয়ের সম্ভাব্য হিসাব জানার পর জরিপে অংশ নেওয়া ৯৬ শতাংশ পরিবার বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

তবে আগ্রহ থাকলেও বেশি দাম অনেক পরিবারের জন্য বড় বাধা। একটি সাধারণ ফ্যান কিনতে যেখানে প্রায় ২ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে বিএলডিসি ফ্যানের দাম ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত। ফলে বিদ্যুৎ বিল কমানোর দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা থাকলেও শুরুতে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়।

স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য দাম বড় বাধা

গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ২৫ হাজার টাকা বা তার কম। গ্রীষ্মকালে এসব পরিবারের গড় মাসিক বিদ্যুৎ বিল প্রায় ৬৬৩ টাকা।

আর্থিক সহায়তা ছাড়া এসব পরিবারের পক্ষে সাধারণ ফ্যানের পরিবর্তে বিএলডিসি ফ্যান কেনার বাড়তি খরচ বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের মাধ্যমে পুষিয়ে নিতে ৭ দশমিক ৭ থেকে ৯ দশমিক ৬ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে বড় পরিসরে একসঙ্গে ফ্যান কেনা এবং কার্বন ক্রেডিট বিক্রির অর্থ কাজে লাগানো গেলে এ সময় কমে প্রায় ৪ দশমিক ৮ বছরে নেমে আসতে পারে।

এ কারণে শুধু বিদ্যুৎসাশ্রয়ের সুবিধা প্রচার করলেই হবে না; স্বল্প ও মধ্যম আয়ের পরিবারের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে বলে প্রতিবেদনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাপ কমাতে পারে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যান

জাতীয় গ্রিডে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় আবাসিক খাতে। এ খাতে ফ্যানের পাশাপাশি শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসির ব্যবহারও বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ানোর অন্যতম কারণ। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতলীকরণ যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারায় অনেক সময় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়। এ অবস্থায় বিদ্যুতের ব্যবহার দক্ষ করা গেলে নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।

আইইইএফএর বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানিবিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) জন্য চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যানের ব্যবহার বাড়ানো গেলে বিদ্যুতের চাহিদা কমবে এবং পিডিবির ওপর চাপও হ্রাস পাবে।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ বিল কমানোর আগ্রহ থাকলেও বিএলডিসি ফ্যান সম্পর্কে মানুষের ধারণা এখনো কম। এ প্রযুক্তির সুবিধা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

বিএলডিসি ফ্যানের ব্যবহার বাড়াতে সাত সুপারিশ

গবেষণা প্রতিবেদনে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যানের বাজার সম্প্রসারণ ও সাধারণ মানুষের কাছে এর ব্যবহার সহজ করতে সাতটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যানের ব্যবহার বাড়াতে জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ, এ ধরনের ফ্যানের সুবিধা ও বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার এবং ফ্যানের মান নির্ধারণ ও লেবেল-সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রণয়ন।

এ ছাড়া স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য বিএলডিসি ফ্যানের দাম কমানো, কিস্তিতে কেনার সুযোগ তৈরি এবং বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে কিস্তির অর্থ সমন্বয়ের ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে। বড় পরিসরে একসঙ্গে ফ্যান কেনা এবং কার্বন ক্রেডিট থেকে পাওয়া অর্থ ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

সব মিলিয়ে গবেষণার তথ্য বলছে, বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ওপর নির্ভর না করে বিদ্যুতের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। সাধারণ ফ্যানের পরিবর্তে বিএলডিসি ফ্যানের ব্যবহার বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন পরিবারের বিদ্যুৎ বিল কমতে পারে, অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ, জ্বালানি ব্যয় এবং নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন অবকাঠামোয় বিনিয়োগের প্রয়োজনও কমানো সম্ভব।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!